somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ঘুড়ি ছেঁড়ার দিন (২)

২৪ শে মে, ২০১০ রাত ১১:১৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ঘুড়ি ছেঁড়ার দিন (১)

কিছু কিছু স্বরচিত অভাববোধ কিংবা যাযাবর চিন্তা ভীড়ে, জটিল সময়গুলোও কখনো কখনো সচল হয়ে ওঠে। যদিও মনের কোনে কিছুটা অস্বস্তি থেকে যায়, তাকে পাত্তা না দিলেই হল! "ব্যস্ততা" নামের সর্বরোগের মহৌষধটা হাতে পেয়ে গেছি, তাই ধুরছাই বলে ঝেড়ে ফেলেছি হার মানা অপমানকে। আপন খেয়ালে থাকি, ইচ্ছেমতন নিজের পরিধিকে ভাঙ্গি। নিজের অনুভূতি পেতে নেই বৈচিত্র্যের সব অ-আ-ক-খ গুলোকে। বন আর পাহাড়ের সাথে সখ্যতা আমার পুরনো। সেই বন্ধুতা যেন হঠাৎ ডালপালা মেলে বাড়তে লাগল। অন্ধকার বনে একা পথে হাটতে আমার আলো কিংবা সাহস কোনটাই লাগেনা। পুরো বন-পাহাড়ী যেন আমার পঞ্চইন্দ্রিয়ের মতই আরেক ইন্দ্রিয় হয়ে গেছে। সপ্তম ইন্দ্রিয়। সব মিলিয়ে 'ভালো আছি' এবং 'ভালো নেই' এর ভরকেন্দ্রে বাস করছি যেন।

এমন সময়ই 'লাল' ভাইয়ের সাথে আমার প্রথম পরিচয়।

সেদিন খুব বৃষ্টি ছিল। শেষ বিকেলে কাঁথামুড়ি দিয়ে জম্পেশ একটা ঘুমের আয়োজন করছি। মাথার উপর টিনের চালে বৃষ্টির 'সোনাটা' বাজছে অনেকটা 'দাদরা' আর 'একতালা'র মিশ্র তালে। ঘুমের জন্য যথোপযুক্ত সময়। এমন সময় বৃষ্টিতে যাকে বলে একেবারে কাকভেজা হয়ে ঘরে ঢুকলেন 'লাল' ভাই। ছোটখাটো মানুষ। চঞ্চল। জীবনে এই প্রথম দেখলাম উনাকে। তাই চিনতে পারিনি। আম্মা পরিচয় করিয়ে দিলেন উনার কাজিনের এই ছেলেটির সাথে। আমাদের লাল ভাই।

লালভাই বোহেমিয়ান মানুষ। উনি ঘুরে বেড়ান সারা দেশ। কখন কোথায় থাকেন, তার কোন ঠিক নেই। এবার এলেন প্রায় ১০ বছর বাদে। এই ১০ বছর তার কোন খোঁজ কেউ জানতোনা। লালভাইকে দেখে আম্মা অনেক অবাক হয়েছিলেন বলে একটু কৌতুহল হয়েছিল। এতক্ষণে তার কারণ জানা গেল। আম্মা জিগ্যেস করলেনঃ 'এতোদিন পরে কোত্থেকে এলি?' সে তার ডায়েরি দেখিয়ে বললো 'এটাতে লেখা আছে পুরো ভ্রমণ বৃত্তান্ত। বলতে ইচ্ছে করছেনা।' তার আচরণে মনেই হচ্ছেনা, এতদিন পরে ভূতের মত উদয় হওয়াতা আসলে একটা অদ্ভুত ঘটনা। নির্বিকার ভাবে আমাদের খোঁজ খবর নিয়ে যাচ্ছেন। আম্মা বললেন, 'বিয়ে করেছিস?'
: হুমম। এই ধরিত্রীকেই বিয়ে করেছি ক'বছর হল।
আম্মা হাল ছেড়ে দিলেন। বুঝলেন একে কোন প্রশ্ন করে লাভ নেই। অনেকক্ষণ গল্প হল। তিনি আমাদেরকে অনেক গল্প শোনালেন। সুন্দরবনের গল্প, বর্মীদের গল্প, দার্জিলিং, সুমাত্রা আরো কত গল্প! রাতে খাবার সময় তার চোখ পড়লো হারমোনিয়ামের উপর।
: কে বাজায় এটা?
আমি বললামঃ আপা
: তুই শিখিসনি?
: এই একটু আধটু।
: সরগম জানিস?
: তালিম নিচ্ছি আপার কাছেই।
ওকে। এখন গানের আসর হবে; ঘোষণা দিলেন তিনি।
হলও তাই সবাই গান করলাম একের পর এক। তিনি কেবল শুনলেন।
সবশেষে হারমোনিয়ামে হাত বুলাতে বুলাতে হঠাৎ বাজাতে শুরু করলেন। তিনি যে গান জানেন, একবারও বলেন নি। অবাক হবার পালা শেষ করতে পারিনি, কারণ, তাঁর নিঁখুত কন্ঠে তখন বাজছে শ্যামল মিত্রের বিখ্যাত গান, "কি নামে ডেকে বলব তোমাকে, মন্দ করেছে আমাকে ওই দুটি চোখে।" একে একে শোনালেন শ্যামল মিত্রের আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা থাকে, মান্না দে'র তীর ভাঙ্গা ঢেউ আর নীড় ভাঙ্গা ঝড়, সহেলি গো কি নামে তোমায় বল ডাকি, হেমন্তের পথের ক্লান্তি ভুলে, আর ভূপেন হাজারিকার- প্রতিধ্বনি শুনি, গঙ্গা বইছো কেন আর আমি এক যাযাবর।

