somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদের উপন্যাস "পাক সার জমিন সাদ বাদ" এবং বইটিকে নিয়ে আরেক লেখক হুমায়ূন আহমেদের বিতর্কিত মন্তব্য, ব্যাখ্যা ও একটি প্রতিক্রিয়া।

২৯ শে জুলাই, ২০১৭ রাত ১২:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুর ৪ বছর পর ২০০৮ সালে বইটি সম্পর্কে হিমু, মিসির আলীর লেখক হুমায়ূন আহমেদ একটি মন্তব্য করেছিলেন। এক সাক্ষাৎকারে হুমায়ূন আহমেদকে জানতে চাওয়া হয়েছিলো,
" : বাংলাদেশের লেখকরা কি স্বাধীন?
হুমায়ূন আহমেদ : হ্যাঁ, বাংলাদেশের লেখকরা স্বাধীন।
: তাহলে ড. হুমায়ুন আজাদকে মরতে হলো কেন?
হুমায়ূন আহমেদ : কারণ যে বইটা(পাক সার জমিন সাদ বাদ) তিনি লিখেছিলেন, তা এতোই কুৎসিত যে, যে কেউ বইটা পড়লে আহত হবে। তার জন্য মৌলবাদী হতে হয় না।"
বইটির কথায় পরে আসছি। একটু লক্ষ্য করুন, উনার প্রথম উক্তির সাথে কিন্তু দ্বিতীয় উক্তিটি সাংঘর্ষিক। উনি প্রথমে বলেছেন বাংলাদেশের লেখকরা স্বাধীন। অর্থাৎ লেখার স্বাধীনতা রয়েছে। আবার দ্বিতীয় উক্তিতে বুঝিয়েছেন, তাঁর লেখার জন্যই তাঁকে মরতে হয়েছে।
আচ্ছা, একজন লেখক যদি লেখার ক্ষেত্রে স্বাধীনই হয়ে থাকেন, তবে তাঁকে কোন যুক্তিতে তাঁর লেখার জন্যই হত্যা করা যায়?!

আর, একটু ভাবুন তো। কি এমন লিখলে একজন লেখককে হত্যা করা যায়! আবার সে হত্যাকারী মৌলবাদী হতে হবে না, নেহাত ভালো মানুষও হত্যা করতে পারে! আমি এর উত্তর পাইনি। একজন লেখককে তাঁর কি এমন কুৎসিত লেখার জন্য "হত্যা করা" যায়, তা আমি কল্পনাও করতে পারি না!
আর লেখাগুলো কি আসলেই খুব কুৎসিত ছিলো?! আচ্ছা, এখন আসা যাক বইটির কথায়।
কিছুক্ষণ আগে বইটি পড়া শেষ হলো। গুরুত্বপূর্ণ কথা হচ্ছে, হুমায়ুন আজাদের "পাক সার জমিন সাদ বাদ" উপন্যাসটি পড়ে বুঝতে হলে একটি মানসিক যোগ্যতা থাকতে হবে। তা হচ্ছে পক্ষপাতিত্বহীন অসাম্প্রদায়িক মনোভাব ও একটি সুস্থ বিবেচনাবোধ।

