somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কবি,কবিতা এবং সাম্প্রতিক সময়ে আমরা

১৬ ই জুন, ২০১৬ রাত ১১:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কেউ যদি আমার কাছে জানতে চায় বাংলা ও বাঙালীকে বোঝার , সেই সুপ্রাচীন অতীত থেকে বর্তমানের বাঙালী মনকে বোঝার সবচেয়ে সহজ উপায় কি?
আমি বলবো বাংলা কবিতা।একথা শুনে কেউ যেনো মনে না করে আমি নিজেকে বাংলা কবিতার সমঝদার প্রমানের চেষ্টা করছি।আসলে তা নয়।বাস্তবিক অর্থেই আমি কবিতা অনেক কম বুঝি,কাঁটাছেড়াও করতে পারিনা।পরীক্ষার হলে কোনো একটা চরনের অন্তনর্নিহিত ভাব প্রকাশ করতে বললে আমার কালোঘাম ছুটে যায়।
.
আসলে বাংলা কবিতাকে খুব সাধারনভাবে অনুভব করার জন্য অতো ব্যাখ্যা বিশ্লেষনের প্রয়োজন হয়না।খুব মন দিয়ে পড়লে এমনিতেই অদ্ভুত একটা মাদকতা ভর করে।কি সুন্দর পলিমাটির দেশ।মাটির মাঝে সোনা মেশানো।বিস্তৃত পথঘাট,তাতে হেটে চলে অদ্ভুত জীবনধারার কিছু মানুষ,পথের ধারে উচু বৃক্ষ,নিচে ঝড়া পাতা,সেখানে খেলা করে কোমরে ঘুঙুর জড়ানো নগ্নগাত্র শিশু।বিশাল সব আবাদী জমি।তাতে পরিশ্রমী মানুষগুলোর ঘাম শস্যে পরিনত হয়।মাঝে মাঝে আবার এখানে ঝড়ো হাওয়ার সাথে বৃষ্টির অবতারনা হয়।হাস্যজ্জল পল্লিবধুরা তখন ঠিক ঠিক অবাধ্য গবাদী পশুটাকেও গোয়ালে পোড়ে।
.
সবই অদ্ভুত সুন্দরের খেলা।আর আমাদের মত সাধারন মানুষের কাছেই যখন জিনিসগুলো এতো সুন্দর তখন কবিদের চোখে যে তা একটু বেশী সুন্দর হয়ে ধরা দেবে তাই তো স্বাভাবিক।তাই এখানে মরমী কবি লালনের জন্ম হয়,দ্রোহের,প্রেমের কবি নজরুলের জন্ম হয়,প্রকৃতিপ্রেমী জীবনানন্দের জন্ম হয়।আর এই পলীমাটিতে পা দিয়ে,পদ্মার তীরে শ্বাস নিয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ খুজে ফেরেন তার জীবনের সার্থকতা।তাদের কবিতা পড়া মানে শুধু কবিতা পড়া নয়,তাদের কবিতা পড়া,লেখা গান শোনার অর্থ হচ্ছে নিজ মূলকে চিনতে পারা,আপন ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করতে পারা।
.
আমার মতো দীনহীন মানুষ আসলে শুধু কবিতার ফিলোসফি কপচাতে এই লিখা লিখতে বসেনি।তুচ্ছ এই মানুষটার আসলে বিশেষ কিছু কারনে মন খারাপ।মন খারাপ সাড়াতে তাই সে অক্ষরগুলো নাড়াচাড়া করছে।
.
মাঝে মাঝে খুব কষ্ট হয় এই দেখে যে আমাদের দেশের বৃহত্তর বাঙালী সমাজ কবিতাটাকে ঠিক আপন করে নিতে পারেনা।অর্ধশিক্ষিত,অপশিক্ষায় শিক্ষিত,কুসংস্কারে দীক্ষিত এই আমরা ধীরে ধীরে সবকিছুর সাথে কবিতার মাঝেও নোংরা রাজনীতি মেশাচ্ছি।কবিতায় ব্যবহৃত রূপক,ভাবের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য সম্বন্ধে আমরা খুব অল্পজনই প্রকৃত জ্ঞান রাখি।এবং এই অজ্ঞানতার সাম্প্রতিক ফলাফল গুলো হচ্ছে খুব ভয়াবহ।
উদাহরন স্বরূপ মাধ্যমিক পর্যায়ে কিছু নতুন বাংলা কবিতার সংযোজন এবং বৃহত্তর নাগরিক সমাজে তার প্রতিক্রিয়ার কথা বলা যেতে পারে।কবিতার মতো সুন্দর জিনিসকে যে এমন বিকৃত ভাবেও উপস্থাপন করা যায় তা দেখে আমি স্তম্ভিত হয়েছি।
সবগুলোর কথা বলা দরকার নেই।সবচেয়ে আলোচিত একটি কবিতার কথা বলি।সপ্তম শ্রেনীতে পাঠ্য এটি। কবিতার নাম “বাংলাদেশের হৃদয়”।কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।এটি নিয়ে মূল যে অভিযোগ তা হলো,এতে দেবী দূর্গার প্রশংসা করা হয়েছে।হায়রে শিক্ষিত সমাজ।আচ্ছা আপনারা কবি নজরুল এর “বিদ্রোহী” কবিতাটা শুনেছেন?কিংবা “সাম্যবাদী” কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো?তিনি কিন্তু নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মজাত শব্দে আটকে রাখেননি।রূপকার্থে যখন যা ইচ্ছে হয়েছে ব্যবহার করেছেন।কই তার সেসব কবিতার আবেদন তো আপনাদের কাছে নষ্ট হয়নি??