এতো সুন্দর গানের গলা! শুনলাম তিনি কোলকাতায় ছিলেন চার বছর। ওখানে ওস্তাদ পিন্টু ভট্টাচার্যের কাছে তালিম নিয়েছেন। তাঁর ভবঘুরে জীবনে, অনেকের কাছেই গান শিখেছেন। গানটা তার নেশা।

সে রাতে অনেক দেরি করে ঘুমাতে গেলাম।

সকালে উঠে দেখি, উনার বিছানা ফাঁকা। আলনায় ঝুলানো ক্যাম্বিসের ব্যাগটা নেই। টেবিলের উপর ডায়েরির কিছু ছেঁড়া পাতা; তাতে আগের রাতে উনার গাওয়া সব ক'টি গানের স্বরলিপি লেখা।

সবশেষে লিখা একটি শব্দঃ চলি।

তারপর লালভাইয়ের সাথে আর কোনদিন দেখা হয়নি। উনাকে প্রথম এবং শেষ দেখি ১৪ বছর আগে। অথচ সেই দেখার স্মৃতিটা এতো স্পষ্ট, যেন আগের রাতে দেখা কোন ছায়াছবির মত। অদ্ভুত সেই লোকটা।

ভবঘুরে এই মানুষটা, যেন চোখের সামনে জীবনের দূর্দান্ত একটা উদাহরণ রেখে গেল। সে অপেক্ষা করতে জানেনা। করাতে জানে।

ছবিসুত্রঃ আন্তর্জাল
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই অক্টোবর, ২০১১ রাত ১১:১৬
১৬টি মন্তব্য ১৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিষন্ন মেঘের ভেলায় ভেসে....

লিখেছেন ইন্দ্রনীলা, ০২ রা মে, ২০২৬ রাত ১০:২৯



তোমাকে শুধু একটাবার বড় দেখতে ইচ্ছা করে...
এই ইচ্ছায় আমি হয়ে যাই একটা ঘাসফড়িং
কিংবা আসন্ন শীতের লাল ঝরাপাতা,
উড়ে যাই ভেসে যাই দূর থেকে দূরে...
অজানায়...

শরতের কাঁশফুলের পেঁজা তুলো হয়ে
ফুঁড়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গ্রেইস

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ০৩ রা মে, ২০২৬ রাত ২:০৯


এরা সাড়ে তিনফুট থেকে চারফুট দীর্ঘ,ছোট খাটো,পাতলা গড়ন বিশিষ্ট। চোখগুলো খুব বড়, নাক দৃশ্যমান নয়,ত্বক ছাই বর্ণের,অমসৃণ এবং কুঁচকানো। উন্নত প্রযুক্তি সম্পন্ন। পুরোই... ...বাকিটুকু পড়ুন

মায়ের বুকের ওমে শেষ ঘুম

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৩ রা মে, ২০২৬ সকাল ১০:৪৯



আমার নাম তৃশান। সবে তো স্কুলে যাওয়া শুরু করেছি। আজ আমার খুব আনন্দ! বাবা-মা, দিদি আর দাদু-দিদুন মিলে আমরা মস্ত বড় একটা নৌকায় ঘুরছি। দিদি বলছিল এই জায়গাটার নাম জবলপুর।... ...বাকিটুকু পড়ুন

হিন্দু মুসলমান ভুলে গিয়ে, আমরা সবাই মানুষ হই

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা মে, ২০২৬ দুপুর ১:৫৭

আমি জন্মগত ভাবে মুসলমান।
অবশ্য ধর্মীয় নিয়ম কানুন কিছুই মানতে পারি না। মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে মানুষ। এখন তো আর এটা ফকির লালনের যুগ না। মানবিক এবং সচেতন মানুষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

নান্দাইলের ইউনুস ও স্বপ্নভঙের বাংলাদেশ

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৩ রা মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০


নব্বইয়ের দশকে বিটিভিতে প্রচারিত হুমায়ূন আহমেদের একটি জনপ্রিয় নাটকে একজন ভাড়াটে খুনীর চরিত্র ছিল। ভাড়াটে খুনীর নাম ইউনুস - নান্দাইলের ইউনুস। গ্রামের চেয়ারম্যান তার প্রতিদ্বন্দ্বী একজন ভালো মানুষ স্কুল শিক্ষককে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×