আপনার এখানে কি হয়?
একেবারে চাঁছাছোলা প্রশ্ন।
ভদ্রমহিলা চেয়ারে বসেই আমার দিকে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দেন। আমি ভদ্রমহিলার মুখের পানে তাকাই। অফিসের এই সময়টাতে আমি কোন ভিজিটর অ্যালাউ করি না। কিন্তু এক গবেষণা সহকারীর পরিচিতির সুবাদে ভদ্রমহিলা এসেছেন আমার সাথে কথা বলতে। মধ্যবয়সী ভদ্রমহিলা। সাথে একটি কিশোর। পরনে স্কুল ড্রেস। পিঠে ব্যাগ। এইমাত্র স্কুল থেকে এসেছে বোঝা যায়। ভদ্রমহিলার ছেলেই হবে হয়তো।
ছেলেটির দিকে মনোযোগ দেই।
কি নাম তোমার?
-জিসান।
কোন ক্লাশে পড়?
-ক্লাশ সেভেন।
কোন স্কুলে পড়?
-শেখদী আব্দুল্লাহ মোল্লা উচ্চ বিদ্যালয়।
তুমি কি এই ক্যাফেতে কখনও এসেছ?
-না আসিনি।
আজই প্রথম আসলে?
-হ্যাঁ।
কার কাছে ঠিকানা পেয়েছ?
-ছনটেক অগ্রদূত বিদ্যানিকেতনে আমার যে বন্ধুরা পড়ে তাদের কাছ থেকে।
এবার ভদ্রমহিলার দিকে মনোযোগ দেই। আচ্ছা বলুন আপনার আগমনের উদ্দেশ্য। আপনার জন্য কি করতে পারি?
-আমি জানতে চেয়েছি এখানে আপনারা কি করেন?
ওহ্ আচ্ছা। এখানে আমরা গবেষণা করি। তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা। কি করে তথ্যপ্রযুক্তিকে এই বয়সী কিশোরদের উপযোগী করে তোলা যায়। কম্পিউটার ব্যবহার করে কিশোররা কিভাবে তথ্যপ্রযুক্তির শিক্ষালাভ করতে পারে- এই বিষয় নিয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
ভদ্রমহিলা মনযোগ দিয়ে আমার কথা শুনেন। আমি একজন অভিভাবক শ্রোতা পেয়ে আমার মনের কথাগুলো বলি।
একমাত্র সচেতন অভিভাবকরাই তাদের সন্তানকে রাখতে পারেন সবচেয়ে বেশি নিরাপদ। আজকাল কিশোর-কিশোরীরা ব্যাপক হারে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে নানান উপাদান আমাদের চারপাশেই আছে। কৈশোর বয়সের কৌতুহল থেকে আমাদের দেশের কিশোররা মাদক গ্রহণ সহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।
এই কিশোররা দেশের ভবিষ্যত। আমরা চেষ্টা করছি এই কিশোরদের তথ্যপ্রযুক্তির সম্ভাবনা বিষয়ে সচেতন করার। এখানে আমরা একটি কম্পিউটার লার্নিং সেন্টার গড়ে তুলতে চাচ্ছি।
আমার সংক্ষিপ্ত বক্তব্য শুনে মনে হয় ভদ্রমহিলা আশ্বস্ত হন এবং জিসানকে এখানে ভর্তি করাতে ইচ্ছার কথা জানান।
আমি আবার জিসানের দিকে মনযোগ দেই।
তুমি কখনো কম্পিউটার দেখেছ?
-না দেখিনি।
তোমাদের স্কুলে কম্পিউটার নেই?
-হ্যাঁ আছে। হেডস্যারের রুমে থাকে।
তাহলে যে বললে কম্পিউটার দেখনি?
জিসান লাজুক হাসে। ও দূর থেকে কম্পিউটার দেখেছে। নিজের হাত দিয়ে ধরেতো আর দেখেনি। আমি আবারও প্রশ্ন করি-
কম্পিউটার কাকে বলে তুমি জান?
-কম্পিউটার তথ্যপ্রযুক্তির বাহন।
আমি চমকে উঠি! সে এই কঠিন শব্দ কোত্থেকে পেল?