“বাংলাদেশের হৃদয়”।কবিতাটা খুব প্রিয় আমার।প্রথম দিকে গান হিসেবেই শুনতাম।রক্তে নেশা ধরানো সব কথা।
.
“ আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি
তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী!
ওগো মা, তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে!
তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে॥“
.
এই চারটা লাইন সবচেয়ে ভালো লাগতো।আসলে মূল বিষয় যেটা সেটা হচ্ছে কবিগুরু পূর্ববঙ্গে এসেছিলেন জমিদারী সূত্রে।এখানে এসে শহুরে কবি প্রকৃতিকে অবলোকন করেছিলেন এক ভিন্ন মাত্রায়।বাংলা দেশে লেখা তার কবিতা গল্প গুলো খেয়াল করলেই সেটা বোঝা যায়।এখানে আসার পূর্বে কবি পূর্ববঙ্গ সম্বন্ধে তেমন অবহিত ছিলেন না।যা ধারনা ছিলো তার মধ্যে নেতিবাচকতার মাত্রাই ছিলো বেশী।কিন্তু এখানে এসে তার সে ধারনায় ছেদ ঘটে।তিনি আবিষ্কার করেন অসীম বিক্রমে সাহসী এক বাংলাকে।তাই বলেন-
.
“ ডান হাতে তোর খড়্গ জ্বলে, বাঁ হাত করে শঙ্কাহরণ,
দুই নয়নে স্নেহের হাসি, ললাটনেত্র আগুনবরণ।
ওগো মা, তোমার কী মুরতি আজি দেখি রে!
তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে ॥

তোমার মুক্তকেশের পুঞ্জ মেঘে লুকায় অশনি,
তোমার আঁচল ঝলে আকাশতলে রৌদ্রবসনী!
ওগো মা, তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে!
তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে।।"
.

