বতসোয়ানার জাতীয় পতাকা
আগেরগুলো পড়তে চাইলে-ডুমেলা বতসোয়ানা-১৫
রাজনীতি এবং ব্যবস্থাপনার তিনটি পাঠ
একটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় যাওয়া মানে দেশকে চিরজীবনের জন্য লিজ নিয়ে নেওয়া নয়। আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থা দেখে তাই মনে হয়। সরকার পরিচালনার দায়িত্বে যে রাজনৈতিক দল থাকে, মনে হয় তারা দেশকে চিরজীবনের জন্য লীজ নিয়ে নিয়েছে। আর সরকারের বাইরে বিরোধী দলগুলোর মনোভাব যেন দেশ পরিচালনার ‘সোল এজেন্ট’ একমাত্র তারাই। জনগণের কল্যাণের জন্যই যে রাজনীতি- না সরকারি দল, না বিরোধী দল কেউই তা মাথায় রাখে। ফলে আমাদের দেশের রাজনীতি এখন হয়ে গিয়েছে ক্ষমতা দখলের নীতি। কিন্তু বতসোয়ানার রাজনীতি প্রকৃত অর্থেই জনকল্যাণের রাজনীতি। ১৯৬৬ সালে স্বাধীনতার পর থেকে এদেশের প্রতিটি নির্বাচন ফ্রি এবং ফেয়ার হয়েছে। নির্বাচনগুলো যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতি ৫ বছর পর পর অক্টোবর মাসে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বতসোয়ানার রাজনীতিতে সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দলগুলোর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বতসোয়ানার প্রধান দুইটি বিরোধী দল ব্যতিত আরও কটি ছোট দল আছে যাদের প্রভাব তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। তবে একটি বিষয় উল্লেখ করার মতো-নির্বাচনে জিততে না পারলে আমাদের দেশের মত সুক্ষ্ম কারচুপি, স্থুল কারচুপি কিংবা ভোট চুরি-ডাকাতির অভিযোগ তোলে না কেউ।
বতসোয়ানার একটি বিষয় আমার কাছে খুবই ভালো লাগে। বিষয়টি হলো, এদেশে আমাদের দেশের মতো রাস্তাঘাট দখল করে, অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে, যানবাহন ভাংচুর করে হরতাল-অবরোধ হয় না। শহরের বিভিন্ন সুবিধাজনক স্থানগুলোতে গণজমায়েত করার জন্য ‘ইমারজেন্সী এসেমব্লিং পয়েন্ট’ নামে কতকগুলো পয়েন্ট আছে। কারও কিছু বলার দরকার হলে এ সমস্ত পয়েন্টে গণজমায়েত বসিয়ে আচ্ছামত বলে যাও। কোন দাবী-দাওয়া থাকলে জানিয়ে দাও। কেউ কিচ্ছু বলবে না। কিন্তু আমাদের দেশে ঠিক এর বিপরীত চিত্রটি দেখতে পাই। কোন দাবি আদায়ের জন্য মিছিল মানেই রাস্তাঘাট দখল। হরতাল-অবরোধ মানেই অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে দেওয়া। আর যানবাহন ভাংচুরের কারণ কি তা আল্লাহ মালুম। মিটিং-মিছিল করতে হলে রাস্তাঘাট দখল করে, যানবাহন থামিয়ে পুরো শহর অচল করে না দিলে মিটিং মিছিল সার্থক হয় না। আমাদের নেতা নেত্রীরা তাই ভাবেন। কিন্তু এতে করে একটি দেশের গণতন্ত্র নামক ট্রেনটির অর্থনীতি নামক চাকা যে দুর্বল হতে হতে পুরো ট্রেন সমেত লাইনচ্যুত হয়ে পড়ে যেতে পারে তা ভেবে দেখেন না। আমরা আমজনতা গণতন্ত্র নামক ট্রেনের যাত্রী হয়ে দক্ষ চালকের অভাবে বারবার লাইনচ্যুত হয়ে পড়ে যাচ্ছি।
আমাদের বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সিস্টেম বড্ড দুর্বল। কেউ কাউকে বিশ্বাস করি না। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আছে পরস্পরের প্রতি প্রচন্ড অবিশ্বাস। অবিশ্বাস থেকে ঘৃণা, ঘৃণা থেকে ক্রোধ এবং এগুলো থেকে পরস্পরের প্রতি শত্রুতা। এই শত্রুতা আমাদের পুরো জাতিকে বিভক্ত করে ফেলেছে। