
সুশীলদের মুখোশ ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি
ফকির ইলিয়াস
------------------------------------
খসে পড়েছে তার মুখোশ। তিনি মাহমুদুর রহমান মান্না। নাগরিক ঐক্যের ব্যানারে তিনি সুশীল সেজে গণতন্ত্রের উদ্ধার অভিযানে নেমেছিলেন। কী বলেছেন তিনি! কার সঙ্গে? এসব কথা এখন আর কারো অজানা নয়।
মান্নাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। এর আগে মান্না তার ফেসবুকে সর্বশেষ যে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন- তা পড়া যাক। মান্না লিখছেন, ‘দুটি কথোপকথন প্রসঙ্গে/সামগ্রিক ঘটনায় আমি বিস্মিত, দুঃখিত, মর্মাহত। এ পর্যন্ত আমার রাজনীতি জীবনে কখনো সহিংসতা, ষড়যন্ত্রকে প্রশ্রয় দেইনি। আমার অতীত ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে। যে দুটো সাক্ষাৎকার ছেপেছে পাঠকদের অনুরোধ করব যেন ভালো করে সেটা শোনা এবং পড়ে দেখার। কোথাও কোনো ষড়যন্ত্রের গন্ধ নেই, উসকানি নেই। সাদেক হোসেন খোকার সঙ্গে কথা হয়েছে আলাপচারিতার মতো আন্দোলনের প্রসঙ্গ এসেছে আমি বলেছি, গণতন্ত্রের দাবিতে আমি আন্দোলনে সমর্থন করি। সহিংসতা সমর্থন করি না। এ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ব্যাপক জনগণকে সংযুক্ত করার চেষ্টা করা উচিত। সহিংসতা দায়িত্ব নিয়ে বর্জন করা উচিত। এ আন্দোলনে এখনো ছাত্ররা অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। এ জন্যই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র আন্দোলন প্রতিষ্ঠিত ও বিস্তৃত করতে হবে। এটা করতে গিয়ে যদি পুলিশি বা সন্ত্রাসী হামলায় দু’চারজনের জীবনও যায় কিছু করার নেই। এমনিতেই তো মানুষ মরছে। আমার এই বক্তব্যকে বিকৃতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যেন আমি লাশ চাই। একইভাবে সেনাবাহিনীর কোনো কোনো কর্মকর্তা আমার সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী হলে বলব কিনা সে কথা জানতে চাইলে, আমি বলেছি রাজি আছি। আমি রাজনীতি করি সবার সঙ্গে কথা বলতে হয়। এটা থেকে এক এগারো বা সামরিক ক্যুয়ের ষড়যন্ত্রের আবিষ্কার হয় কিভাবে? যেখানে এরকম কোনো বৈঠকই হয়নি। দেশের এই যুগসন্ধিক্ষণে কারো চরিত্র হননের কাজ সংকটকে আরো ঘনীভূতই করবে। আমি আশা করি সবাই শুভ বুদ্ধিতে জাগ্রত হবেন এবং এই সংকটকে ইতিবাচকভাবে মোকাবেলা করবেন।’
এটা মান্নার প্রকাশিত সর্বশেষ কথা। তার কথার জের ধরেই কিছু প্রশ্ন এভাবে আসছে খুব সঙ্গত কারণে। মান্না সামরিক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হয়ে ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন। মান্না নিজেকে একজন রাজনীতিক দাবি করেন। তিনি ডাকসুর ভিপি ছিলেন। তিনি সামরিক জিওসিদের সঙ্গে কথা বলবেন কেন? এমন খায়েশ দেখাবেন কেন? কথা যদি বলতেই হয়- তিনি কথা বলবেন রাজনীতিকদের সঙ্গে। অবশ্যই অরাজনৈতিক কোনো সংস্থা কিংবা ব্যক্তির সঙ্গে নয়। অতীত ফিরে তাকালে