কবি এখানে এসে খুঁজে পান পদ্মাকে তার আপন মহিমায়,দেখতে পান কৃতি প্রকৃতির অবারিত সম্পদে ঘেরা প্রানবৈচিত্রে ভরপুর এক সোনার বাংলা।তাই তিনি একে মন্দির সমতুল্য বলে মূল্যায়িত করেন।নিজের পূর্বধারনার ব্যতয় বোঝাতে বলেন-
.
যখন অনাদরে চাইনি মুখে, ভেবেছিলেম দুঃখিনী মা,
আছে ভাঙ্গা ঘরে একলা পরে, দুঃখের বুঝি নাইকো সীমা।
কোথা সে তোর দরিদ্র বেশ, কোথা সে তোর মলিন হাসি,
আকাশে আজ ছড়িয়ে গেল, ঐ চরণের দিপ্তীরাশি,
ওগো মা তোমার কী মুরতি আজি দেখি রে!
তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে,
আজি দুঃখের রাতে, সুখের স্রোতে ভাসাও ধরণী,
তোমার অভয় বাজে হৃদয় মাঝে, হৃদয়হরণী।
ওগো, মা তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফেরে!
তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে।

.
মোটকথা গোটা কবিতাটাই সুন্দর।বাংলাদেশের গুনকীর্তনই এখানে মুখ্য বিষয়।তাই শুধু শুধু এতে সাম্প্রদায়ীকতার বিষবাষ্প ছানো নিছকই মুর্খতা।কি দরকার এতে নোংরা রাজনীতি টেনে আনার?যেই বাচ্চা গুলো কবিতাগুলো পাঠ্য হিসেবে পড়ছে তারা তো সাম্প্রদায়িকা বোঝনা।তারা বঝে মানুষ,বোঝে প্রকৃতি,বোঝে বাংলাদেশ।
দিনশেষে এরাই আমাদের মূল।স্বীকার করুনআর না করুন।
ভালো থাকুক কবিতারা।ভালো থাকুক সবাই।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই জুন, ২০১৬ রাত ১১:০০
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নজির

লিখেছেন সাইফুলসাইফসাই, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:০২

নজির
সাইফুল ইসলাম সাঈফ

সুখ নাই, আনন্দ নাই, নাই শান্তি
একলা চলতে চলতে উদাসী
আত্মভোলা, মনভোলা, বেখেয়ালি
প্রতিমুহূর্ত লাগে যেন গোধূলি!
আমার ব্যক্তিত্বে, চিন্তা, চেতনায়
কেউ আটকায় না, হয় না আকৃষ্ট!

নিঃসঙ্গ বিষাদযুক্ত ঘুরতে ঘুরতে
হয়ে গেছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্বাস আর সংগ্রামই একদিন সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করবে

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:০২



আওয়ামী লীগের ইতিহাস কোনো সহজ পথে হাঁটেনি। রক্ত, ত্যাগ আর সংগ্রামের ভেতর দিয়ে এই দলের জন্ম, আর সেই জন্মসূত্রের গৌরব আজও অক্ষুণ্ণ- ণ্কারণ ইতিহাস সাক্ষী, এই দল কখনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মক্তব চালু করলে শিশুরা ফিরে আসবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:৪২


ববি হাজ্জাজ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী। মুসা বিন শমসেরের ছেলে। মন্ত্রী হওয়ার পর থেকে পুরো দেশ চষে বেড়াচ্ছেন। নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন, নতুন নতুন আইডিয়া দিচ্ছেন। মনে হয়,... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঁধনের কেন ফেমিকন লাগে !!!

লিখেছেন অপলক , ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:৩৪



বাঁধন এখন বন্ধন মুক্ত। মিডিয়া পাড়ায় সরব উপস্থিতি। উপর মহলের ডাকে সারা দিতে হয়। কাজেই ফেমিকন লাগতেই পারে। মানে ফেমিকনের এ্যাড করা লাগতেই পারে। মিডিয়া আইকন হিসেবে জনসচেতনাতা বাড়াতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“উন্নয়নের দুর্ভিক্ষে বাংলাদেশ”

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৮



বাং/লাদেশের মূর্খ জনগণ উন্নয়নের চেয়ে কথিত ফ্যাসিবাদকে বড় করে দেখেছে কিন্তু “উন্নয়নের দুর্ভিক্ষ” কি জিনিস তা দেখেনি।

দেখতে থাকুক….। আর ভাতের দুর্ভিক্ষ শুরু হলে বলে…..।

ফ্যাসিবাদ দূর করতে গিয়ে উন্নয়নই "নাই"... ...বাকিটুকু পড়ুন

×