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস এতই প্রচণ্ড যে, নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ মেটানোর জন্য সুপারভাইজার হিসেবে তত্ত্বাবধায়ক (Caretaker) রাখতে হয়। প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার সাংগঠনিক কাঠামোতে তত্ত্বাবধায়ক বা Foreman একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এরা শ্রমিক-কর্মীদের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত থেকে ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহণ করে থাকে। আর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার তিন মাসের জন্য এসে প্রচলিত দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতার ভাগ-বন্টনে সহায়তা দিতে দিতেই সময় পার করে ফেলে। তাই রাষ্ট্রীয় সংগঠনের একেবারে নিচের দিকে প্রজাতন্ত্রের প্রজাদের সাথে সম্পর্কিত হওয়ার সুযোগ পায় না।
একটি সংগঠনের সর্বনিম্ন স্তর শ্রমিকদের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত থেকে ফোরম্যান বা তত্ত্বাবধায়ক যে ভূমিকা পালন করে থাকে কেয়ারটেকার নামক তত্ত্বাবধায়ক সরকারেরও সেই ভূমিকাই থাকা উচিত। জনগণের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত থেকে জনকল্যাণে যা কিছু করা দরকার তার সব কিছুই নিশ্চিত করে যাওয়া উচিত। কিন্তু মাত্র তিনমাসের জন্য এসে তত্ত্বাবধায়ক সরকার না পারে জনগণের সাথে সম্পর্কিত হতে, না পারে দেশের জন্য কিছু করে যেতে। আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনাটি বড়ই দুর্বল। কিন্তু একটি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা আমাদের একান্ত প্রয়োজন। থ্রি লেসনস ফর ম্যানেজমেন্ট বা ব্যবস্থাপনার তিনটি পাঠ শিরোনামে ইন্টারনেট থেকে নেওয়া এ পাঠগুলো আমরা কাজে লাগাতে পারি কিনা দেখা যাক।
লেসন নাম্বার ওয়ানঃ
এক কাক গাছের ডালে বসে চোখ বুজে চুপচাপ অলস সময় কাটাতে লাগল। সারাদিন এরকম অলস সময় কাটিয়ে দিতে দেখে এক খরগোস কাকটিকে উদ্দেশ্য করে বলল, “আমি কি সারাদিন কিছুই না করে তোমার মত অলস সময় কাটিয়ে দিতে পারি?”
‘অবশ্যই, কেন নয়’- কাকটির উত্তর।
সুতরাং খরগোস কাকটির ঠিক নিচে মাটিতে বসে পড়ল এবং চোখ বন্ধ করে অলস সময় কাটাতে লাগল।
হঠাৎ এক শিয়াল এরকম একটি লোভনীয় খাবার সামনে পড়ে থাকতে দেখে খরগোসের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং তৃপ্তি সহকারে খেয়ে ফেলল।
গল্পটির নীতি বা মোরালঃ কিছু না করে বসে থাকতে হলে অনেক উঁচুতে বসতে হবে।
যা দেখেছিঃ “দেশের জন্য কিছুই না করে যে সমস্ত নেতা, আমলা দেশের সম্পদ লুটপাট করেছেন তারা কত উঁচুতে বসেছিলেন? একেবারেই কি ধরা ছোঁয়ার বাইরে?
লেসন নাম্বার টুঃ
মাঠে এক বড় বটগাছের নিচে বনমোরগ এবং ষাঁড়ের মধ্যে গল্প চলছে। মোরগ এক সময় ষাঁড়ের কাছে তার ইচ্ছে ব্যক্ত করল।
“আমার এই বটগাছটির একেবারে উঁচু মগডালে উঠতে ইচ্ছে করে, কিন্তু এত উঁচুতে ওড়ার শক্তি নেই।”
ষাঁড়টি মোরগকে পরামর্শ দিল, “তুমি আমার গোবর প্রতিদিন খানিকটা করে খেলে শরীরে শক্তি পাবে। এটি খুবই পুষ্টিকর এবং এতে অনেক এনার্জি আছে।”
মোরগটি খানিকটা গোবর খুঁটে খেয়ে দেখল সত্যিই এটি খেয়ে সে বেশ শক্তি পাচ্ছে। সে উড়াল দিয়ে গাছটির প্রথম শাখাতে গিয়ে বসল।
দ্বিতীয় দিন আরও কিছু গোবর খেয়ে দ্বিতীয় শাখা পর্যন্ত পৌঁছতে পারল। এভাবে এক পক্ষকালের চেষ্টায় সে গাছটির একেবারে মগডাল পর্যন্ত পৌঁছতে পারল।
এক কৃষক মগডালে বসা এরকম একটি নাদুস-নুদুস বনমোরগ দেখতে পেয়ে এয়ারগান দিয়ে গুলি করে মোরগটিকে শিকার করল।
গল্পটির নীতি বা মোরালঃ “তুমি শীর্ষে পৌঁছতে পারবে ঠিকই কিন্তু শীর্ষ তোমাকে সেখানে ধরে রাখতে পারবে না।”
যা শিখলামঃ “আমাদের দেশের এক একজন ক্ষমতাবান রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী, আমলা ক্ষমতার অনেক শীর্ষে পৌঁছে গিয়েছিল। শীর্ষ তাদেরকে সেখানে ধরে রাখতে পারেনি।”
