এই মুহূর্তে আমরা জাতীয়ভাবে একটি সংকটের মধ্যে আছি। নানামুখী সংকট। আমার চাই যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া (মামলা, রায়, অ্যাপীল, রায় কার্যকর) স্মুথ থাকুক। দীর্ঘসূত্রীতা না হোক। সকল যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হোক। নিশ্চিত হোক ন্যায়বিচার। শান্তি পাক প্রতিটি শহীদের আত্না এবং তাঁদের পরিবার। সমুন্নত থাকুক আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। আবার উল্টোদিকে আমাদেরকে আমাদের প্রভুরাষ্ট্রদের শাসানিও সইতে হচ্ছে। প্রতিটা রায়ের সঙ্গে সঙ্গে জামাতশিবিরের হরতালও হজম করতে হচ্ছে। দয়ার সাগর পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো, জাতিসংঘ এবং সাথে মানবাধিকার-ওয়াচের মত সার্কাস পার্টিগুলো খুব বেশী সরব থাকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের মানবাধিকার নিয়ে। সম্ভবত বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটিই একমাত্র রাষ্ট্র, যেটি তারই স্বাধীনতাযুদ্ধের বিরোধীদের জন্য সর্বোচ্চ গণতন্ত্র নিশ্চিত করেছে। এতটা গণতন্ত্র তার দেশের সাধারণ আম-পাবলিকের জন্যও কখনো হয়নি| না সংসদে, না ক্যাবিনেটে, না দোকানে/বাজারে, না শিক্ষায়, না চিকিৎসায়, এমনকী অনলাইনে লেখালেখিতেও।
আদালতের রায় পছন্দ না হলে আমরা অসন্তোষ প্রকাশ করে থাকি| সেটা করবার অধিকার প্রতিটি নাগরিকেরই আছে। গণজাগরণ মঞ্চও কারো কারো রায় নিয়ে অসন্তোষ জ্ঞাপন বা প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু তার কিছু ধরণ-ধারণও আছে। আদালতের আদেশ-নির্দেশ মাথা পেতে নিতে না পারার অর্থ আদালতের অবাধ্যতা। সেরকম অবাধ্যতাটুকুর খাতিরে আপীল নামক বিষয়টি চালু হয়েছে। পাশাপাশি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে “সন্তুষ্ট নই” কথাটি ছড়িয়ে দিতে রাজপথে মিছিল-মিটিং করা যায়, মানববন্ধন, সাংবাদিক-সম্মেলন, গণস্বাক্ষর সংগ্রহ কিংবা স্মারকলিপি প্রদান, অনলাইনে প্রচার- এরকম অনেক কাজই করা যায়। কেউ যদি আদতেই ন্যায়বিচার চায়, তাহলে সে অবশ্যি ন্যায়সঙ্গত পথে এগুবে। কিন্তু রায় মনঃপূত হলনা বলে রীতিমত হরতালের মত ধ্বংসাত্নক কর্মসূচী আহ্বান করা, নাশকতা চালানো(বা চেষ্টা করা), বোর্ড পরীক্ষার মত রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বাধ্য করা স্পষ্টতই আদালত অবমাননার শামিল।
তাবৎ বিশ্বের বহু দেশে নানান যুদ্ধের যুদ্ধাপরাধের বিচার হয়| কোনো দেশে এমন কোনো নজির নেই যে, বিচার চলাকালীন এবং বিচারে দন্ডপ্রাপ্ত ব্যাক্তিদের পক্ষে তাদের গঠিত/পরিচালিত/নেতৃত্বাধীন সংগঠন সে দেশে হরতালের মত কর্মসূচী পালন করেছে...!! শুধু কী হরতাল??? ট্রাইব্যুনালের সাক্ষীদের হত্যার হুমকী দেয়া হয়, কতজনকে হত্যা ও গুম পর্যন্ত করা হয়েছে!!! ট্রাইব্যুনালের বিচারপতিদের বাড়ির সামনে ককটেল ফেলা হয়! বিচারপতিদের গ্রামের বাড়ি পর্যন্ত সশস্ত্র হামলা করা হয়েছে, তছনছ করা হয়েছে ঘরবাড়ি! এভাবে বাংলাদেশ তারই জন্মের অস্বীকারকারীদের এবং ঘৃণ্য মানবতাবিরোধী অপরাধীদের জন্যে “মানবাধিকার” ও গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে করতে এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, সেটা এখন আর শুধু বয়স বেশী বলে শাস্তি কম,সরকারী হাসপাতালে রাজার হালে চিকিচ্ছা/খানাপিনায় শেষ নয়, বরং সেটা রাষ্ট্রীয় প্রোটেকশনে জানাযা ছাড়িয়ে আদালত অবমাননা ছাড়িয়ে আরও বহু অধিকার পারমিট করছে!! অথচ লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর মানবাধিকার বা গণতন্ত্র বলে কিছু নেই......!! হিউম্যান-রাইট-ওয়াচ, জাতিসংঘ ব পশ্চিমা প্রভুদের এইসব গল্প বলারও কেউ নেই....