আমরা দেখি, মান্না জাসদের রাজনীতি করতেন। পরে বাসদে যোগ দিয়েছিলেন। এরপরে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। এক সময় তিনি আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে বসেন। ফলে তাকে এই পদটি হারাতে হয়। এখানে আমার একটি প্রশ্ন আছে। তা হলো মান্না কি আসলেই আওয়ামী লীগের চেতনা মনে-প্রাণে লালন করতেন কিংবা করেছিলেন? আমার তো মনে হয় না। মনে হয় না এ জন্য, কারণ তিনি সব সময়ই মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাদী যে শক্তি- এর বিপরীতে জল ঢেলেছেন। তলে তলে হাত মিলিয়েছেন তাদের সঙ্গেই- যারা মূলত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শিকড় কাটতে চায় নানাভাবে।
সাদেক হোসেন খোকার সঙ্গে ফোনালাপে দেখা গেছে এক পর্যায়ে খোকা আন্দোলনের ওপর তিক্ততা দেখিয়েছেন। কিন্তু খোকাকে সাহস জুগিয়েছেন মান্না। মান্না ফোনালাপে কি কি কথা বলেছিলেন এর চুম্বক অংশ এখানে তুলে ধরা দরকার। খোকা বলছেন- ‘একটা হলো যে, গভর্নমেন্ট এই ধরনের জাতীয় আন্তর্জাতিক চাপের পরও তারা আলোচনার কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। এ সমস্যা সমাধানে তাদের কোনো ভ্রƒক্ষেপ নেই। এমতাবস্থায় আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া ছাড়া আমাদের জন্য কোনো উপায় খোলা নেই।
মান্না বলছেন- না না, খোকা ভাই না। মানে আপনি যেটা বলতে চেয়েছিলেন, সেটা বলেন। কিন্তু টোনটা একটু ডিফরেন্ট থাকতে হবে। সেটা হচ্ছে কি, একটা যে, আমরা কোনো সহিংসতার মধ্যে নেই। আমাদের এ রকম একটা অন্দরের মধ্যে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এটা একটা অবৈধ সরকার। অনির্বাচিত সরকার। আমরা তার কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জ করিনি। আমরা শুধু বলেছি, তুমি ভুল করেছো, কারেকশন করো। মান্না আরো বলছেন- সে জন্য এই আন্দোলন। সেই আন্দোলনটাকেও তারা এভাবে নস্যাৎ করার চেষ্টা করেছে। সেখানে আপনার এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিংয়ের উদাহরণগুলো সব তোলেন। তোলার পর বলেন, এটা একটা ন্যায্য আন্দোলন। এই ন্যায্য আন্দোলন থেকে সরে যাওয়ার কোনো পথ আসে না।
মান্না বলছেন- ওরা যে এত সহিংসতা সহিংসতা করেছে, এই সহিংসতা তারা নিজেরাও যে করেছে কত? এটা আপনাকে ক্লিয়ার করতে হবে যে, আপনি কোনোভাবেই সহিংসতার পক্ষে নন। কিন্তু ডেমোক্রেসির প্রশ্নে আলাপে দেখা যায়, মান্না মূলত বিএনপির কাঁধে বন্দুক রেখেই শিকার খুঁজছিলেন। যে জঘন্য কথাগুলো তার মুখোশ উন্মোচন করেছে তা হলো, ফোনালাপের এক পর্যায়ে তিনি বলেছেন- ‘আরেকটা বিষয় আমি ওই যে বলেছিলাম। কোনোভাবে ইউনিভার্সিটি নাকি এটা ভাবেন। দ্যাট শুড বি এনি কস্ট। যদি পারা যায়। আমি জানি না। এটা আরো আগে, মাস তিনেক আগে। খোকা বলছেন- করে ওরা। বাট এটা খুবই সীমিত।
