somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জেমস: প্রথম যে কণ্ঠে আমার কৈশোর জেগেছিল

০৩ রা অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




জেমসকে প্রথম শুনেছিলাম প্রেমে বা বিরহের গান দিয়ে নয়।
মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকা একজন মানুষের কণ্ঠ দিয়ে।
গানটির নাম—
“জেল থেকে বলছি।”

১৯৯৩ সাল।আমি তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। গান শুনতাম।
তবে গান তখনও আমার জীবনের কোনো বিশেষ জায়গা দখল করে নেয়নি। বাংলা ব্যান্ডের গানও শুনেছি অনেক। ভালো লেগেছে, আবার ভুলেও গেছি।
কোনো গান তখনও বুকের ভেতর এসে বসেনি।

তারপর একদিন শুনলাম—
“জেল থেকে বলছি।”
কী হলো জানি না।
গানটা শোনার পর মনে হলো—
বাংলা ব্যান্ডের গান বোধহয় এমনও হতে পারে!
এটা শুধু একটা গান নয়।
এ যেন একটা গল্প।
একজন মানুষ বন্দি। সামনে মৃত্যুর অপেক্ষা। চারপাশে পাথরের দেয়াল। আকাশ নেই, চাঁদ-তারা নেই। অথচ মৃত্যুর এত কাছে দাঁড়িয়েও তার মনে পড়ে একজন মানুষকে।
তার মুখ।
তারপর সেই লাইনটা—
“অবুঝ মনটা শুধু চায় যে নিতে
তোমার চুলের মৃদু গন্ধ।”


আমি তখন ক্লাস ফাইভের একটা ছেলে।
প্রেম কী, তার কতটুকুই বা বুঝি!
চুলের মৃদু গন্ধের মধ্যে কী এমন জাদু লুকিয়ে আছে, সেটাও জানি না।

তাহলে কেন এই দুটো লাইন আমাকে আটকে দিল?
আজ এত বছর পর মনে হয়—
সম্ভবত সেদিন আমি প্রেম বুঝিনি।
আমি বুঝেছিলাম "আকুলতা"।

কাউকে খুব কাছে পাওয়ার ইচ্ছেটা বুঝেছিলাম, যদিও তখনও জানতাম না সেই অনুভূতির নাম কী।
হয়তো গান আসলে এভাবেই আমাদের বড় করে।
আমরা যখন কোনো অনুভূতির নাম জানি না, গান তখন তার একটা নাম দিয়ে দেয়।

পরে যখন একটু বড় হলাম, তখন জেমসকে নতুন করে আবিষ্কার করলাম।
জানলাম, এই গানটা শুধু কোনো বন্দি মানুষের ব্যক্তিগত হাহাকার হয়ে থাকেনি। নব্বইয়ের শুরুর অস্থির সময়, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের আবহ, মানুষের ভেতরের ক্ষোভ আর মুক্তির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গেও গানটির নাম ও চিত্রকল্প নানা শ্রোতার স্মৃতিতে জড়িয়ে আছে।
তখন বুঝলাম—
কিছু গান আমরা যখন শুনি, তার পুরো ইতিহাস আমরা জানি না।
শুধু অনুভব করি।
তারপর সময় আমাদের সেই গানের পেছনের গল্পগুলো খুলে দেয়।

১৯৯৩-এর সেই ক্লাস ফাইভের ছেলেটা অবশ্য এসব কিছুই জানত না।
সে জানত না জেমস কে হয়ে উঠবেন।
জানত না, একদিন তাঁকে মানুষ নগর বাউল বলে ডাকবে।
জানত না, এই কণ্ঠ একটা প্রজন্মের প্রেম, বিরহ, অভিমান, একাকিত্ব আর বিদ্রোহের সঙ্গে মিশে যাবে।
সে শুধু জানত—
জেমসের গলা শুনলে বুকের ভেতর কেমন একটা অদ্ভুত শব্দ হয়।
সেই ছিল আমার জেমসকে চেনার শুরু।
তারপর বহু বছর কেটে গেছে।
ফিলিংসের জেমস থেকে নগর বাউল জেমস।
ক্যাসেট থেকে সিডি,
সিডি থেকে ডিজিটাল পৃথিবী।
আমিও বদলেছি।
কিন্তু ১৯৯৩-এর সেই ছেলেটা পুরোপুরি বদলায়নি।
আজও “জেল থেকে বলছি” শুনলে সে কোথা থেকে যেন ফিরে আসে।
ক্লাস ফাইভের একটা ছেলে।
যে প্রেম বোঝেনি,
বিরহ বোঝেনি,
মৃত্যু বোঝেনি—
শুধু একটা গান শুনে হঠাৎ বুঝে গিয়েছিল,
কিছু কিছু গান কানে শোনা যায় না।
বুকের কোথাও গিয়ে আটকে থাকে।