যুদ্ধাপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তির সাথে সাথে আরও একটা দাবী গণজাগরণ মঞ্চ সহ অনেকেই করে আসছেন। সেটা হল জামাত-শিবির নিষিদ্ধের দাবী এবং সেইসাথে তাদের অর্থনৈতিক চাহিদার যোগানদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বাজেয়াপ্ত করা ও রাষ্ট্রীয়করণ করার দাবী।
নিজামী, মুজাহিদ এবং মির কাসেম এর রায়ের গুরুত্বপূর্ণ একটা দিক রয়েছে। বর্তমান ইসলামী ছাত্রশিবির নামধারী দলটি যে একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে যুক্ত আলবদর ও আলশামস বাহিনীর নামান্তরিত রূপ এবং রাজাকার বাহিনীর সহযোগী ও বর্ধিত শক্তিরূপে কাজ করেছে- ঐ রায় তিনটিতেই অবজারভেশন হিসেবে ব্যাপারটি এসেছে। ইসলামী ছাত্রশিবির (জামাতে ইসলামী তো বটেই) কে পরবর্তীতে নিষিদ্ধ করতে এই অবজারভেশনগুলো কাজে দেবে। সুতরাং সংগঠন হিসেবে জামায়াতের বিচার করাটা এখন এই চলমান আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পক্ষে খুব সোজা কাজ। বিজ্ঞ ট্রাইব্যুনালের এ বিচারটি না করবার কোনো কারণ নেই; যদি নাও করে থাকেন, তবে আমাদের দেশীয় প্রচলিত আইনের আওতায়ই বিচারটি করা সম্ভব।
ইদানিংকালে একটি টিভি চ্যানেলে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ড. সরোয়ার আলীর মুখে শুনলাম, এ বছরেরই কোনো এক সময়ে তিনি সহ কয়েকজন একবার আইনমন্ত্রীর সাথে
সাক্ষাত করেছেন। মন্ত্রীর কাছে জানতে চাওয়া হয় যে জামাত নিষিদ্ধের ব্যাপারে সরকার গড়িমসি বা আপত্তি করছে কেন। আইনমন্ত্রী জানান যে, একটা আইনগত দূর্বলতা রয়েছে। সংগঠন হিসেবে তাদেরকে বিচারের কাঠগড়ায় আনা যাবে কিন্তু কী শাস্তি দেয়া হবে বা আদৌ তেমন দৃষ্টান্তমূলক/কার্যকরী শাস্তি দেয়া যাবে কিনা, সেটা নিয়ে তাঁরা সন্দিহান। আইনের ফাঁকটি পূরণ না করে বা সংশোধনী না এনে তাঁরা অভিযোগ গঠন করতে পারছেন না।
জামাত বা ইসলামী ছাত্রশিবির যদি নিষিদ্ধ হয়েই যায়, তাহলে কী হবে???
অনেকেই বলেন তারা হয়ত আন্ডারওয়ার্ল্ডে চলে যাবে। আমার ধারণা খুব বেশী পরিচিত মুখগুলো হয়তবা আন্ডারওয়ার্ল্ডে যেতে পারে, কিন্তু বিশাল সদস্যবাহিনী ও বিপুল কর্মী বাহিনী নয়। তাছাড়া এত সহজে ছাড়বার পাত্রও তারা নয়..!
