
আয়নার ওপাড়ে — The Mirror Effect
প্রস্তাবনাঃ
কিছু ঘটনা আছে, যেগুলো কাউকে বলা যায় না। বললে মানুষ বিশ্বাস করবে না।
হয়তো হাসবে।হয়তো বলবে—ভ্রম হয়েছে।
কয়েক বছর আগে আমার স্ত্রী ময়মুনা মাঝে মাঝে শোবার ঘরের ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অদ্ভুতভাবে স্থির হয়ে যেত।
মিনিটের পর মিনিট। কোনো নড়াচড়া নেই।
পলকহীন চোখে শুধু নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে থাকা।
একদিন আমি পেছন থেকে ডেকে বলেছিলাম,
— “কী দেখো ওখানে?”
ও কোনো উত্তর দিল না।
দীর্ঘ এক নীরবতা ভেঙে খুব নিচু, কাঁপা কাঁপা গলায় শুধু বলেছিল—
“মনে হয়… ওটা আমি না।”
আমি অবুঝের মতো হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলেছিলাম,
— “তাহলে কে? তোমার ভূতুড়ে ভূত?”
ময়মুনা কোনো উত্তর দেয়নি।
ওভাবেই পাথর হয়ে আয়নার দিকে তাকিয়ে ছিল।
সেদিন কথাটা আমি উড়িয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু কিছু কথা আমরা ভুলে গেলেও…
আয়না সেগুলো কখনো ভোলে না।
আয়নার ওপাড়ে — The Mirror Effect
দুপুরবেলা। ময়মুনা গোসল করে শোবার ঘরে ফিরল।
চুল থেকে তখনো ফোঁটায় ফোঁটায় পানি গড়াচ্ছে, এক হাতে শক্ত করে ধরে আছে ভেজা শাড়ির আঁচল। ভ্যাপসা গরমের মাঝেও হঠাৎ একটা হিমশীতল বাতাস যেন ঘরটাকে ছুঁয়ে গেল।
ময়মুনা ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়াল। ঠিক তখনই… কী যেন একটা অস্বাভাবিকতা ওর চোখে পড়ল।
ও খেয়াল করল—আয়নার ভেতরের ময়মুনার ডান হাতটা শরীরের পাশে ঝুলছে।
কিন্তু বাস্তবের ময়মুনার ডান হাত তখনো শক্ত করে আঁচল খামচে ধরে আছে।
বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। ময়মুনা ধীরে ধীরে নিজের হাতটা নামাল।
আয়নার ভেতরের মেয়েটাও হাত নামাল।
ময়মুনা আবার হাত তুলল।
ওটাও তুলল।
সব ঠিক।
তবুও… বুকের গভীরে কিছু একটা কুঁকড়ে গেল।
কারণ আয়নার ময়মুনা একবারের জন্যও ওর চোখের দিকে তাকায়নি। তার দৃষ্টি স্থির ছিল ময়মুনার ভেজা কাঁধের উন্মুক্ত ত্বকের ওপর।
তারপর…
আয়নার ওপাশের ঠোঁট দুটো নড়ল।
কিন্তু ঘরে কোনো শব্দ হলো না। কান পাতলে শুধু শোঁ শোঁ একটা আওয়াজ।
ময়মুনা কেবল অনুভব করল একটা বরফ-ঠান্ডা ফিসফিসে কণ্ঠ তার কানের গভীরে আছড়ে পড়ল—
“তুমি খুব সুন্দর…”
ময়মুনার গলা শুকিয়ে কাঠ।
“তোমার শরীরটা আমাকে দাও…”
“আমি বাইরে আসতে চাই।”
ময়মুনা এক পা পিছিয়ে যেতে গেল।
ঠিক তখনই আয়নার কাচটা কেঁপে উঠল। শুধু কাঁপা নয়—কাচটা যেন নিমেষে রূপ নিল জমাট বাঁধা কোনো তরলে।
আর সেই তরল কাচ ভেদ করে বেরিয়ে এল একটা বরফ-শীতল, ফ্যাকাশে হাত!
