মানুষকে তার জীবনের কোন কাজকেই ছোট করে ভাবা অথবা দেখা উচিত নয়। বিশেষ করে মুসলিমদের জন্য এটা একান্তভাবেই ভাবা উচিত যে, তাদের তথা প্রতিজন মানুষের প্রতিটি কর্মকেই সংরক্ষণ করা হচ্ছে এবং বিচারের দিন তাকে সবকিছুই দেখানো হবে; দেয়া হবে প্রতিদান। অকল্যাণকর পাপ কাজের বেলায় এই ভাবনাটাই তার জন্য কাজ করবে একজন রক্ষক হিসেবে; যা তাকে সর্বদাই স্মরণ করিয়ে দেবে ভয়াবহ পরিণামের কথা। অন্যদিকে কল্যাণকর ভালকাজগুলোও লেখা হয় এবং সেজন্যও রয়েছে আখেরাতের প্রতিদান। কিন্তু সে প্রতিদান আমরা কোথায় চাই, কিরূপ চাই, সেটাই বিবেচ্য বিষয়। কারণ, মানুষের অন্তরই ভাল জানে যে, তার কর্মটির সঠিক উদ্দেশ্য কি এবং এ থেকে সে কি আশা করে?
ভালকাজ, তা যে কোন পর্যায়েরই হোক না কেন, তার জন্য আমাদের প্রতিপালকের নিকট রয়েছে উত্তম প্রতিদান; যদি না সে ভালকাজ কয়েকটি ক্ষতিকারক দোষে দুষ্ট হয়ে পড়ে-
1) [গাঢ়]কুফর বা আল্লাহ্কে অস্বীকার ঃ[/গাঢ়] এই বিশ্ব ব্রক্ষ্মাণ্ডের সৃষ্টিকর্তা ও ব্যবস্থাপক যিনি, এর সমস্ত ব্যাপারাদি ঘটে থাকে যাঁর জ্ঞানের আওতার মধ্য থেকে ও ইশারায়, এর অন্তর্গতদের ধ্বংস ও পুনরুত্থানও হবে যাঁর আদেশে, সেই সুমহান প্রতিপালকের উপরই যদি বিশ্বাস না থাকে এবং এই বিশ্বাসের ভিত্তিমূল থেকেই যদি সম্পাদিত না হয়, তাহলে ভালোকাজ তা যত বড়ই হোক না কেন, তার আবর্তন মূলতঃ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের সীমা অতিক্রম করতে পারে না। অর্থাৎ, সে এখানেই বিনিময় হিসেবে কিছু না কিছু সুফল পায় শুধু; আখেরাতে তার জন্য সেখান থেকে কিছুই বাকী থাকে না। কারণ, [গাঢ়]"যে ব্যক্তি আল্লাহ্, তাঁর ফিরিশ্তাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসূলগণ ও শেষ দিবসের প্রতি কুফরী করে সে সুদূর বিভ্রান্তিতে পতিত হলো"[/গাঢ়]। [সূরা আন্-নিসা ঃ 136]
2) [গাঢ়]শির্ক বা আল্লাহ্র সাথে অংশীদার স্থাপন ঃ[/গাঢ়] দয়াময় স্রষ্টা আমরা না চাইতেই যে জ্ঞান ও বিবেচনা শক্তি দান করেছেন আমাদেরকে তা খাটিয়েই আমরা বুঝতে পারি যে, যার পাওনা তাকেই দেয়া উচিত। অন্যথায়, বিশ্বাসঘাতক বা যালেম হিসেবে গণ্য হতে হয়। তাই কুরআন আমাদেরকে জানাচ্ছে ঃ [গাঢ়]". . . আল্লাহ্র কোন শরীক(অংশীদার) করো না। নিশ্চয় শির্ক চরম যুলুম"[/গাঢ়]। [সূরা লোকমান ঃ 13] অথচ যদি কেউ আল্লাহ্র দেয়া উপায়-উপাদান, বুদ্ধি ও শক্তিমত্তা, জ্ঞান ও বিবেচনা ইত্যাদি কাজে লাগিয়ে কোন ভাল কাজ করলো আর তার প্রতিদান হিসেবে ভাল ফলাফল আশা করলো আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কোন সত্তার নিকট। অথবা কিছু আল্লাহ্র নিকট ও কিছু অন্য কারো নিকট এবং প্রশংসাও জানালো তদ্রূপ, তাহলে আল্লাহ্ কি করে তাকে তার সৎকাজের জন্য পরিপূর্ণ ও ভাল কোন প্রতিদান দেবেন? মূলতঃ সে তো 'বড় যালেম' ছাড়া আর কিছু নয়।
