somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পুতুল খেলার ইতিকথা

১৭ ই মে, ২০১৯ রাত ২:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মায়ের কারনে খুব ভোরেই ঘুম ভাঙ্গে মুনিয়ার। ঘুম থেকে উঠেই মা লেগে যান ভাত রাঁধতে, আর ও মাথার উপরে তেরপল গুটিয়ে রাখে। তাড়াহুড়ো করে খাওয়া দাওয়া সেরে মা বেড়িয়ে যায় কাজে, আর মুনিয়া ওর চটের ঝোলা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে ভিক্ষা করতে। কিন্তু সবসময় ওদের অবস্থা এমন ছিল না, মা প্রায়ই বলে। ওর না দেখা বাবাকে নিয়ে অনেক গালমন্দও করে। কিন্তু একটু আড়াল হলেই দেখে মা কাঁদছে। ও বোঝে না, ঠিকমত জানেওনা বাবা কোথায়। শুধু জানে, ওর বাবা নাকি বড় ব্যাবসায়ী ছিল, পাকা বাড়ীও ছিল। ও তখনও পৃথিবীর আলো দেখেনি। বাবা নাকি একরাত্রে কয়েকজন লোকের সাথে বাইরে গিয়ে আর ফেরেনি। বিকেল থেকেই চোখরাঙ্গানো মেঘদুত সেই রাত্রে কালবৈশাখের রুপ নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে। মা ওকে পেটে নিয়েই অনেক দৌড়াদৌড়ি করেও কোন খোঁজ পায় না। ওর জন্মের পরে মা আর খোজেননি। তখন তিনি প্রায় নিঃস্ব, বেচে থাকার তাগিদে ভালবাসা আর খুজতে যাননি মা। আর এখন অবস্থার বিবর্তনে ঠাই হয়েছে পান্থকুঞ্জের ফুটপাত।

দুপুরের দিকে মানুষের দেয়া পাউরুটি আর কলা খেয়ে পার্কের মাঝেই বসে ব্যাগ থেকে ওর কাঠের বাক্সটা বের করে মুনিয়া। বাক্স খুলে একে একে বের করে তিনটা পুতুল আর রান্নাবাটি খেলার সরঞ্জাম। মহিলার পোষাক পরা পুতুলকে রান্না করতে বসিয়ে পুতুল লোককে বাজার করতে পাঠায়। গাছ লতা পাতা ইটের গুঁড়ো কুড়িয়ে এনে রান্নাবাটি খেলতে থাকে আপন মনেই। নিজের দুপুরের সময়টা কেটে যায় কোনদিক দিয়ে ওর খেয়ালই থাকেনা। আশে পাশে পার্কে বেড়ানো লোকগুলো মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে ওর খেলা। কেউ কেউ এসে কথাও বলে, জানতে চায় পুতুলগুলো কে। ও হেসে বলে বাবা-মা আর আমি। জীবনের কষ্টটা এই সময় একটুও স্পর্শ করে না ওকে। একদিকে মা বেচে থাকার দৌড়ে সব হারাচ্ছে, আরেকদিকে ও একে একে সাজিয়েই চলেছে ওর পুতুল সংসারে। দুপুরের সুর্য্যটা পশ্চিমে ঢলে গেলেই ও ব্যাগ গুছিয়ে উঠে পড়ে। হাতে পুতুল বাবাকে নিয়ে পার্কের গেট দিয়ে বেরিয়ে বাংলামোটরের দিকে এগোতে থাকে।

