somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

বিএম বরকতউল্লাহ
পড়াশোনা করি। লেখালেখি করি। চাকরি করি। লেখালেখি করে পেয়েছি ৩টি পুরস্কার। জাতিসংঘের (ইউনিসেফ) মীনা মিডিয়া এ্যাওয়ার্ড ২০১১ ও ২০১৬ প্রথম পুরস্কার। জাদুর ঘুড়ি ও আকাশ ছোঁয়ার গল্পগ্রন্থের জন্য অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ শিশুসাহিত্য পুরস্কার ২০১৬।

ছোটোগল্প: মনাডাকাত

১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৬ দুপুর ১২:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মা-বাবা আদর করে ছেলের নাম রেখেছিলেন ’মনা’। সেই মনা এখন বড় হয়েছে; তার সাথে পাল্লা দিয়ে বড় হয়েছে তার নামটিও। ’মনা’ হয়ে গেছে ’মনাডাকাত’। এখন ’মনা’ নামে তাকে কেউ চেনে না, ’মনাডাকাত’ নামে তার বিস্তর পরিচিতি। নামের সাথে কাজের এত মিল পাওয়া কঠিন।
মনাডাকাতের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। তার যেমন গায়ের শক্তি সে তেমন দুঃসাহসী। শরীর তার একটুও ভাঙ্গেনি, হিংস্রতাও কমেনি, চোখ দুটি জবা ফুলের মত লাল। তাকে দেখলে মনে এক ধরনের ভয় জেগে ওঠে।

একরাতে ডাকাতি করে বাড়ি ফিরছিল মনাডাকাত। পথের দু‘পাশে ছোট বড় নানা জাতের গাছ, মাঝেমধ্যে লতাপাতার কুন্ডলী। তার কাঁধে একটা ঝোলা। কোমরে গামছা বাধা। মুখে বিড়ি। ধুমছে ধুয়া ছেড়ে ভয়হীন মনাডাকাত হেঁটে চলেছে।
মনাডাকাতের মনে হল, কিছু একটা তার পিছু নিয়েছে, তার পায়ে পায়ে হাঁটছে। কিন্তু ভয় পেল না সে।
‘কে? আমার গায়ে গায়ে হাঁটছিস! কি ব্যাপার কথা বলছিস না যে! কোন সাড়া-শব্দ না পেয়ে রাগের চোটে পেছনে ঘাড় ফিরিয়েই থ হয়ে গেল দুর্ধর্ষ মনাডাকাত।

একটি ছায়া! তার সামনে দিব্যি দাঁড়িয়ে আছে। ছায়া তো হয় কালো কিন্তু তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ধবধবে সাদা একটা ছায়া। মনাডাকাত যা বলছে, যা করছে, সাদা ছায়াটিও তাই বলছে-করছে। মনার চক্ষু ছানাবড়া।

মনাডাকাত কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আবার হাঁটতে লাগল। পেছনে তাকাল না, আড়চোখে দেখল ছায়াটি আগের মতই তাকে অনুসরণ করছে। এই নির্জন রাতে একজন মানুষ আর একটি সাদাছায়া লাগালাগি করে হাঁটছে। রা-শব্দ নেই। শুধু হনহনিয়ে হাঁটা। কী মুশকিল!

হঠাৎ থমকে দাঁড়াল অসম্ভব রাগী মনাডাকাত। রাগে গজগজ করছে সে। গভীর রাতে চলাফেরা করে তার অভ্যেস। রাতে-বিরাতে চলতে গিয়ে মাঝে-মধ্যে ভূত-পেরেতের সাক্ষাৎ পেলেও থোরাই কেয়ার করে সে। কিন্তু সে এমন ছায়ারহস্যের মধ্যে পড়েনি কোনোদিন। আজ একটু বেকায়দায়ই পড়ে গেল মনা।