মান্না বলছেন- ওটা তো ট্রাডিশনাল হয়েই গিয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগকে তো ডিভিডেন্ড দিচ্ছে…। মান্না আরো বলছেন- ধরেন, ইউনিভার্সিটিতে একটা মিছিল হলো। ধরেন যা মারামারি বাইরে হচ্ছে। ইউনিভার্সিটিতে মারামারিতে গেল দু-তিনটা। কি করা যাবে? কিন্তু আপনারা গভর্নমেন্টকে শেইক করে ফেললেন। এরপরে মান্না আরো বলছেন- আমি মাস তিনেক আগে বলেছিলাম, যে কোনোভাবেই হোক আপনি আগে ইউনিভার্সিটিতে দু-তিনটা হল দখল করেন। আগে এ রকম ছিল তো আমাদের। এই পাঁচটা হল আমাদের। ওই তিনটা হল তোমাদের। ওই দুইটা ওদের।’ কি ভয়ানক কথাবার্তা। মান্না প্রকারান্তরে হলের ভেতরে আন্দোলনের নামে খুন-খারাবি উসকে দিতে চেয়েছেন। তিনি হল দখলের কথা বলেছেন। ভাগ-বাটোয়ারা করে দেয়ার কথা বলছেন। আবার নিজের সর্বশেষ ফেসবুক স্ট্যাটাসে নিজকে ‘ফুলের মতো পবিত্র’ দাবি করেছেন। কি ভয়ানক ছিল তার পরিকল্পনা! ২০১৫ সালের বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শাণিত এই প্রজন্ম তা মেনে নেবে? মান্না তার ফোনালাপে টকশোগুলো নিজেদের দখলে রয়েছে বলেও দাবি করেছেন। আর কোন কোন সুশীল তার পক্ষে কথা বলছেন- সেই হিসেবও দিয়েছেন সাদেক হোসেন খোকাকে। আমরা লক্ষ করেছি, রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগেই বলেছিলেন টকশোর নামে সন্ত্রাসীদের উসকে দেয়া হচ্ছে। এসব মনিটরিংয়ের কথাও বলেছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। তার কথাগুলোই সত্য পরিণত হয়েছে।
মান্নার ফোনালাপে একজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির সঙ্গে কিছু কথোপকথন রীতিমতো রাষ্ট্রদ্রোহিতার আওতায় পড়ে। পড়া যাক এর কিছু অংশ- অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি বলছেন- ওকে ঠিক আছে। আমি তাহলে আপনাকে একজনকে দিয়ে কল করাব। আপনাকে জিওসি লেভেলে কল করাব? না আরেকটু সিনিয়র?
মান্না বলছেন- বুঝিনি, কথাটা শুনতে পাইনি। জুনিয়র সিনিয়র তো একটা ব্যাপার আছে। তার চেয়ে বড় কথা হচ্ছে যে ইফেক্টিভ যারা। এন্ড হু আন্ডারস্ট্যান্ড হু নো, এ রকম হলে ভালো। মানে যার সঙ্গে শেয়ার করা যাবে যিনি আমাকে এনলাইটেন করতে পারবেন। এবং মে বি আমিও তাকে বুঝতে পারব। বোঝাতে পারব। আর এটা তো সবাই সবাইকে বলতেও চায় না। সে রকম হতে হবে। ওই আলাপের দীর্ঘ অংশ পুরো দেশবাসী ইতোমধ্যে অনলাইনে, অফলাইনে পড়েছেন। এই অজ্ঞাতনামা লোকটি কে তা রাষ্ট্রপক্ষের জানা দরকার। জানা দরকার পুরো দেশবাসীর। একটা বিষয় খুব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, সুশীলদের আড়ালে একটি খলনায়ক গোষ্ঠী বর্তমান সরকারকে হটাতে চাইছে। পুরো দেশকে তারা অস্থিতিশীল করে তুলতে চাইছে। ভাবতে অবাক লাগে এই মান্নাকে এখনো কেউ কেউ তথাকথিত ‘কিংবদন্তিতুল্য’ বলতে চাইছে। আমাদের জানা আছে একাত্তরের ঘাতক-দালাল-রাজাকার শিরোমনি গোলাম আযমও ছাত্রনেতা ছিল। তাকেও ‘ভাষাসৈনিক’ বলে তার মওদুদীপন্থীরা। কিন্তু গোলাম আযমের প্রকৃত মতলব কি ছিল তা তো আমরা একাত্তরে দেখেছি। মান্নার বর্তমান অবস্থানও সেই গোলাম আযমের খুব কাছাকাছি। এটা বললে মোটেও ভুল হবে না।