বইটি এক মৌলবাদীর নিজস্ব চিন্তাধারা ও ঘটমান হিস্রতার বক্তব্য এবং শেষ পরিণতির কথা নিয়ে। সে একসময় সাম্যবাদ ও সর্বহারা করতো। মার্ক্স, এঙ্গেলস, লেনিন, মাওসেতুং-এর বই পড়তো। কিন্তু পরে সে পথভ্রষ্ট হয়, কিছু ধর্মীয় বইয়ের ব্যাখ্যা এবং কু-ব্যাখ্যায় তার মগজ ধোলাই হয়(যেমনটা হয়েছিল গুলশানের হোলি আর্টিজানে হামলাকারী ঢাকার নামী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্রের এবং যেমনটা হচ্ছে দলে দলে জিহাদে অনুপ্রাণিত হয়ে আইএস-এ, আল-কায়দায়, তালেবানে যোগ দেওয়া নির্বোধদের)। হ্যাঁ, বইটিতে প্রচুর যৌনতা এবং অশ্লীলতা রয়েছে। বইটির সকল অশ্লীলতাই মগজ ধোলাই হওয়া মৌলবাদীটির বক্তব্য, চিন্তাধারা ও হিস্রতার ঘটনাবলি। এখন বুঝতে হবে, একজন মৌলবাদীর কথা কখনও শালীন এবং সুন্দর হয় না, তার কর্মগুলোও মহৎ হয় না। হয় অশ্লীল, কুৎসিত এবং হিংস্র। তাই বইটিতে অশ্লীলতা তো থাকবেই। বইটি থেকে অন্ধবিশ্বাসী, সাম্প্রদায়িক তথা মৌলবাদীদের চিন্তাধারা সম্পর্কে অবগত হওয়া যায়। বইটি মৌলবাদকে কুৎসিত চিহ্নিত করে। কারণ শেষপর্যন্ত মৌলবাদীটির মনে মানবিকতা উঁকি দিয়েছিল। একসময় মৌলবাদীদের সব কর্মকান্ড তার কাছে ঘৃণ্য ঠেকে, নরক মনে হয়। সে তার ভুল বুঝতে পেরে একরাতে "জামাঈ জিহাদে ইছলাম" থেকে পালিয়ে যায়। একজন মৌলবাদীর তার ভুল বুঝতে পেরে মৌলবাদকে ত্যাগ করে পালিয়ে যাওয়ার বর্ণনার মধ্যেই বইটি সমাপ্ত হয়, যা থেকে বইটির উদ্দেশ্য উপলব্ধি করা যায়।
যার জন্য শুরু থেকেই মৌলবাদীরা এই বইটি নিষিদ্ধ করার জন্য মরীয়া হয়ে ছিল।

কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ কেন বইটিকে কুৎসিত বলে উল্লেখ করলেন! তিনি কি সংখ্যাগরিষ্ঠ মৌলবাদীদের খুশি করে নিজের জনপ্রিয়তা ধরে রাখার জন্য এমনটা বলেছিলেন! নাকি হুমায়ূন আহমেদ উনার নানার মতাদর্শে কিছুটা প্রভাবিত ছিলেন?! উনার পিতা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হলেও উনার নানা ছিলেন একজন রাজাকার। তিনি চাইতেন না বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রকে। তিনি চাইতেন বাংলাদেশ পাক স্তানের(পাকিস্তানের) অধীনে থাকুক। হুমায়ূন আহমেদের চলচ্চিত্রে ও উপন্যাসে রাজাকার নামে কোনো চরিত্র বিষ্ময়করভাবে না থাকাকেও অনেকের মতো আমাকেও ভাবায়! নিজ নানার প্রতি সমবেদনাই কি এর কারণ?!

হুমায়ুন আজাদের বইটি কুৎসিত(যদিও কুৎসিত নয়), আর উনি নিজে এমন কি সাহিত্য রচনা করেছেন! আমি নিজে উনার সাহিত্যমান বিবেচনার স্পর্ধা করছি না। আহমদ ছফাকে (হুমায়ূন আহমেদেরই গুরু, একজন লেখক, গবেষক, বহুভাষাবিদ, বুদ্ধিজীবী) একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল, “ : আপনি কী মনে করেন হুমায়ূন আহমেদ এখন শরৎচন্দ্র চট্টপাধ্যায়ের সমান জনপ্রিয় লেখক?
আহমদ ছফা : (মুচকি হেসে) হুমায়ূন আহমেদ এখন শরৎচন্দ্র চট্টপাধ্যায়ের চেয়েও জনপ্রিয় লেখক। কিন্তু মেরিটের দিক দিয়ে সে নিমাই ভট্টাচার্যের সমান। হি রাইটস ওনলি ফর বাজার!”