3) [গাঢ়]বিদ'আত পন্থা বা আল্লাহ্র প্রেরিত রাসূলের দেখানো পন্থার বিপরীত ঃ[/গাঢ়] দয়াময় আল্লাহ্ সর্বদাই আমাদের দৃষ্টির আড়াল, কিন্তু তাঁর আদেশ-নিষেধগুলো তিনি আমাদের নিকট পাঠিয়ে দিয়েছেন যুগে যুগে তাঁর প্রেরিত রাসূলদের মাধ্যমে। সেই পরম্পরায় আমাদের জন্য পাঠিয়েছেন তাঁর সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একজন শিক্ষক রূপে। তিনিই আমাদেরকে শিখিয়ে দিয়েছেন মহান আল্লাহ্র প্রতিটি আদেশকে কিভাবে পালন করতে হবে এবং নিষেধগুলো থেকে কিভাবে কত দূরে থাকতে হবে। রাসূল তার জীবদ্দশায়ই তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করে গেছেন; একথার স্বীকৃতি সমকালীন তাদের কাছ থেকেই পেয়েছেন যাদের কাছে তিনি এ দ্বীনকে প্রচার করে গেছেন। আর এ কথার সাক্ষ্য স্বয়ং আল্লাহ্ তা'আলাও দিয়েছেন ঃ [গাঢ়]"আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম"[/গাঢ়]। [সূরা আল-মায়েদা ঃ 3]। সুতরাং সেই সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষকের দেখানো পন্থার চাইতে ভাল কাজ সম্পাদনের আর কোন উত্তম পন্থা হতেই পারে না। যদি কেউ তার দেখানো পন্থার বিপরীত বা এর বাইরে কিছু কম-বেশী করতে চায় বা তদ্রূপ কারো অনুসরণ করতে চায়, তাহলে নিশ্চিতভাবে সে সীমালংঘন করলো এবং রাসূলের উপর 'দায়িত্ব পালনে ঘাটতি'র দোষারোপের মত ভয়াবহ অপরাধ করলো এবং কুরআনেরও বিরুদ্ধাচরণ করলো; চাই কেউ তা জেনে করুক বা না জেনে।
4) [গাঢ়]রিয়া বা লোকদেখানো ঃ[/গাঢ়] বলা যায় প্রতিটি কাজের প্রাণ মূলতঃ এখানেই লুকানো। কাজটির মূল উৎস কি, এর পেছনে কি উদ্দেশ্য রয়েছে বা নিয়ত কি ছিল; তাই এখানে ধর্তব্য বিষয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন ঃ [গাঢ়]'প্রতিটি কাজ নিয়তের (সংকল্পের) উপর। . . . আর প্রত্যেক ব্যক্তি যা নিয়ত করে তাই পায়।. . .'[/গাঢ়] [বুখারী ঃ 1 (প্রথম খণ্ড)]। যেহেতু শুধুমাত্র এক আল্লাহ্তে বিশ্বাসীরাই আখেরাতের উত্তম প্রতিদান পাবেন, তাই তাদের প্রতিটি কাজও হওয়া উচিত একমাত্র আল্লাহ্রই সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে; যদিও এই নিয়ত বা সংকল্পের কারণে ব্যক্তির দুনিয়াবী পাওয়ার মধ্য থেকে কিছুমাত্র কম হবে না। তবে যদি তাদের কোন সৎকাজ হয় শুধুমাত্র দুনিয়ার কোন মানুষ বা বস্তু অর্জনের লক্ষ্যে তাহলে তার ফলাফলও সেই মানুষ বা বস্তুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, আখেরাতে তার জন্য কোন অংশই থাকবে না। যদি ফলাফল এখানেই সীমাবদ্ধ থাকতো তবে কোন কথা ছিল না, কিন্তু প্রতিফলের রেশ র'য়ে যাবে মূলতঃ অনন্ত জীবন পর্যন্ত; যেখানে রয়েছে ভাল কিছু পাওয়ার পরিবর্তে নিয়তের এই ভ্রান্তি বা লোভের কারণে মহাশাস্তি! রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটাকে গোপন শির্ক বলে আখ্যায়িত করেছেন [এর ক্ষতিকারক দিকগুলো রয়েছে মুসলিম শরীফের 1905 নং হাদীসে] আর উলামাগণ এই ছোট বা গোপন শির্ককেই দৃষ্টির গভীরতা দিয়ে বড় শির্ক হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাই কোন ভাল কাজ করতে গিয়ে তা লোক দেখানোর দোষে নষ্ট হচ্ছে কি না, উপরোক্ত কথাগুলোর আলোকে আমাদের প্রতেক্যেরই ভেবে দেখা উচিত।
