somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আজও আমি ফিরে আসি কিসের টানে?

২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ। ঢাকা সিটি কলেজের সামনে বাস থেকে নেমে দাঁড়িয়ে আছি। ঝিনুক স্টার কাবাবে অপেক্ষা করছে। গন্তব্য খুব বেশি দূরে নয়, হেঁটে গেলে মিনিট তিনেক—কিন্তু আজ কেন যেন সময়গুলো খুব ধীর। বাসে থাকা অবস্থায় ঝিনুক বেশ কয়েকবার কল করেছে, টের পাইনি। মোবাইলের স্ক্রিনে এখন জ্বলছে-নিভছে অজস্র মিসড কল। কল ব্যাক করব সেই উপায় নেই, মোবাইলে এক পয়সা ব্যালেন্স নেই।
কী অদ্ভুত এক উদাসীনতা! রাস্তা পার হলেই দোকান, কিন্তু কে জানে কেন, আমার পা দুটো যেন আজ পাথরের মতো ভারী।

​হঠাৎ করেই বাতাসে স্টার কাবাবের ঝাল ফ্রাই আর কাবাবের সেই চেনা ঘ্রাণটা ভেসে এলো। খিদেটা পেটের ভেতর চনমন করে উঠছে। রাস্তাটা পার হচ্ছিলাম। খুব দ্রুত, খুব স্বাভাবিকভাবে। আচমকা কে যেন এসে ধাক্কা দিল। আমি উল্টে পড়ে গেলাম। ছিটকে পড়ার আগে শেষ যে শব্দটা শুনলাম, তা এক মেগাসিটি বাসের আর্তনাদ।

​রাস্তার ধূসর কংক্রিটে পড়ে আছি। একটা লোক পড়ে আছে সামনে। সম্ভবত ঐ লোকটা যে আমাকে ধাক্কা দিয়েছিল। তার শার্টের ভেতর দিয়ে উষ্ণ কিছু একটা গড়িয়ে পড়ছে—রক্তের দাগ ক্রমশ চওড়া হচ্ছে। উৎসুক জনতা ঘিরে ধরেছে লোকটাকে। বাসের ভাঙচুর, মানুষের চিৎকার—সবই যেন অনেক দূরের, অস্পষ্ট কোনো সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড সাউন্ডের মতো। আমি আর দাঁড়ালাম না। আমার ভীষণ তাড়া। সম্ভবত ঝিনুক অনেকক্ষণ ধরে বসে আছে, এই চিন্তাটাই আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। তবে মনের মধ্যে এক অদ্ভুত অস্থিরতা লাগছে পরে থাকা মানুষটার জন্য। লোকটা আমাকে হয়তো বাঁচাতে গিয়েছিল।

​দ্রুত পায়ে স্টার কাবাবের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। কাঁচের দেয়ালের ওপাশে ঝিনুককে দেখা যাচ্ছে। তার সামনে ধোঁয়া ওঠা কাবাব, সাজানো ঝাল ফ্রাই। সে আনমনে আমারই অপেক্ষা করছে। ভেতরে ঢুকে তার সামনে চেয়ারে বসলাম। ঝিনুক আমার দিকে তাকালো। তার কাজল কালো চোখদুটো আজ কেন জানি বড্ড বেশি বিষণ্ণ। আমি হেসে কিছু বলতে চাইলাম—কোনো একটা সরি বা অজুহাত—কিন্তু শব্দগুলো আমার গলার কাছে এসেই যেন বরফের মতো জমে গেল।

​হঠাৎ এক গভীর নিস্তব্ধতা আমার ভেতরে নামতে শুরু করল। ঝিনুকের চোখের বিষণ্ণতা ক্রমশই গাঢ় হচ্ছে, যেন সে আমাকে দেখতে পাচ্ছে না, অথবা দেখলেও অন্য কোথাও খুঁজছে। সামনে রাখা সেই লোভনীয় কাবাব আর ঝাল ফ্রাইয়ের ঘ্রাণ—যা একটু আগেই আমার স্নায়ুগুলোকে অস্থির করে তুলেছিল—এখন আর পাচ্ছি না। এমনকি বাতাসের কোনো গন্ধই আমার নাকে পৌঁছাচ্ছে না।