তা উনার সাহিত্যমান যাই থাকুক। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, একজন লেখকের তাঁর লেখার পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। লেখার ক্ষেত্রে লেখক স্বাধীন। কোনো কুৎসিত(আবারও বলছি, বইটি কুৎসিত নয়) লেখার জন্যই একজন লেখককে হত্যা করা যায় না, চাপাতি দিয়ে কুপানো যায় না। এটা মৌলবাদীরা করে থাকে। একে সমর্থনকারীরাও মৌলবাদী। একজন লেখক হয়ে আরেকজন লেখককে নির্মমভাবে হত্যার জন্য উনার উচিত ছিল প্রতিবাদ করার। কিন্তু উনি তো বরং সমর্থনই জানিয়েছেন!
উনার এমন মন্তব্যের জন্য আমার মতো অনেকেই নিশ্চয়ই মানসিকভাবে খুব আঘাত পেয়েছে।

আর আমরা জানি, হুমায়ূন আহমেদের 'হিমু' চরিত্রটির মতো উনার কথাকেও সবাই অনুসরণ করে। উনার প্রতিটি উক্তিকে বেদবাক্য মনে করে। হুমায়ূন আহমেদের এই মন্তব্য নিশ্চয়ই অনেককে মৌলবাদীভাবাপন্ন হতে উদ্বুদ্ধ করবে! আর এর দায় থেকে হুমায়ূন আহমেদ কখনও মুক্তি পাবেন না। :(
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে জুলাই, ২০১৭ রাত ১২:৪৪
১১টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমরা বাস করছি প্রচণ্ড রাজনৈতিক ভণ্ডামোর মধ্যে – হুমায়ুন আজাদ। কিছু কথা।

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ১৪ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:৩৮



ইংরেজিতে একটা শব্দ আছে সেটা হল plausible. যার একটা অর্থ হল “আপাতদৃষ্টিতে যুক্তিসঙ্গত”। হুমায়ুন আজাদের অনেক লেখার মধ্যে এ জিনিসটা পাওয়া যায়। এমনিতে হুমায়ুন আজাদ খুবই ভালো... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঁশি

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৫ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:০৪



হিম শীতল মাঘ মাসের রাত। ঘন কুয়াশার কারণে পাঁচ হাত সামনেও কিছু দেখা যায় না আর খালপাড়ের বাঁশঝাড়টা তো অনেক দূরে, বাতাস নেই তারপরও বিচিত্র কারণে বাঁশপাতার শব্দ শোনা যাচ্ছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

হুলো বেড়াল

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ১৫ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১:২৮


গ্রামের কাঁচা রাস্তা দিয়ে হাঁটছি। কোথাও মানুষের কোনো সাড়া-শব্দ নেই। মাঝেমধ্যে অবশ্য ঝিঁঝিঁ পোকা ডেকে যাচ্ছে। শব্দে কান ঝালাপালা। এত ঝিঁঝিঁ পোকা কোথা থেকে এলো?

দুটো জঙ্গল পেরিয়ে মূল সড়কে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের এই দিনে ১৯৭৫-এর শোকাবহ আগস্ট/ রক্তাক্ত দিবস॥

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১৫ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:১১



“আজ থেকে অনেকদিন পরে হয়ত কোন পিতা তার শিশুপুত্রকে বলবেন, জানো খোকা! আমাদের দেশে একজন মানুষ জন্ম নিয়েছিল যাঁর দৃঢ়তা ছিল, তেজ ছিল আর ছিল অসংখ্য দুর্বলতা। কিন্তু... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর কারা মিষ্টি বিতরণ করেছিল?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৫ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:১৬


যদি কোনোদিন টাইম ট্রাভেল মেশিন আবিষ্কার হয়, পঁচাত্তরের ঘটনা নিজের চোখে দেখার চেষ্টা করতাম। সে সময় কিছু মানুষ মিষ্টি বিতরণ করেছিল বলে শোনা যায় । আমি তাদের কাছ থেকে মিষ্টি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×