প্রশ্ন উঠতে পারে যে, অমুসলিমদের ভাল কাজের ফলাফল কি? জবাব মূলতঃ উপরের লেখাতেই এসে গেছে- যে যে উদ্দেশ্যে ভাল কাজ করছে, সে ঠিক সেভাবেই এর প্রতিদান পাবে। অমুসলিমরা যদিও মৃতু্যর পরবর্তী জীবনের জন্য বিভিন্ন ধারণা বেছে নিয়েছে, তদুপরি সেগুলোতেও কতক নিতান্তই কল্পিত আর কতক এমন যেখানে ঐশী বাণীর সাথে নিজেদের খেয়াল-খুশী মত রঙ চড়িয়ে পছন্দসই করেই সাজিয়ে নিয়েছে, সেমতে বিশ্বাসের ক্ষেত্রে আল্লাহ্র সর্বশেষ বাণী ও তাঁর রাসূলের দেয়া সংবাদে তারা বিশ্বাসী নয়। তাই তাদের ভাল কাজের ফলাফল স্রষ্টা তাদেরকে দুনিয়াতেই কোন না কোনভাবে, আগে-পরে ভোগ করিয়ে দিয়ে থাকেন। এক কথায় বিশ্বাসের ভ্রান্তি ও নিয়তের সংকীর্ণতার দরুন অনেক সৎকর্মীকেই তাদের সৎকাজের ফলাফল শুধুমাত্র দুনিয়াতেই ভোগ করতে হয় বা করে থাকে; আখেরাতে বা মৃতু্যর পরবর্তী জীবন তাদের জন্য থাকে শূন্যে ভরা।
উপরে উল্লেখিত চারটি দুষ্ট-প্রবণতা থেকে মুক্ত থেকে যারা সৎকাজ করে থাকেন, তাদের মুখ থেকেও অনেক সময় হতাশার বাণী শুনা যায়। অজান্তেই তারা যেন প্রতিদানের সবটুকু দুনিয়াতেই চেয়ে বসেন। কিন্তু তাদের এ কথা জানা থাকা উচিত যে, আল্লাহ্ তাঁর নিজের জন্যও একটা কর্মপদ্ধতি তৈরী করে নিয়েছেন। আর সে পদ্ধতিতে তিনি কোন পরিবর্তন আনেন না, [গাঢ়]আপনি কখনো আল্লাহ্র রীতিতে কোন পরিবর্তন পাবেন না"[/গাঢ়] [সূরা আল-আহযাব ঃ 62]। যদিও তা করতে তিনি পূর্ণমাত্রাতেই সক্ষম এবং সে পদ্ধতির সবকিছু তিনি আমাদেরকে জানানো জরুরী মনে করেননি। এ লেখার সাথে সম্পৃক্ত যে অংশটুকু তা হলো- তিনি মুমিনের কোন দো'আকেই বিফল করেন না, মুমিন যদি দুনিয়ার জন্য দো'আ করেন আর তাঁর চিরন্তন বিধান অনুযায়ী যদি তাকে তার চাওয়াটা দুনিয়াতেই এবং তার বেঁধে দেয়া সময়মত দেয়া সম্ভব হয় তবে তিনি অবশ্যই দিয়ে থাকেন। কিন্তু যদি তাঁর চিরন্তনী বিধানে থাকে দুনিয়ার জীবনেই আরো পরে কখনো, তবে সেভাবেই দিয়ে থাকেন কিংবা যদি একেবারেই না থাকে, তবে তিনি মুমিনকে তার দো'আর প্রতিদান দিয়ে থাকেন আখেরাতে। কিন্তু তারপরও দয়াময়ের দয়াগুলো হয়ে থাকে আমাদের চাওয়া-পাওয়া থেকেও অনেক অনেক ব্যাপক, তাই তো তিনি কোন কোন উত্তম দো'আগুলো দুনিয়াতে পূর্ণ করার পর আখেরাতেও রাখেন তাঁর প্রিয় সে বান্দার জন্য আরো আরো প্রতিদান।
তবে কেন আমরা সেই মহান দয়াময় এক-অদ্বিতীয় চিরন্তন আল্লাহ্র প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বাসী হয়ে সৎকাজে আরো আরো আত্মনিয়োগ করবো না? যার প্রতিদান দুনিয়া থেকে আখেরাতের অনন্ত জীবন পর্যন্ত বিরাজমান! আমরা সকলেই সেরূপ সফল মুমিন ও আপনার প্রিয় বান্দা হতে আ-মৃতু্য পিয়াসী, হে রহমান! আমাদের কবুল করুন।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই আগস্ট, ২০০৬ রাত ৮:৩৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