​আমি হাত বাড়িয়ে টেবিলের ওপর রাখা মোবাইলটা ধরতে চাইলাম। কিন্তু আমার হাতটা যেন শূন্যতাকে স্পর্শ করল। ঝিনুক তার দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমারই পড়ে থাকা মোবাইলটার দিকে তাকাল—সেখানে আমার পাঠানো শেষ টেক্সটটা হয়তো এখনো ঝুলে আছে।

​আমি বুঝতে পারলাম, আমার আর কোনো কল ব্যাক করার প্রয়োজন নেই। আমি মারা গেছি—এই সত্যটুকু বুঝতে আমার অনন্তকাল সময় লেগে গেল। আমার ফেলে আসা দেহটা এখনো সেই রাস্তার মোড়ে পড়ে আছে।

আমি আসলে অনন্তকালের এক অদ্ভুত টাইম লুপে আটকে গেছি। এই একই বিষণ্ণ বিকেল, ঠিক পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ মিনিট—বারবার আমাকে ফিরে আসতে হবে এখানেই। যেখানে ঝিনুক অপেক্ষায় থাকে, আর আমি কেবল এক অদৃশ্য ছায়ার মতো তাকে দেখি। এই শহরে আমি এখন এক চিরন্তন ভবঘুরে, যেখানে কোনো গন্ধ নেই, কোনো স্পর্শ নেই। আমি নিঃসঙ্গ, পুরোপুরি একা।

আমি এই ইট-পাথরের দেয়ালগুলো ভেদ করে বেরিয়ে পড়ি। আবার সেই রাস্তার মোড়, আবার মেগাসিটি বাসের আর্তনাদ, আবার সেই একই রক্তমাখা শার্ট—সবকিছু যেন এক চক্রে ঘুরছে। আমার কানে তখন বারবার বাজতে থাকে সেই সুর:
"আজও আমি ফিরে আসি কিসের টানে?
সব কিছু মনে রাখি কি কারণে?"


​আমি জানি, বারবার ঠিক এই সময়েই আমি স্টার কাবাবের দিকে দৌড়াবো। আমার এই ছুটে বেড়ানো কখনো শেষ হবে না। কারণ ঝিনুক এখনো অপেক্ষা করছে, আর আমি এই শহরের গোধূলিতে মিশে যাওয়া এক অনন্ত আর্তনাদ।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৬
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দোষটা কি কপালের, নাকি রক্তের.... :-0 :-ls :#|

লিখেছেন সাইবার সোহেল, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:৫১

ঐতিহাসিক ভাবেই মনে হয় এই ভুখন্ড বা এই অঞ্চলের জনগন একটু বেশীই লোভী, আত্নকেন্দ্রিক, আর চরমমাত্রার স্বার্থপর । এবং যুগযুগ ধরে এটা চলমান থাকার কারণে আমাদের রক্তের সাথে মিশে... ...বাকিটুকু পড়ুন

চাপ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৩১



রাজধানী ঢাকা সহ দেশের নানা অঞ্চলে টমটম, অটোরিক্সা, নসিমন, করিমন চলাচল করে। বেশ মানুষজন পরিবহন সহ মালামালের বস্তাও টানাটানি করতে দেখা যায়। কিন্তু এইগুলোর দেশ হচ্ছে গ্রাম গঞ্জের বাজার আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার সমাধিতে কোনো ফলক রেখো না

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৭:৪৪


আমার সমাধিতে কোনো ফলক রেখো না
আমার ডক্টর উপাধিটি মুছে দিও
জ্ঞানী, কবি, দরবেশ, সাধক, সফল, ব্যর্থ
এসব কোনো শব্দই যেন
মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আমাকে আলাদা না করে।

কারণ আমি দেখেছি
অহংকার খুব সূক্ষ্ম... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৮ বছর পর্যন্ত সবাই শিশু!

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:৫৬

১৮ বছর পর্যন্ত সবাই শিশু!

শিশুর অধিকার রক্ষা অবশ্যই সভ্য সমাজের দায়িত্ব। কিন্তু প্রশ্নটা তখনই কঠিন হয়ে ওঠে, যখন ১৭ বছর ১১ মাস ২৯ দিন বয়সী কেউ ধর্ষণ বা হত্যার মতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফুনফুনা ফুন

লিখেছেন রাজীব নুর, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৩৩



ছয় হাজার হাজার আগে পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিলো মাত্র দশ লাখ।
হ্যা দশ লাখ। পুরো পৃথিবীর সব জায়গায় মানুষ থাকতো না। বনজঙ্গল ছিলো। আর সমুদ্র এবং নদী। পাহাড় পর্বত।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×