মনা হাঁটতে লাগল। দ্রুত। ছায়াটিও হাঁটছে তার সাথে। ভারি ঝামেলা তো! রাগে আগুন জ্বলছে তার গায়ে। যাকে দেখলে সবাই ভয় পায়, সমীহ করে রাস্তা ছেড়ে দেয়, এলাকাতে যার দুঃসাহসিক অনেক ঘটনা-রটনা আছে, তার সাথে এ রকম নির্জলা মস্করা! কিছুতেই মানতে পারছে না মনাডাকাত। সটান দাঁড়িয়ে গেল সে। দাঁড়িয়ে গেল ছায়াটিও। এবার দু’জন মুখোমুখি হলো।
-কে তুই. কি চাস? বল।
-আমি আপনার বিবেক। আমি আপনার ভেতরে আর থাকতে পারছি না আমি। বেরিয়ে এসেছি।
-তুই আমার বিবেক? বাইরে কী করস তুই? বিবেক ছাড়া মানুষ চলে কীভাবে?
-না, আপনি বিবেক ছাড়া মানুষ নন। আপনার ভেতরে রয়েছে আরেকটা বিবেক। অতি দুষ্ট ও বদ বিবেক। আমি তার তার প্রতি খুবই বিরক্ত। সে আপনাকে বশ মানিয়ে আপনার ভেতরে অর্জন করেছে প্রবল শক্তি-সামর্থ। আপনাকে সে ভুলপথে পরিচালিত করছে। তার কথায় আপনি চলছেন-বলছেন আর ভয়ঙ্কর সব অপকর্ম করে যাচ্ছেন। আমার কোনো কথাই শুনছেন না আপনি। তাই আমি বাইরে বেরিয়ে এলাম। আমি আপনাকে ভালো পথে ফিরিয়ে আনতে চাই। হয় আপনি আমার কথামত চলবেন, নয় আমি আপনাকে ত্যাগ করে চলে যাব?

মনাডাকাত চিন্তিত হয়ে পড়ল। সে বিস্ময়ে সরলভাবে তাকিয়ে রইল তার সামনে দন্ডায়মান বিবেকের দিকে। কী বলবে সে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। কাঁধের গাটরিটা নামিয়ে রাস্তার ধারে একটা পুরনো গাছের নিচে গিয়ে দাঁড়াল সে। ছায়াটিও তার সাথে গিয়ে সামনা সামনি দাঁড়াল।

মনাডাকাতের পেশা ডাকাতি। সে এইমাত্র ডাকাতি করে এসেছে। তার তিরিক্ষি মেজাজ আরো তিরিক্ষি হচেছ। মনাডাকাত একটা বোতল বের করে মুখে দিতেই ছায়াটি ছোঁ মেরে নিয়ে গেল বোতলটি। মনা মেজাজ খারাপ করে তাকাল ছায়াটির দিকে। কিছুই বলল না। তারপর সে কোঁচর থেকে বিড়ি বের করে মুখে দিল। দেয়াশলাই থেকে একটা কাঠি বের করে বিড়িতে আগুন দিতেই ফুস করে উড়ে গেল বিড়িটা। মনা রেগে-মেগে আগুন হয়ে গেল। সে কোনো কথা না বলে কটি থেকে বের করল একটা ছুরি। অন্ধকারে ছুরিটি ঝিলিক দিয়ে উঠল। মনাডাকাত ছুরিটি নাড়াচাড়া করে ছায়াটিকে দেখিয়ে বলল,
এটা কি তুই চিনস?
চিনি, এটা একটা ছুরি, জবাব দিল ছায়াটি।
মনা বলল, এটা দিয়ে কী করি জানস?
আলবৎ জানি, ছায়াটি বলল।
যদি জানস তো কোন সাহসে আমার সামনে এখনও দাঁড়িয়ে আছিস। আমি এই ছুরি দিয়ে তোকে চাক চাক করে ফেলব। তুই ভাগ এখান থেকে।
ছায়াটি শরীর ঝাকিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে বলল, আপনি এসব কাজে এতই ওস্তাদ যে, যদি সত্যি আমাকে চাক চাক করতে পারতেন, এতক্ষনে করে ফেলতেন-একটুও দেরি করতেন না। পারেন না, তাই করেন না।
এ কথা শুনে মনা অপমানবোধ করল। সে রাগে কাঁপতে লাগল। কোনো কথা না বলে আচমকা ছুরিটা ফস করে ঢুকিয়ে দিল ছায়াটির পেটে। কিন্তু ছায়াটি দিব্যি দাঁড়িয়ে রইল আগের মত। একটু নড়া-চড়াও করল না।

একি! মনা দু‘চোখ বন্ধ করে অন্ধভাবে কচুকাটা শুরু করে দিল। সে ভাবছে এতক্ষণে ছায়াটি কেটেকুটে চাকচাক হয়ে পড়ে আছে মাটিতে। মনা হাঁপাতে লাগল। সে চোখ খুলে দেখে ছায়াটি তার সামনে দাঁড়িয়ে আগের মতই হাসছে। মনা রাগে অস্থির হয়ে কিল ঘুষি আর লাত্থি-গুঁতো মারা শুরু করে দিল ছায়াটিকে। ছায়াটি দাঁড়িয়ে আছে একদম স্বাভাবিকভাবে।

ক্লান্ত-শ্রান্ত মনাডাকাত গাছের তলায় বসে হাঁপাতে হাঁপাতে ছায়াটিকে বলে, মস্করা করস, নাহ্? গাছের ডালা ভেঙ্গে তো পিঠে ভাঙ্গবো আমি। আমার মাথায় চেলচেল করে রক্ত উঠছে। তোর দফা রফা করে ছাড়ব আমি। তুই মনাকে চিনস, মাগার এখনও মনাডাকাতকে চিনস না। এবার বুঝবি।