আঙুলগুলো সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরল ময়মুনার কবজি।
ময়মুনা চিৎকার করতে গেল, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। অদৃশ্য এক শক্তি তাকে হেঁচকা টানে কাচের ওপারে টেনে নিয়ে যাচ্ছে…
ঠিক তখনই পাশের ঘর থেকে আমি ডেকে উঠলাম—
— “ময়মুনা?”
কোনো সাড়া নেই।
একটু উচাটন মনে আবার ডাকলাম—
— “ময়মুনা!”
গভীর নীরবতা।
পায়ের রক্ত হিম হয়ে এল। আমি দৌড়ে শোবার ঘরে ঢুকলাম।
ময়মুনা মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে আছে। তার শরীরটা বরফের মতো ঠান্ডা।
সামনের ড্রেসিং টেবিলের আয়নাটা তখনো থরথর করে কাঁপছে। কাচের নিচ গলে গলে চুইয়ে পড়ছে পারদের মতো রুপালি, বিষাক্ত তরল।
আর আয়নার ঠিক মাঝখানে ঝুলছে একটা কাচের চুড়ি।
ময়মুনার হাতের চুড়ি!
আমি আতঙ্কে আয়নার দিকে তাকালাম।
সেখানে একটু আগে একটা মুখ ভেসে উঠল—ময়মুনার মুখ।
কিন্তু সে মুখে কোনো আতঙ্ক নেই। আছে এক বিকৃত, শীতল হাসি।
মুহূর্তের মধ্যে সেই মুখটা কাচের গভীরে তলিয়ে গেল।
আর পেছনে রেখে গেল কয়েকটা ভেজা হাতের তাজা ছাপ।
লাল। রক্তের মতো গাঢ় লাল।
আমি কাঁপতে কাঁপতে ময়মুনাকে কোলে তুলে নিলাম।
ঠিক তখনই ড্রয়িংরুমের ঘড়িতে টিক… টিক… শব্দে ঘড়ির কাঁটা ছুঁল দুপুর তিনটা।
হঠাৎ ময়মুনার শরীরটা প্রবলভাবে কেঁপে উঠল।
তারপর… সে যেন নিজেই উঠে বসল।
আমি স্বস্তির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলতে যাচ্ছিলাম।
কিন্তু গলাতেই আটকে গেল সেই শ্বাস।
কারণ, ময়মুনার চোখ দুটো পাল্টে গেছে। সম্পূর্ণ কালো। মণিদুটো অদৃশ্য।
সে আমার দিকে তাকাল। ঠোঁটে সেই চেনা হাসি, কিন্তু গলার স্বরটা আমার চেনা নয়—
— “আমি ময়মুনা।”
আমি ভয়ে পেছনে সরে গেলাম দেয়াল ঘেঁষে।
সে বিকৃত হাসিতে আবার বলে উঠল—
— “কিন্তু আমি সেই ময়মুনা নই।”
সে তার লম্বা আঙুলটা তুলল আয়নার দিকে।
“...আসল ময়মুনা ওখানে।”
আমি ভয়ার্ত চোখে আয়নার দিকে তাকালাম। ফাঁকা কাচ। কুয়াশায় ঢাকা।
পরমুহূর্তেই ময়মুনার শরীরটা একটা ভয়ংকর কোণায় মুচড়ে গেল। হাড় ভেঙে যাওয়ার মটমট শব্দ শোনা গেল ঘরজুড়ে।
সে কোনো মানুষ নেই আর। চার হাত-পায়ে টিকটিকির মতো মেঝেতে নেমে এল।
তারপর সোজা দেওয়াল বেয়ে উঠে গেল ছাদের দিকে। উল্টো হয়ে ছাদের গায়ে সেঁটে সে আমার দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগল। তার মাথাটা প্রায় পুরোটা ঘুরে গেল পেছনে।
ঠিক সেই মুহূর্তে—ড্রেসিং টেবিলের নিচে জমে থাকা রক্তমাখা পারদের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল অজস্র কালো হাত!
