somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গ্রাম্যলোকটা চুপ করে আছে। চোখ থেকে পানি পড়ছে অনবরত।

১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৬ দুপুর ২:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দামাদামি শেষে গরুর মালিক ১ লক্ষ ৬০ হাজার টাকায় গরু দিতে রাজি হলেন। রহিম সাহেব এবার খুব খুশি। ১ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা দিয়ে গরু কিনেছেন। এলাকার সবচে বড় কুরবানিটা উনিই দিচ্ছেন। মনে মনে প্র্যাক্টিস করছেন বারবার, লোকে দাম জিজ্ঞেস করলে কোন স্টাইলে বলবে। হাসিটা কেমন করে দিলে গরুর দামের সাথে মিলবে। এসব ভাবতে ভাবতে গরু নিয়ে বাসার দিকে হাঁটতে শুরু করলেন।
বাড়িতে ফোন করে বউকে বলে দিলেন, - ‌'হ্যালো শুনছো? গরু কেনা শেষ। সবাইকে বলে দিও, এবারে এলাকার সবচে বড় কুরবানিটা আমিই দিচ্ছি।'
বউ আশপাশের বাসায় 'ভাবি-ভাবি' করে সেকি সোরগোল । পরিবারের ছেলে মেয়েরা খবর পেয়ে বাড়ির গেইটে ভীড় করেছে। কখন গরু নিয়ে আসবে।
রহিম সাহেব ইচ্ছে করেই গরুর সাথে পায়ে হেঁটে যাচ্ছেন। আলাদা গেলে লোকে যদি আবার অন্য কাউকে মালিক ভেবে বসে! রাস্তায় কেউ দাম জিজ্ঞেস করলেও বলছেন। আবার না জিজ্ঞেস করলেও বলছেন। এতগুলো টাকা খরচ করে কুরবানি দেয়া হচ্ছে, লোকে যদি না-ই জানলো। তবে আর লাভ কী!
গরু নিয়ে বাড়িতে আসতে আসতে প্রায় রাত হয়ে গেলো। ফলে আশপাশের তেমন কেউ গরু দেখতে এলো না। ভাবছেন এবারের গরুটা বাড়ির সামনে জবাই না দিয়ে স্কুলের মাঠে সবার সাথে দিবেন। এতে গরুর দাম জানতে চাইবে অনেকে। চোখেও পড়বে ব্যপারটা।
রহিম সাহেবের বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছেন। কখন সকাল হবে, প্রতিবেশীরা ভীড় করবে রহিম সাহেবের গরু দেখার জন্য। সবাই গুনগুন করে বলবে, রহিম সাহেবের গরুটাই এই এলাকার সবচে দামি।