মান্না হল দখলের নামে যে তরিকা খোকাকে বাতলে দিচ্ছেন তা প্রমাণ করে তিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ভুলে গেছেন। তার কথা প্রমাণ করে তিনি গণজাগরণের শাহবাগের কথা ভুলে গেছেন। কিংবা ওই গণজাগরণ মঞ্চকে তিনি স্বীকৃতি দেননি।’ দুতিনটা না হয় গেল- ‘বলে কি বুঝাতে চাইছেন মান্না? কার সন্তানের লাশ চান তিনি? তা পুলিশের গুলিতে হোক অথবা চোরাগুপ্তাই হোক। কি এসব বলছেন এই সুশীল নামের ভণ্ড? যারা মান্নার পাশে বসে মান্নার পক্ষেই টকশো করেছিলেন- তারাই আজ কথাগুলো বলছেন। তাহলে কী অর্থ দাঁড়ালো? অর্থ হলো এই- যারা সুশীলের লেবাসে ‘সংলাপ’ ‘সংলাপ’ বলে মুখে ফেনা তুলেছিল, এরা মূলত মৌলবাদী-জঙ্গিবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর পেইড এজেন্ট। এরা মাঠে বি টিম হিসেবে কাজ করছে। আমার ভাবতে খুব অবাক লাগে, ড. কামাল হোসেনের মতো ব্যক্তি আজ যা করছেন সেই ফসল গিয়ে উঠছে মৌলবাদী জামায়াতিদের ঘরে। অথচ এই ড. কামাল হোসেন বাংলাদেশের সংবিধান রচয়িতাদের একজন। প্রণেতাদের অন্যতম। তিনি জাতির জনকের আইন বিষয়ক অলিখিত পরামর্শক ছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠনের অন্যতম নীতিনির্ধারক ছিলেন। বলা যায় কাদের সিদ্দিকীর কথাও। তার কর্মকাণ্ড থেকে আজ ননী তুলছে সেই একাত্তরের পরাজিত শক্তি। যাদের বিরুদ্ধে একদিন নিজেই লড়েছিলন কাদের সিদ্দিকী।
আমি মনে করি যে কোনো সচেতন বাঙালির উচিত নয় এমন কিছু করা, যা থেকে এক টাকার সমপরিমাণ ফায়দা হাসিল করতে পারে মৌলবাদীরা। ওদের ফান্ডে একটি টাকা দেয়া, ওদের পক্ষে একটি কথা বলাও মহান শহীদদের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। আজ যে শক্তিগুলো গণতন্ত্র, অর্জন কিংবা দেশপ্রেমের কথা বলে রাষ্ট্র-সমাজ-প্রজন্মের আইওয়াশ করতে চাইছে, তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য কি তা এখন কারো অজানা নয়।
মান্না নাকি ইসলামী ব্যাংকের টাকায় ব্যবসা করে কোটি-কোটিপতি। না আমি তা নাজায়েজ বলছি না। তবে এই লোনের পেছনে মৌলবাদীদের কোনো ইনভেস্ট আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হোক। তার সঙ্গে আর কোন কোন সুশীল ষড়যন্ত্রে আছেন, কিংবা ছিলেন তাও বের করা হোক। মনে রাখা দরকার, কতিপয় বিপথগামী সেনাসদস্য জাতির জনককে সপরিবারে হত্যা করেছিল। এর সঙ্গে নেপথ্যে ছিল কিছু রাজনীতিক নামের কুলাঙ্গারও। না- বাংলাদেশের মাটিতে এমন কালোসাপ আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠুক তা চায় না এই অগ্রসরমান প্রজন্ম।
--------------------------------------------------
দৈনিক ভোরের কাগজ ॥ ঢাকা ॥ শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ প্রকাশিত
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ সকাল ৭:৫৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