একটা। দুটো। তারপর শতটা।
তারা আমার পা শক্ত করে খামচে ধরল। আমি নড়তে পারলাম না।
পিশাচের মতো হাতগুলো আমাকে শূন্যে টেনে নিয়ে গেল… সোজা আয়নার সেই পারদের গভীরে।
চোখ খুললাম।
আমি বিছানায় শুয়ে আছি।
সকালের নরম আলো এসে পড়েছে ঘরের জানালায়। চারপাশ একদম স্বাভাবিক, শান্ত।
ড্রেসিং টেবিলের আয়নাটা নিখুঁত, অক্ষত।
আমি বিছানায় বসে কপাল ঘাম মুছলাম।
নিজেকে বারবার বোঝালাম—সবটা স্বপ্ন। মাথার কোনো গোলমাল থেকে তৈরি হওয়া ভয়ংকর এক দুঃস্বপ্ন।
তখনই বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল।
ময়মুনা বিছানায় নেই।
বাথরুমের দরজাটা সামান্য ফাঁক করা।
ভেতর থেকে ময়মুনার মিষ্টি পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল—
— “হাসান… আমার চিরুনিটা কোথায় দেখেছ?”
আমি অপলক তাকিয়ে রইলাম দরজার দিকে। শরীরটা অসাড় হয়ে আসছে।
ধীরে ধীরে বিছানা ছেড়ে পা বাড়ালাম।
ঠিক তখনই কাঁধে অনুভব করলাম একটা পৈশাচিক হিমশীতল স্পর্শ।
কাঁপা হাতে কাঁধ ছুঁয়ে দেখলাম—চারটে বরফ-ঠান্ডা আঙুলের রক্তিম ছাপ বসে আছে সেখানে।
আমার রক্ত হিম হয়ে গেল। আমি বুঝলাম—আমি কোনো স্বপ্ন দেখিনি।
ময়মুনা সত্যি বাইরে বেরিয়ে এসেছে।
অথবা… আমি নিজেই বন্দি হয়ে গেছি ওপারে।
পাগলের মতো আমি ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাতেই পিনপতন নীরবতা নেমে এল। আমার পা দুটো কাঠ হয়ে গেল।
কারণ, আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি—
আয়নার ভেতরের “আমি” সেখানে নেই।
সে বসে আছে আমার বিছানায়।
আর তার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে… ময়মুনা।
তার চোখ দুটো জলে ভেজা। দুই হাত কাচের ওপাশ থেকে আমার দিকে বাড়িয়ে সে ঠোঁট নাড়ল—
“হাসান… আমাকে বের করো…”
আমি আঁতকে উঠে পেছনে ফিরে তাকালাম।
আমার ঠিক পেছনেই ময়মুনা দাঁড়িয়ে!
সে মিটিমিটি হাসছে। তারপর খুব শান্ত, ভিনদেশি এক গলায় সে ফিসফিস করে বলল—
“ওকে বিশ্বাস করো না।”
পাগলের মতো আমি আবার আয়নার দিকে তাকালাম।
এবার ময়মুনার সেই প্রতিবিম্বের পাশে ভেসে উঠল আরেকটা মুখ।
তারপর আরও একটা। তারপর দশটা। শতটা!
অন্ধকার আয়নার বুক চিরে একে একে হাজারটা চোখ একসঙ্গে খুলে গেল।
সবগুলো দৃষ্টি শুধু আমার দিকে স্থির।
হিমশীতল অন্ধকারের গভীর থেকে তখন একটা সম্মিলিত ফিসফিসানি ভেসে এল পুরো ঘরে—
“পরের জন কে?”
সতর্কতা:
আয়না শুধু আপনার প্রতিবিম্ব দেখায়—এটা ধরে নেওয়াটাই হয়তো আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল।
কারণ কিছু কিছু আয়না… প্রতিবিম্বের চেয়েও অনেক বেশি কিছু দেখায়।
তাই গভীর রাতে, একা, অন্ধকার ঘরে—একদৃষ্টিতে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে থাকবেন না।
কারণ আপনি যাকে আপনার প্রতিবিম্ব ভাবছেন…
সে হয়তো আপনি নন।
আর যদি কোনোদিন মনে হয়—
আয়নার ভেতরের মানুষটা আপনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে একটুও নড়ছে না…
তাহলে আর ভুলেও কখনো পেছনে ফিরে তাকাবেন না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