মনাডাকাত রাগে ফুঁসছে। কাঁপাহাতে কোচর থেকে বিড়ি নিল মুখে। আগুন দিল। লম্বা টানে ইটভাটার চিমনির মত নাকে মুখে ধুয়া বের করল। গাছে হেলান দিয়ে বিড়ি টানছে মনাডাকাত। তাকে খুব ক্লান্ত-শ্রান্ত ও বিব্রত দেখাচ্ছে।

সামনে দাঁড়িয়ে সাদাছায়াটি বলল, এ জীবনে আপনি কয়টি ভালো আর কয়টি খারাপ কাজ করেছেন? আপনার নির্মমতা কত মানুষের জীবনে কত দুঃখ-যন্ত্রণার কারণ হয়ে আছে। আপনি কত কান্না, কত হাহাকার কত অশ্রূ ঝরিয়েছেন? আর কত মানুষের অভিশাপ বয়ে চলেছেন, একটু ভেবে দেখেন তো ওসব কী আপনার বেঁচে থাকার জন্য খুব প্রয়োজন ছিল? বেঁচে থাকার জন্য কি এর চেয়ে ভালো পথ আর নেই? তবে কেন মানুষ হয়ে পশুর মতো কাজ করে এভাবে মানুষের অভিশাপ বয়ে চলেছেন আপনি? বলুন, জবাব দিন।

মনাডাকাত ঝিম ধরে বসে রইল। তার দু‘চোখ বন্ধ হয়ে এলো। তার হাতে নির্মমভাবে আহত-নিহত হওয়া মানুষের আহাজারির করুন চিত্র ভেসে উঠল। তার গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। তার সমস্ত শরীর ঘরমে সয়লাব।
প্রচন্ড বেগে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল মনা। মনে হলো তার শ্বাসের সাথে একটা দানব বেরিয়ে গেল। মনাডাকাত উঠে দাঁড়ালো এবং হঠাৎ সাদা ছায়াটিকে ঝাপটে ধরে আলিঙ্গন করতে লাগল। পরে সে সবকিছু ছুড়ে ফেলে দিয়ে সোজা বাড়ি চলে গেল।
তারপর মনাডাকাতকে আর রাতের অন্ধকারে ঘরের বাইরে কদম ফেলতে দেখা যায়নি।






সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৬ দুপুর ১২:৪৩
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ওরা জিডিপি আর সেমিকন্ডাক্টরে ব্যস্ত , আমরা ব্যস্ত গোরুর জিয়াফত নিয়ে ....।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৩৫


গতকাল মামার ফোন এল দুবাই থেকে, রাতের বেলা। বললেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গরু জবাই করে জিয়াফত খাওয়ার খবর এখান পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, ব্যাপার কী? আমি বললাম, মামা, ওরা গরুর মাংস... ...বাকিটুকু পড়ুন

মীর জাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঐতিহাসিক চুক্তি! যে চুক্তির জন্য বাংলার স্বাধীনতার সূর্য ২০০ বছরের জন্য অস্তমিত হয়েছিল!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৪২


আমরা পলাশী যুদ্ধের কথা জানি। কিন্তু এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি হয়েছিল মীরজাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্ণধার লর্ড ক্লাইভের এর সাথে সেটা সম্পর্কে খুব কমই... ...বাকিটুকু পড়ুন

তাবলিগে গিয়ে যা শিখলাম না

লিখেছেন মুনতাসির, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:৫৯

আমি যখন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ি, তখন আমার কয়েকজন বন্ধু তাবলিগ করত। তাবলিগের প্রতি আমার কখনোই আগ্রহ ছিল না। তবে ওরা নিজেরা রান্না করত, আর আমি রান্না করতে পছন্দ করি। তাই একদিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:১০


যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

“ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”- শুনতে চমৎকার, জনপ্রিয়ও বটে। কিন্তু কথাটি কি ধর্মীয় বিশ্বাসের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ?
আমার কাছে তা নয়। এধরণের বাণী... ...বাকিটুকু পড়ুন

সৌদি আরবে নারীসহ দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ: প্রতিমন্ত্রী, নাকি পাপেট?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫০


গত বুধবার সৌদি আরবের শরিয়া আদালত একজন নারীসহ দুই বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকের শিরশ্ছেদ কার্যকর করেছে। এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ যে বিবৃতিটি দিয়েছেন, সেটা পড়ে বোঝা গেল যে, পররাষ্ট্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

×