গত সোমবার সেই সাত কিশোরের প্রথম কম্পিউটার লার্নিং ক্লাশটি আমি নিয়েছিলাম। সেখানে তাদেরকে বলেছিলাম কম্পিউটার এখন শুধু গণনা যন্ত্রই নয় এটি তথ্যপ্রযুক্তির একটি বাহন। সেই কথাটি এই কিশোরের কান পর্যন্ত পৌঁছেছে। এভাবেই একজনের কাছ থেকে ১০ জনের কাছে সেখান থেকে শতজন, হাজার জনের কাছে পৌঁছুবে তথ্যপ্রযুক্তির কথা। কিশোররা তথ্যপ্রযুক্তিকে গ্রহণ করবে নিজের শিক্ষার জন্য, নিজের উন্নয়নের জন্য। এভাবেই একদিন জিসানরা উন্নত হবে এবং সেই সাথে দেশ উন্নত হবে।
তুমি কম্পিউটার কেন শিখতে চাও?
প্রশ্নটি করে আমি নিজেই উত্তর খুঁজে পাই না এই বয়সী কিশোররা কম্পিউটারে কি শিখবে। কিন্তু তাদের জন্য কম্পিউটার শিক্ষার ব্যবস্থা করা দরকার। তাদের স্কুলের পাঠ ই-মেইলে দিয়ে দিতে হবে। শিক্ষার্থীরা ই-মেইল খুলে তাদের প্রতিদিনের পাঠ কম্পিউটার থেকে বুঝে নেবে। পরদিন ক্লাশে এই অনুযায়ী প্রস্তুতি নিয়ে আসবে। শিক্ষকরা প্রশ্নের উত্তরের জন্য রেফারেন্স দিয়ে দিবেন। তারা এই নির্দিষ্ট সাইটগুলো ভিজিট করবে।
একটি জরুরী ফোন করতে হবে। হাতে আরও কাজ আছে। আমি গবেষণা সহকারীকে ডেকে একটি ভর্তি ফরম দিয়ে সব কিছু বুঝিয়ে দিতে বলি। আরও জানিয়ে দেই আমরা এই মুহূর্তে কোন ভর্তি ফি নিচ্ছি না। আগে এই কিশোরদের সংগঠিত করি। তারপর খুব শীঘ্রই এই অভিভাবকদের সাথে একটি সেমিনার করবো। ভদ্রমহিলা উঠতে উঠতে আমাকে একটি অনুরোধ করেন তার ক্লাস ফোরে পড়া ছেলেকেও এখানে ভর্তি করাতে। আমি বিনয়ের সাথে জানাই আমরা এত ছোট শিশুকে ভর্তি করব না। আগে দেখি এই কিশোরদের জন্য কি করতে পারি।
ভদ্রমহিলা উঠে সালাম দিয়ে চলে যেতে উদ্যত হন। পেছনে তার কিশোর ছেলেটি। আমি তাদের গমন পথের দিকে তাকিয়ে থাকি। এক গাদা বই পিঠে নিয়ে জিসান সরাসরি স্কুল থেকে এখানে চলে এসেছে। কম্পিউটার শেখার প্রতি গভীর আগ্রহ নিয়ে জিসান এসেছে আমার এই ছোট্ট গবেষণা কেন্দ্রে। জিসানের বন্ধুরা কৌতুহলের বশবর্তী হয়ে ইএফএলবিডি সাইবার ক্যাফেতে আসতো। এখন ওরা প্রতি শনি, সোম, বুধ বার কম্পিউটার জানতে আসে। আমি জানাচ্ছি যতটুকু সম্ভব।
কিশোরদের উপযোগী করে কম্পিউটার শিক্ষা কি হতে পারে এ বিষয়ে আমি আপনাদের পরামর্শ ও মতামত চাই। আপনাদের সুনির্দিষ্ট পরামর্শ পেলে আমরা এই কিশোরদের সেভাবে শিক্ষা দিতে পারি। আমরা এখানে আলোচনা করে একটি রূপরেখা প্রস্তুত করতে পারি। আমি আপনাদের সুচিন্তিত পরামর্শের অপেক্ষায় রইলাম।
(বিঃদ্রঃ আপনাদের পরামর্শ ও মতামত প্রিন্ট করে প্রতিটি শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছানো হবে। এ নিয়ে আগামী ২৪/০৪/২০১০ শনিবার বিকাল ৫ টায় ইএফএলবিডি কনফারেন্স রূমে অভিভাবক সমাবেশ করবো। আপনাদের সবাইকে আমন্ত্রণ। আগামী শুক্রবার এ বিষয়ে বিস্তারিত পোস্ট দেবো।)
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে এপ্রিল, ২০১০ রাত ৩:৫০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