অতএব, অন্য নাম নিয়েও তারা সংগঠন শুরু করতে পারে। অন্য কোনো নতুন নাম নিয়ে বা বিদ্যমান কোনো সংগঠনেও তারা ভীড়ে যেতে পারে। সুতরাং জামাত-শিবির নিষিদ্ধের আগে সবচয়ে জরুরী ও অপরিহার্য কাজটি হল, “দেশে ধর্মভিত্তিক-লিঙ্গবৈষম্যভিত্তিক-সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী কোনো রাজনৈতিক দল গঠন করা যাবেনা” - এধরণের যে ধারাটি আমাদের সংবিধানেই স্পষ্ট করে রয়েছে, সেটাকে আইন বা বিল হিসেবে পাস করিয়ে নেয়া।।।
সবাই জানে যে, জামাতের সাংগঠনিক মূলনীতি, ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্রের মধ্যে এমন কয়েক ডজন বিষয় আছে যেগুলো আমাদের দেশের সংবিধানের সরাসরি পরিপন্থি, আমাদের সংস্কৃতি পরিপন্থি এমনকী শান্তি ও মানবতার ধর্ম ইসলাম পরিপন্থীও!! সুতরাং, কেবল জামাতকে নিষিদ্ধ করলেই সব কাজ ফুরিয়ে যায়না, জামাতের মূলনীতি ও গঠনতন্ত্রের সাথে মিল রয়েছে, এমন যেকোন দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে হবে। এবং ভবিষ্যতেও যাতে জামাতের সাথে সাযুজ্যপূর্ণ মূলনীতি ও গঠনতন্ত্র বিশিষ্ট কোনো সংগঠন গঠিত না হয়, সে ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞা জারী করতে হবে।
কিন্তু সমস্যা হল, সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম বহাল রেখে এ কাজগুলো করা আদৌ সহজ নয়। সংবিধানকে অনেক কাটাছেঁড়া করা হলেও, আমাদের সংবিধানের ৪ মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক এই ধারাটি রদ কারা হয়নি আজো।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হল, জামাতশিবিরের গণসসম্পৃক্ততা। এ ব্যাপারে জামাতশিবিরের কৌশল অকল্পনীয় রকমের সুশৃঙ্খল!!! জাতশত্রু হয়েও আমাকে স্বীকার করতেই হয় তাদের সাংগঠনিক চাতুর্য ও দক্ষতা। অতি সুসজ্জিত ধনী গৃহের নামী-দামী স্কুলে পড়ুয়া বাচ্চারা কিংবা অতি দরিদ্র কোনো সিএনজি চালক- সবার মধ্যেই প্রভাব গেঁড়েছে জামাত ও শিবির। শ্রেণী-বৈষম্য বাদ দিয়ে প্রতি জনে জনে তাদের দলের অন্তর্ভূক্ত করা কিংবা নিদেনপক্ষ নৈতিক সমর্থন আদায় করার দূর্লভ কৌশল রয়েছে এই শক্তিশালী মাফিয়া নেটওয়ার্কটির। সবসময়ই যে তাদের রাজনৈতিক দর্শন প্রচার করে কাজ করে তা না। যাকে যেভাবে কব্জা করা সম্ভব- কখনো পবিত্র ইসলামের নাম ভাঙিয়ে, কখনো লীগ-বিদ্বেষ, কখনো পূর্বেথেকে শিবির করে এমন কোনো মেধাবী ছাত্রকে ব্যাবহার করে (অর্থাৎ শিবির করলে আমার মত রেজাল্ট করতে পারবা এ জাতীয় ব্যাপার), আর মাদ্রাসার হতদরিদ্র এতিম শিশুরা তো আছেই জন্ম থেকে তাদের কব্জায়। এমনকী পেশাগত জীবনে জামাতশিবিরের কেউ যদি পুঁজির অভাবে ব্যাবসা করতে না পারে, তাদেরকে পুঁজি দিয়ে ব্যাবসায় দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়, এমনই ডিটারমাইন! রাজনৈতিক না হোক, ধর্মভীরু মানুষজন অন্তত ধর্মের নাম শুনে হলেও তাদরে অনুগত হয়ে পড়ে। মেয়েদের উচ্চশিক্ষায় যথেষ্ট উৎসাহ অথচ পর্দা নিয়ে মোটেও বাড়াবাড়ি নেই, এমন পরিবারের মানুষদেরও (আমার ক্লাসমেটের মা) সাঈদির ফাঁসী না হবার জন্যে নফল নামায পড়তে শুনেছি আমি...!
তাই মাঝে মাঝে বড় হতাশ লাগে। আমার মনে হয় শুধু আইনগত হিসেব-নিকেশে জামাতশিবিরের মূলোৎপাটন সম্ভব নয় কখনো। আবহমান কালের বাঙালি-দর্শন ও সংস্কৃতিকে গণমানুষের জীবনের কাছে পৌঁছে দেয়া জরুরী। আমাদের এই মহিমান্বিত অঞ্চলটির বহুরকম সংগ্রামের ইতহাস- উপনিবেশবিরোধী আর্থ-সামাজিক এবং সশস্ত্র লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাসগুলো, এবং পরবর্তীতে ভাষাগত ও জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের ইতিহাস এবং সেই সংগ্রাম সমূহের পেছনে সক্রিয় ছিল যে চেতনা, তার সাথে গণমানুষকে পরিচিত করিয়ে দেয়া খুব বেশী জরুরী...! সেই সাথে পারিবারিক জীবনে, স্কুলে, মসজিদে- সবখানে ইসলামের মর্মবাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়াও সমান জরুরী।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



