
ড্রয়ারের একদম কোণায় পড়ে থাকা প্লাস্টিকের পুরনো কার্ডটা হাতে তুলে নিতেই আঙুলের ডগায় একটা চিলতে কাটা লাগার মতো চিনচিনে ব্যথা হলো। স্ক্র্যাচ কার্ডটার ওপর ধূসর হয়ে যাওয়া কমলা-হলুদ লোগোটা মুছে যাওয়ার জোগাড়—'djuice'।
২০০৬ সালের এক পড়ন্ত বিকেলের কথা মনে পড়ে গেল। টিএসসির মোড়ে আড্ডার মাঝেই পকেটের শেষ দশটা টাকা দিয়ে একটা ডিজুসের স্ক্র্যাচ কার্ড ঘষে রিচার্জ করা হয়েছিল। তখন আমাদের পুরো জেনারেশনটার গায়ে একটা অদৃশ্য সিলমোহর মারা ছিল—আমরা ছিলাম ‘ডিজুস জেনারেশন'। আমাদের বাইকের হ্যান্ডেলবার, খাতার মার্জিন, আর বুকের ভেতরটা জুড়েই ছিল এক অদ্ভুত তারুণ্যের উন্মাদনা। পকেটে টাকা থাকুক বা না থাকুক, চোখের কোণে এক আকাশ স্বপ্ন আর একটা সস্তা সিম কার্ড থাকলেই মনে হতো পৃথিবীটা আমাদের মুঠোয়।
আর সেই পৃথিবীতে বৃষ্টির আগমন ছিল ঠিক বৈশাখী ঝড়ের মতো আকস্মিক।
চারুকলার সামনের ছায়াঘেরা রাস্তায় এক বিকেলে বৃষ্টির ফোঁটার হাত ধরে যার সাথে পরিচয়, সে দ্রুতই আমার জীবনের সবটুকু জুড়ে বসেছিল। আমাদের প্রেমটা তো ফেসবুকের বা ইনবক্সের সহজলভ্যতা দিয়ে মাপা ছিল না। আমাদের প্রেম বেঁচে ছিল রাত দশটা থেকে সকাল আটটার ওই ম্যাজিক আওয়ারে। ডিজুস টু ডিজুসের ফ্রি মিনিট আর নামমাত্র কলরেটের অফারগুলো যেন আমাদের জন্য রূপকথার দরজা খুলে দিত।
রাত দশটা বাজার সাথে সাথেই পকেটের নকিয়া ১১০০ ফোনটা কেঁপে উঠত। ওপাশ থেকে বৃষ্টির মিষ্টি, ক্লান্ত গলার ফিসফিসানি ভেসে আসত—"কিরে, লাইন পেয়েছিস?" সারাদিনের ক্লান্তি তখন এক নিমিষে উধাও হয়ে যেত। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতে বলতে ফোনটা গরম হয়ে যেত, কানের লতি লাল হয়ে উঠত, কিন্তু মনের না বলা কথাগুলো ফুরোত না। বৃষ্টি ফিসফিস করে বলত, "ফারহান, এই রাত কি আর কখনো শেষ হবে না?" আমি জানলার বাইরে থমকে থাকা জোছনার দিকে তাকিয়ে বলতাম, "রাত ফুরোলেও আমাদের এই ডিজুস জেনারেশনের গল্প কখনো ফুরোবে না রে পাগলী।"
সেই গল্পগুলোর সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যাত্ব ছিল ডিজুস কনসার্টগুলো। ঢাকা কিংবা কনকনে শীতের কোনো মাঠে যখন ডিজুসের গ্রাউন্ড কনসার্ট বসত, তখন মনে হতো আমরা কোনো ঘেরা পৃথিবীতে নেই। অর্থহীন, ব্ল্যাক আর্টসেল, শিরোনামহীন, নেমেসিস কিংবা ক্রিপটিক ফেইথের জাদুকরী গিটারে হাজারো তরুণের গলা মিলিয়ে গান গাওয়ার সেই উন্মাদনা আজও গায়ে কাঁটা দেয়।
কনসার্টের উপচে পড়া ভিড়, চারপাশে ধোঁয়া ওঠা চা, ঘাম আর নিকোটিনের গন্ধ, আর স্টেজের নিয়ন আলোর ঝলকানিতে যখন কানফাটানো মিউজিক বাজত—বৃষ্টি তখন আমার হাতটা শক্ত করে খামে মুড়ে রাখত। ভিড়ের ধাক্কায় সে যখন হারিয়ে যেতে চাইত, আমি তাকে আরও শক্ত করে টেনে বুকে জড়িয়ে ধরতাম। কানের কাছে মুখ নিয়ে সে চিৎকার করে বলত, "ফারহান, গানটা শুনতে পাচ্ছো?" আমি তার চুলে মুখ গুঁজে বলতাম, "শুনতে পাচ্ছি না রে বৃষ্টি, কিন্তু তোকে দেখতে পাচ্ছি! এটাই আমার সব!"
আজকের এই যুগে ফাস্ট ইন্টারনেট আছে, চোখের পলকে ভিডিও কল হয়, গিগাবাইটের পর গিগাবাইট ডাটা আছে—কিন্তু সেই রাতের বেলা ঘড়ির কাঁটা দশটা ছোঁয়ার রোমাঞ্চ কোথায়? কোথায় সেই মধ্যরাতের আকুলতা আর প্রিয় মানুষটার গলা শোনার তীব্র অধৈর্য? সেই ডিজুস ব্র্যান্ডটাও আজ কর্পোরেট বিলবোর্ডের আড়ালে হারিয়ে গেছে, যেমন হারিয়ে গেছে আমাদের সেই সোনালী তারুণ্য।
আর বৃষ্টি? সেও আজ অন্য কোনো শহরের, অন্য কোনো অচেনা জীবনের ব্যস্ত স্রোতে হারিয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে ফেসবুকে অচেনা মানুষের কোনো অ্যালবামে তার ছবি ভেসে উঠলে বুকটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে।
আজ পুরোনো স্ক্র্যাচ কার্ডটার দিকে তাকিয়ে চোখের কোণ গলে এক ফোঁটা নোনাজল এসে পড়ল স্ক্রিনটার ওপর। আজ সব আছে, শুধু সেই সময়টা নেই, সেই মানুষটা নেই। তবুও, নিস্তব্ধ এই মধ্যরাতে হুট করে ঘরের পুরনো দেয়ালগুলো কেমন যেন কথা বলে ওঠে। মনে হয়, কোনো এক অদৃশ্য ফ্রিকোয়েন্সি থেকে এখনো বুঝি ভেসে আসছে সেই চেনা সুর—আর কানের কাছে কেউ একজন ফিসফিস করে বলে উঠছে—
"হ্যালো... শুনতে পাচ্ছো?"
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





