আমার জাতিসংঘ শান্তি মিশনে থাকাকালীন সময়ের আত্মউপলব্ধি...
আমার জন্ম আশির দশকে... এই সভ্যতার অনেক কির্তীর সাক্ষী আমি, আমরা। তবুও বলতে হয় গড়েছি না যত তার চেয়ে বেশী ভোগ করছি মনে হয়; কারন বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন করতে হয়নি, ভাষার জন্য রক্ত দিতে হয়নি, নিজ দেশে পরবাসী হতে হয়নি, মাতৃভূমির স্বাধিকারের জন্য মুক্তিযোদ্ধ করতে হয়নি... এ সবই আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের ত্যাগের বিনিময়ে পেয়েছি। যে সকল মহত প্রাণ এই অর্জনগুলোর গর্বিত অংশীদার তাদের অনেকেই আজ এ দুনিয়াতে নেই কিন্তু তারা আছেন আমাদের মাঝে তাদের কীর্তির মধ্য দিয়ে। তাদের এ কীর্তি আজ সর্বজন স্বীকৃত কিন্তু ঠিক কজন আমরা এ কির্তীর স্বাদ, মর্ম উপলব্ধি করতে পারছি বা করার সুযোগ পেয়েছি, অন্তত বিজয়ের স্বাদটুকু? এ বিজয়ের অনেক গল্প আমরা শুনেছি, গল্প শুনেই তা আমাদের মনে এক গভীর দাগ কেটেছে... আজ এ দূর দেশে আমি মনে হয় সে বিজয়ের স্বাদ কিছুটা হলেও উপলব্ধি করতে পারছি আমার জাতিসংঘ শান্তি মিশনে কাজের সুবাধে। আজ প্রায় তিন সপ্তাহ পরে এই দেশ আইভরি কোস্টে যুদ্ধ শেষ হয়েছে। বিশ্ব শান্তির স্বপক্ষের শক্তি বিজয় লাভ করেছে। বিশ্ব শান্তির কর্মী হিসেবে আমিও আজ এ বিজয়ের অংশীদার।আমিও যে গত তিন সপ্তাহ এ যুদ্ধের এক সক্রিয় পক্ষ। আমিও এ যুদ্ধে অস্ত্র হাতে পাহারায় থেকেছি, বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরে বিনিদ্র রজনী কাটিয়েছি, যুদ্ধের ফ্রন্ট লাইনে হেলিকপ্টার নিয়ে উড়ে গিয়েছি, শত্রুর গুলির মুখে নিজের কর্তব্য পালন করেছি, জংগল থেকে কুড়িয়ে আনা কাসাভা নিজের সহকর্মীর সাথে ভাগ করে খেয়েছি, এবং আরো অনেক কিছু যা আমাকে যুদ্ধের স্বাদ পুরোপুরি দিয়েছে। আর আমরাও পিছপা হয়নি আমাদের দায়িত্ব পালনে, দেশ আমাদের নয় তো কি হয়েছে? এ বিশ্বটা তো আমার.. আমার দুনিয়ার শান্তির জন্যে আমি সৈনিক, বিশ্বশান্তির অতন্দ্র প্রহরী নির্ঘুম রাত পার করব না তো কে করবে? এই শ্বাপদসংকুল তিনটি সপ্তাহ পরে আজ যখন যুদ্ধের শেষ বাশি বাজল, যখন আমার সকল উদ্বেগ উ্তকন্ঠার অবসান হলো তখন আমার মনে পরছে বাবার মুখে শোনা মুক্তিযোদ্ধ শেষে বিজয়ের গল্পগুলো। আজ আমি উপলব্ধি করতে পারছি ঐদিন এই বাংলা বদ্বীপে কি আনন্দের বন্যা বয়েছিল। কত সুখঅশ্রু বয়ে গিয়েছিল এই বাংলাদেশের মানুষগুলোর গন্ডদেশে। আমিতো আমার এই যুদ্ধে তোমাদের তুলনায় কিছুই করিনি, রক্ত দেইনি, বাবা মা , ভাই বোন কিছুই হারাইনি তবুও আজ আমার কত আনন্দ, কত স্ফুর্তি, আর তোমরা কত না ত্যাগ স্বীকার করেছো, কতো কষ্টের বিনিময়ে ঐ স্বাধীনতা পেয়েছিলে.. তোমাদের বিজয়ের ঐ আনন্দ আজ আমি কিছুটা হলেও উপলব্ধি করতে পারছি। আমার এ যুদ্ধ অভিগ্গতার একমাত্র প্রাপ্তি ঐটুকুই যে আমি আমার পূর্বপুরুষদের কৃতিত্ব আজ উপলব্ধি করতে পারছি। এতোদিন যা বই পরে কিংবা গল্প শুনে নিজেকে বিশ্বাস করাতে হতো তা আজ আমি আমার সমস্ত অন্তরাত্মা দিয়ে বিশ্বাস করি, উপলব্ধি করি। আমরা আজকের এই প্রজন্ম তোমাদের জন্য গর্বিত। তোমাদের এই অর্জন আজ আমাদের অহংকার। আজকের দিনে আমি সকল মুক্তিযোদ্ধাদের পরম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। আমি জানিনা আমার এই কামনা তোমাদের কাছে পৌছাবে কিনা, তবুও তোমরা দোয়া করো আমরা যেন আমরা তোমাদের যোগ্য উত্তরসূরী হতে পারি। তোমাদের শত কষ্টের অর্জন এই বাংলাদেশের সম্মান সমুন্নত রাখতে পারি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