হঠাৎ শুনলেন, দরজায় ঠক ঠক শব্দ। অবাক হলেন না রহিম সাহেব। গরুর দাম শুনে এই মধ্যরাতে কেউ আসতেই পারে। দরজাটা খুললেই তো বলবে, '- আহা রহিম সাহেব, কি একখান গরু কিনলেন ভাই, কাঁপায়া দিলেন তো' মুচকি হাসতে হাসতে দরজা খুললেন রহিম সাহেব।
খুলেই অবাক হয়ে গেলেন। কারণ, অপরিচিত একটা গ্রাম্য মানুষ এসেছে। চোখে-মুখে ঘাম, পায়ে জুতা নেই। একটু পর পর চোখ মুছছে লোকটা। গায়ে ময়লা কাপড়। সাথে ১১/১২ বছরে ছোট একটা ছেলে।
রহিম সাহেব খুব বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
- কে আপনি?
- স্যার আমি আফনের গ্যারেজে রাখা গরুটার মালিক!
- মালিক মানে! আমি গতসন্ধ্যায় এত দাম দিয়ে কিনে নিয়ে এলাম, আর আপনি বলছেন 'গরুর মালিক!'
- না স্যার, আসলে আমি গরুটার মালিক আছিলাম, মানে গত সন্ধ্যায় আমিই গরুটা আফনের কাছে বিক্রি করছি।
- ও আচ্ছা, তো এত রাতে কেনো আসছো? ভুল করে টাকা কম দিয়েছিলাম? নাকি জাল নোট পড়েছে?
গ্রাম্যলোকটা চুপ করে আছে। চোখ থেকে পানি পড়ছে অনবরত।
রহিম সাহেব বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
- আরে কী হয়েছে বলবা তো! কাপড়-চোপড় লাগবে? নাকি আরও টাকা চাও?
- না স্যার, আসলে গরুটারে একটু দেখতে আসছিলাম। আমার পোলাডায় সারা রাইত কিছু খায়নাই। বারবার গরুটারে দেখতে চাইতেছে। তাই এই রাইতে ৯ মাইল হাঁইট্যা আসছি স্যার।যদি কিছু মনে না করেন, আমারে একটু সুযোগ দিলে গরুটারে একটু দেইখ্যা যাইতাম।
রহিম সাহেব নিস্তব্ধ হয়ে গেলেন। গ্যারেজ খুলে দিলেন। গ্রাম্য লোকটা ভেতরে ঢুকেই গরুকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলেন। ছোট ছেলেটাও কাঁদছে আর লোকটাকে জড়িয়ে ধরে বলছে, ‌'বাজান, ওই স্যাররে ট্যাকা ফেরত দিয়া দেও, আমি গরু নিয়া যামু! বাজান! ও বাজান! আমি গরু নিয়া যামু'
গ্রাম্যলোকটা তার ছেলেকে কোনো উত্তর দিতে পারছে না। শুধু কেঁদেই যাচ্ছে। রহিম সাহেব দূর থেকে চুপচাপ দেখে যাচ্ছেন সব। বেশ কিছুক্ষণ পরে দুজন বেরিয়ে এলো। চোখ মুছতে মুছতে বললো,
- স্যার, আফনেরে কষ্ট দিলাম, মনে কিছু নিয়েন না।
- ও কি তোমার ছেলে?
- জী স্যার, একটা পোলাই। এইডারে পড়ালেখা করানোর জন্যই আদরের গরুটা বেইচ্যা দিলাম। গেলাম স্যার... দোয়া রাইখেন....
- একটু দাঁড়াও,
রহিম সাহেব ঘর থেকে এক হাজার টাকার একটা নোট জোর করে ছোট ছেলেটার হাতে গুজে দিলেন। বললেন, ঈদের দিন এসে বাসায় খেয়ে যেয়ো। বিদায় দিয়ে রহিম সাহেব ভেতরে ঢুকতে গেলেন। লোকটা আবার চিৎকার করতে করতে দৌঁড়ে এলো,
- স্যার স্যার, আরেকটা কথা স্যার,
- হ্যা, বলো,
- জবাইয়ের আগে গরুটারে একটু আস্তে ফালায়েন স্যার... অনেক আদরের গরু তো.....
এতটুকু বলেই লোকটা আবার কেঁদে উঠলো। আবার কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে রহিম সাহেবকে সালাম দিয়ে রাস্তার দিকে হাঁটতে শুরু করলো গ্রাম্যলোকটা।
রহিম সাহেব অনেক দিন পরে অনুভব করলেন, নিজের চোখ দিয়ে টপটপ পানি পড়ছে।
গেইটের গ্রিলে ভর করে নিশ্চুপ তাকিয়ে আছেন,
সত্যিকারের কুরবানি দেয়া খালি পায়ের অচেনা মানুষটার দিকে...
(Collected)
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৬ দুপুর ২:৪৪
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শহীদ জিয়া ২৭ মার্চের ভাষণে 'জয় বাংলা' বলেছিলেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:১১





সূত্রঃ আমার রাজনীতির রূপরেখা
লেখকঃ জিয়াউর রহমান
পৃষ্ঠাঃ ১৭৭

...বাকিটুকু পড়ুন

ওরা জিডিপি আর সেমিকন্ডাক্টরে ব্যস্ত , আমরা ব্যস্ত গোরুর জিয়াফত নিয়ে ....।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৩৫


গতকাল মামার ফোন এল দুবাই থেকে, রাতের বেলা। বললেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গরু জবাই করে জিয়াফত খাওয়ার খবর এখান পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, ব্যাপার কী? আমি বললাম, মামা, ওরা গরুর মাংস... ...বাকিটুকু পড়ুন

মীর জাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঐতিহাসিক চুক্তি! যে চুক্তির জন্য বাংলার স্বাধীনতার সূর্য ২০০ বছরের জন্য অস্তমিত হয়েছিল!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৪২


আমরা পলাশী যুদ্ধের কথা জানি। কিন্তু এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি হয়েছিল মীরজাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্ণধার লর্ড ক্লাইভের এর সাথে সেটা সম্পর্কে খুব কমই... ...বাকিটুকু পড়ুন

যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:১০


যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

“ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”- শুনতে চমৎকার, জনপ্রিয়ও বটে। কিন্তু কথাটি কি ধর্মীয় বিশ্বাসের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ?
আমার কাছে তা নয়। এধরণের বাণী... ...বাকিটুকু পড়ুন

সৌদি আরবে নারীসহ দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ: প্রতিমন্ত্রী, নাকি পাপেট?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫০


গত বুধবার সৌদি আরবের শরিয়া আদালত দুই বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকের শিরশ্ছেদ কার্যকর করেছে। এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ যে বিবৃতিটি দিয়েছেন, সেটা পড়ে আমি কয়েকটা জিনিস বুঝতে পারলাম।

প্রথমত,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×