আর আশ্চর্যের ব্যাপার কী জানেন?
আজ এত বছর পর বুঝি—
সেদিন আমি আসলে জেমসের গান শুনিনি।
আমি প্রথমবার একটা কণ্ঠের শক্তি শুনেছিলাম।
একটা কণ্ঠ কীভাবে একটা গল্পকে শরীর দিতে পারে, একটা শব্দকে স্মৃতি বানাতে পারে, একটা অচেনা অনুভূতিকে নিজের অনুভূতি মনে করিয়ে দিতে পারে—তার প্রথম পাঠ নিয়েছিলাম সেই গান থেকে।

তাই আজ জেমসের জন্মদিনে তাঁকে শুধু একজন গায়ক বলে শুভেচ্ছা জানাতে ইচ্ছে করছে না।
কেউ কেউ শিল্পী হন।
কেউ কেউ নায়ক হন।
আর কেউ কেউ একটা সময়ের সঙ্গে মিশে যান।
জেমস আমাদের কাছে সেই তৃতীয় মানুষটি।

১৯৯৩ সালে যে কণ্ঠটা আমার ছোট্ট পৃথিবীটাকে একটু অন্যরকম করে দিয়েছিল, আজও সেই কণ্ঠ শুনলে মনে হয়—
সেই ছেলেটা কোথাও যায়নি।
সে এখনও গানটা শুনছে।
হয়তো এখনও সে জানে না প্রেম কী।
শুধু জানে—
কোনো এক অদ্ভুত কারণে
একজন মানুষের চুলের মৃদু গন্ধের কথা শুনলেই
তার বুকের ভেতর কেমন একটা শূন্যতা তৈরি হয়।
আর সে অবাক হয়ে ভাবে—
একটা গানের ভেতর এতটা জীবন কী করে থাকে!
শুভ জন্মদিন, গুরু।
শুভ জন্মদিন, জেমস।

আপনার কণ্ঠে আমাদের কৈশোরের অনেক রাত আজও বেঁচে আছে।

— স্বপ্নবাজ সৌরভ
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৩৪
৪টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কবিতা প্রেমিকদের কলমে সময়ের বিবেক : বিশ্ব কবি রবিন্দ্র নাথ ঠাকুরের গ্রাফিতেতে কালী লেপন প্রসঙ্গ

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৫:৩৪


যে কবির গানে ভোরের আকাশ জেগে ওঠে প্রতিদিন
যাঁর সুরে আজও অশ্রু ঝরে হাসে হৃদয় রঙিন
সেই রবীন্দ্রনাথের ছবির বুকে কালি মাখায় যারা
তারা কি জানে তাঁরই গানে বাঙালির প্রাণের... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাসূল (সা.), আহলে বাইত ও সাহাবায়ে কেরামের (রা.) অনুচিত কাজের সমালোচনা ও সমর্থন করা যাবে না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৫:৪১




সূরাঃ ৮ আনফাল, ৬৭ থেকে ৬৯ নং আয়াতের অনুবাদ-
৬৭।দেশে ব্যাপকভাবে শত্রুকে পরাভূত না করা পর্যন্ত বন্দী রাখা কোন নবির উচিত নয়। তোমরা পার্থিব সম্পদ কামনা কর। আল্লাহ চান... ...বাকিটুকু পড়ুন

সমাধি

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:৩৯



ফুরিয়ে গেলেও ফিরে আসা যায় বটে
শুধু মানুষ ফুরিয়ে গেলেই ফেরে না মানুষ।
খুব কাছাকাছি আকাশ;
জানালা খুলে একদিন ছুঁয়ে টের পেলাম-
হায় কৃত্রিম আকাশ!
তাই তো কখনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

রঠার মুসলিম বিদ্বেষ

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:১৮



রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর সংক্ষেপে রঠা এর ছোট গল্প "রীতিমত নভেল" এ রঠা মুসলমান শব্দের সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করেছেন ‘যবন’। যবন অর্থ অসভ্য, ম্লেচ্ছ, অপবিত্র, বর্বর জাতি, যেকোনো বিদেশি ইত্যাদি ইত্যাদি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

সন্ত্রাসী অধ্যাপক ড.ইউনূস!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৬


গত সোমবার নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি বিমানবন্দর থেকে হুইলচেয়ারে বের হওয়ার সময় অধ্যাপক ইউনূসকে হেনস্তা করার ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে৷ এতে দেখা যায়, অধ্যাপক ইউনূসের দিকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×