লেসন নাম্বার থ্রিঃ একটি ছোট্ট পাখি একদিন প্রচন্ড শীতে জমে গিয়ে ওড়তে ওড়তে এক বড় মাঠের মাঝখানে ধপাস করে পড়ে গেল। অজ্ঞান থাকা অবস্থায় মাঠে বিচরণরত এক ষাঁড় পাখিটির উপর মলত্যাগ করল। গোবরের উষ্ণতা পেয়ে পাখিটির আস্তে আস্তে জ্ঞান ফিরতে লাগল। এক স্তুপ উষ্ণ গোবরের মধ্যে পড়ে পাখিটি অচিরেই প্রাণ ফিরে পেল। ষাঁড়ের গোবর সত্যিই তাকে জীবন বাঁচাতে বন্ধুর ন্যয় উষ্ণতা দিয়েছিল। জীবন ফিরে পেয়ে সে গোবরের স্তুপের মধ্যেই আনন্দে গলা ছেড়ে গান গাইতে শুরু করল। গোবরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করা এক বিড়াল পাখির আওয়াজের শব্দ পেয়ে অনুসন্ধান করে দেখতে পেল গোবরের মধ্য থেকেই আওয়াজ আসছে। গোবর ঘেটে বিড়াল পাখিটিকে বের করল এবং খেয়ে ফেলল।
গল্পটির নীতি বা মোরালঃ
১. তোমার উপর মলত্যাগ করে এমন সবাই তোমার শত্রু নয়।
২. মল ঘেটে তোমাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে এমন সবাই তোমার বন্ধু নয়।
৩. এবং যখন কোন গভীর মলযুক্ত খাদে পড়, তোমার মুখ বন্ধ রাখ।
যা দেখছিঃ
আমাদের দেশের রাজনীতিটা আজ এমন হয়ে গিয়েছে যে, নোংরা রাজনীতির আবর্জনার স্তুপে চাপা পড়ে আমরা আমজনতা মৃতপ্রায় হয়ে আছি। কিছু অসৎ রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী, আমলা এবং তাদের চাটুকাররা মিলে আমাদেরকে চুষে খেয়েছেন এবং আমাদেরই মাথায় মল ঢেলেছেন। ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে আমাদের রাজনীতিবিদদের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা আমাদের আমজনতাকে পিষে মারছিল। এই কিছুদিন আগেও আমরা ছিলাম বর্বর এক জাতি। রাজনৈতিক হিংসার কারণে রাস্তায় পিটিয়ে মানুষ মেরে ফেলেছি। মৃত মানুষের উপর লাফিয়ে লাফিয়ে নৃত্য-গীত করেছি। এগুলো টেলিভিশন এবং স্যাটেলাইটে দুনিয়া জুড়ে সভ্য জাতিকে দেখিয়ে স্তম্ভিত করে দিয়েছি। আফ্রিকা মহাদেশে অনেক অঞ্চল আছে যেখানে বর্বর আফ্রিকানদের বাস। বতসোয়ানার কালাহারি মরুভূমিতে বুশম্যান নামে এক বর্বর জাতি আছে। তারা এখনও সভ্যতার ছোঁয়া পায়নি। আমেরিকাতেও বুশ নামে একজন ম্যান আছে। কিন্তু আমাদের দেশতো সভ্যতার ছোঁয়া পেয়েছে অনেক আগে। তবে আমরা কেন বুশম্যানদের বর্বরতা চর্চা করে যাচ্ছি?
আমরা আমজনতা যখন নোংরা রাজনীতির মলযুক্ত গভীর খাদে পড়ে বের হয়ে আসার উপায় খুঁজে পাচ্ছিলাম না দেশে জরুরী আইন জারি হয়েছে। নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার এখন ক্ষমতায় আসীন। প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে একদল দক্ষ উপদেষ্টা আমজনতাকে উদ্ধারের জন্য নিরন্তর কাজ করে চলেছেন। দেশে জরুরী অবস্থার কারণে পরোক্ষভাবে সেনা শাসনও যুক্ত হয়ে গেছে। দেশের এই বিশৃঙ্খল অবস্থাকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনার জন্য সেনা বাহিনীর সহায়তায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার সাহসী এক এক পদক্ষেপ নিচ্ছেন। আমরা আমজনতা সুশাসনের এই উষ্ণতাটুকু পেয়ে নীরবে উপভোগ করে যাচ্ছি। এই সুযোগে রাজনৈতিক নেতা, সুশীল সমাজের নেতা অনেকেই আমজনতাকে উদ্ধার করার আগ্রহ দেখিয়ে যাচ্ছেন। কে কোন উদ্দেশ্য সাধনের মানসে আমজনতাকে উদ্ধার করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে- তা শুধু ভবিতব্যই বলতে পারে।
(২০০৭ সালের আগষ্ট-সেপ্টেম্বর এর দিকে এই লেখাটি যায়যায়দিনে প্রকাশিত হয়েছিল।)
চলবে...
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা নভেম্বর, ২০০৯ রাত ১১:৫৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