বাংলামোটর মোড়ে এসে দেখে অনেক মানুষ জটলে করে আছে। পুলিশের গাড়ীও দেখা যায় একটা। গম্ভীর মুখে ওয়াকিটকিতে অনবরত কথা বলে চলেছে। ও পুলিশের চোখ এড়িয়ে মানুষের জটলায় গুঁতো-গাতায় এগোতে থাকে। অনেক কষ্টে ঢুকতেই দেখে কেন্দ্রে একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ রক্তের জটলার মাঝে শুয়ে আছে। চোখদুটো খোলা, আর চিরে দেওয়া গলা দিয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরুচ্ছে। ও সম্মোহিত হয়ে তাকিয়ে থাকে। হঠাত দুই বছরের এক বাচ্চার কান্নার আওয়াজ কানে যেতেই খুজতে থাকে। এর মাঝেই এম্বুলেন্সের লোক এসে ডেডবডি সরাতে গেলেই হঠাত কিছুটা রক্ত ফিনকি দিয়ে ওর জামায় পড়ে। চমকে সরে গিয়ে বাচ্চাটাকে খুজতে থাকে। বাচ্চাটাকে দেখে হাত ধরে জটলা থেকে বের করে নিয়ে আসে। আশে পাশের সবাই উত্তেজনায় খেয়াল করে না ওদের দুজনকে। ভীড় থেকে বের হয়েই মুনিয়া জামা দিয়ে ছেলেটার চোখ মুছিয়ে দেয়। ছেলেটির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই ছেলেটি কান্না থামিয়ে, ঘটনার আকস্মিকতা থেকে আস্তে আস্তে বেরিয়ে এসে ধাতস্ত হয়। হঠাত কেউ চিতকার দিলে ও চমকে দৌড়ানো শুরু করে। ওকে দৌড়াতে দেখে, বাচ্চাটাও ওর পেছনে দৌড়ানো শুরু করে। পেছনে কে আসছে না আসছে সেদিকে একটুও খেয়াল করে না। পার্কের ভেতরে ঢুকতেই ও বড় বড় শ্বাস নিতে থাকে। ওর পাশে ছেলেটিকে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, লোকটা কে ছিল। ছেলেটি মাথা নিচু করে শুধু একটাই শব্দ উচ্চারন করে, “বাবা”। মুনিয়ে কিছুক্ষন চেয়ে থেকে ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে। তারপর হাত ধরে এগতে থাকে বাড়ির দিকে। হঠাত ছেলেটি জিজ্ঞেস করে পুতুলের গায়ে কি লেগে আছে। ও পুতুলটা সামনে আনতেই দেখে কিছুটা রক্ত ওর পুতুল বাবার গায়ে লেগে আছে। কিছুক্ষন অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে কিছু না বলে ছেলেটির হাত ধরে বাসস্থানের দিকে এগোয়। মনে মনে বলে, মাকে আর কখনোই জিজ্ঞেস করবে না বাবা কোথায়।

কয়েকদিন পরে, একই পার্কে বসে রান্নাবাটি খেলতে থাকে মুনিয়া। সেদিনের ঘটনা কিছুই হয়তো মনে নাই। তবে ওর পুতুল পরিবারে নতুন একটা পুতুল যোগ হয়েছে। ও সবকিছু সাজানোর মাঝেই পেছন থেকে, “বুবু” ডাক শুনে তাকিয়ে দেখে, সেই ছেলেটা লতা-পাতা হাতে নিয়ে আসছে। হেসে তাড়াতাড়ি আসতে বলে। ছেলেটি দৌড়ে আসতেই দুজনে মিলে রান্নাবাটি খেলায় ডুবে যায়। পাশ দিয়ে চলমান মানুষগুলো দেখতে থাকে ওদের খেলা।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই মে, ২০১৯ রাত ২:৫৯
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইমাম, মুয়াজ্জিন, কুরআনের শিক্ষক ও দ্বীন প্রচারকদের বেতন বা সম্মানী গ্রহণের শরয়ী হুকুম

লিখেছেন নতুন নকিব, ২৭ শে মার্চ, ২০২৬ সকাল ১০:১৪

ইমাম, মুয়াজ্জিন, কুরআনের শিক্ষক ও দ্বীন প্রচারকদের বেতন বা সম্মানী গ্রহণের শরয়ী হুকুম

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

মসজিদে ইমামতি করা, আযান দেয়া, কুরআন শিক্ষাদান করা কিংবা সাধারণভাবে দ্বীন প্রচারের কাজে বিনিময়,... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্বাধীনতা বলতে আপনি কি বুঝেন ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৭ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:০৩


২০২৩ সালের কথা। আমরা কয়েকজন মিলে অনলাইনে একজন ইংরেজি স্যারের কাছে কোর্সে ভর্তি হয়েছিলাম। একদিন ক্লাস চলছে, স্যার হঠাৎ বই থেকে মুখ তুলে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা ছোটবেলায় যখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের শাহেদ জামাল- ৯৪

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৭ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১০:১৪



বিশেষ দিন গুলো শাহেদ জামালের জন্য কষ্টকর।
যেমন ইদের দিন শাহেদ কোথায় যাবে? কার কাছে যাবে? তার তো কেউ নেই। এমনকি বন্ধুবান্ধবও নেই। তার এমন'ই পোড়া কপাল মেসেও... ...বাকিটুকু পড়ুন

এই যে জীবন

লিখেছেন সামিয়া, ২৮ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১২:২৪



এই যে আমার জীবনে কিছুই করা হলোনা, সেটা নিয়ে এখন আর খুব বড় কোনো আফসোস করি না। জীবন আসলে নিজের মতোই চলতে থাকে। সকালে ঘুম থেকে উঠি, রান্নাঘরে গিয়ে চায়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

এঁনারা কিসের আশায় দালালি করে যাচ্ছেন?

লিখেছেন বিচার মানি তালগাছ আমার, ২৮ শে মার্চ, ২০২৬ দুপুর ১২:০৫



১. ১৫ আগস্ট টাইপ কিছু বা ৭ নভেম্বর টাইপ কিছু না ঘটলে আওয়ামী লীগ সহসা আর ক্ষমতায় আসতে পারবে না। জুলাই-এর মত কিছুও বার বার হয় না। তাই ধরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×