somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অপরূপ সিলেটের পাংথুমাই ভ্রমণ

২০ শে ডিসেম্বর, ২০১৮ রাত ৩:১৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বিভীষিকাময় উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ। প্রায় দেড় মাসের দীর্ঘ পরীক্ষা শেষে একঘেয়েমি কাটানোর জন্য একটি ভ্রমণের খুব দরকার বলে মনে হয়। আমার কলেজের কিছু বন্ধুরা মিলে ঠিক করলাম সিলেটের অপরূপ পাংথুমাই ভ্রমণ করবো।

যেই চিন্তা সেই কাজ। পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা ছয়জন বন্ধুরা নির্দিষ্ট দিন ব্যাগ গুছিয়ে বাসা থেকে বেড়িয়ে পড়লাম। লক্ষ্য পাংথুমাই। মনের ভেতর অনেক জল্পনা, কল্পনা, কৌতূহল ও প্রশ্ন। এসবের উত্তর মিলবে পাংথুমাইয়ে। বেশ, প্রথমেই গেলাম ফকিরাপুল। রাতের জার্নি। বাসের টিকিট, কিছু খাবার ও কোমল পানীয় কিনে উঠে পড়লাম বাসে। বন্ধুরা মজা করতে করতে পার হল ঘণ্টা খানেক। বাসের সবাই ঘুমিয়ে পরেছে আমরাই শুধু জেগে আছি। উত্তেজনা আর কৌতূহলে ঘুম এলো না। হঠাৎ শুরু হল অঝোর বৃষ্টি। চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার সাথে বৃষ্টি। এক অসাধারন পরিবেশের ভিতর দিয়ে যাচ্ছি। সারা রাতই বৃষ্টি হল। বৃষ্টির জন্য পৌঁছুতে পৌঁছুতে দুপুর হয়ে গেল। যখন সিলেট নামলাম তখনও বৃষ্টি পড়ছে। অনেক রাস্তায়ই পানি উঠে গিয়েছে। প্রথমেই নাস্তা করে নিলাম। একটি মোটামুটি ধরনের হোটেলে উঠলাম। ততক্ষণে দুপুর পেরিয়ে গিয়েছে। অনেক ক্লান্তও ছিলাম। তাই ঐদিন আর বেরুলাম না। রাতেও অঝোরে বৃষ্টি বয়ে গেল।

সকালে ঘুম থেকে উঠতে উঠতে দেরী হয়ে গেল। সকলে তারাতারি নাস্তার পর্ব শেষে বেড়িয়ে পড়লাম। লক্ষ্য সেই একটাই, পাংথুমাই। প্রথমেই গেলাম আম্বরখানা পয়েন্ট। সেখান থেকে একটি লেগুনা ভাড়া করলাম। প্রচুর বৃষ্টি জন্য অথবা আগে থেকেই রাস্তা ভাঙ্গা। ভালই ঝাকি খেলাম। বেশ কিছুদুর যাবার পর অনেক দূরে সবুজ পাহাড় চোখে পড়ল। পাহাড়ের মাঝবরাবর কিছু সাদা রঙের লম্বা লাইন চোখে পড়ল, ভাবছিলাম কি হতে পারে এগুলো? লেগুনার হেল্পার বলল এসব হল ঝর্না। অসাধারন নয়নাভিরাম দৃশ্য। পাহাড়ের ঝর্না। সবুজ পাহাড়ের চুড়ায় ভাসমান একগুচ্ছ মেঘ। এই দৃশ্য বলে বুঝান সম্ভব না। একসময় চলে এলাম গোয়াইনঘাট বাজার। সেখানে দশ মিনিট চা বিরতি হল। আবার শুরু হল চলা। যেতে যেতে একজায়গায় গিয়ে থামলাম। দেখলাম রাস্তা মিশে গেছে অথই পানিতে। চারপাশে শুধু পানিই চোখে পড়ছে। অসাধারণ একজায়গা। মনে মনে ভাবছি পাংথুমাই সুন্দর, কিন্তু যতটা ভেবেছিলাম ততটা নয়। পরে জানতে পারলাম এখনও পাংথুমাই আসি নি। প্রবল বর্ষণে রাস্তায় পানি উঠে গেসে। ড্রাইভার এই এলাকারই। সে বলল, ভাই কিসুদুর পরই আবার উঁচু রাস্তা, এই রাস্তাটা আমরা যেন হেটে পাড় হই। আর সে খালি গাড়ি নিয়ে আমাদের পিছনেই আসবে। অগত্যা নেমে যেতে হল। হোটেল থেকে ভিজার প্রস্তুতি নিয়েই বেরিয়েছিলাম। তাই স্যান্ডেল হাতে নিয়ে পানিতে নামলাম। বাহ! হালকা ঠাণ্ডা পানি। কিন্তু রাস্তা তো পানির কারনে দেখা যাচ্ছে না। যাবো কিভাবে? পরে রাস্তার দু’পাশের গাছ দেখে রাস্তা অনুমান করে চলতে শুরু করলাম। কিছুদুর গিয়ে পানি হাঁটুর কাছাকাছি ঠেকল। এখানটায় পানির বেশ স্রোতও আছে। একজায়গায় পা ফেলতে যাই কিন্তু স্রোত এর জন্য পা অন্য জায়গায় গিয়ে পড়ছে। ভালই লাগছে আবার ভয়ও লাগছে। এভাবে আরও কিছুদূর গিয়ে অবশেষে রাস্তার দেখা পেলাম। আবার গাড়িতে চলা শুরু। পথে এরকম আরও তিনটা রাস্তা পেলাম। একই ভাবে পাড় হলাম এসব রাস্তা। একসময় কোনও এক ঘাটে এসে পৌছুলাম। লেগুনার কাজ শেষ।

এখন বাকি পথ যেতে হবে ইঞ্জিন নৌকায়। দরকষাকষি করে একটা ইঞ্জিন নৌকা ভাড়া করলাম। উঠে পড়লাম নৌকায়। গাড়ি রয়ে গেল পাড়ে, হেল্পার এলো আমাদের সাথে। আটজনের ভেতর চারজনই সাতার জানি না। আর একজন অল্প সাতার জানে, বাকিরা মোটামুটি। সবাই বেশ ভয়েই ছিলাম। পরে চারপাশের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে ভয়ের কথা ভুলেই গেলাম। কিন্তু একটা সমস্যা। ইঞ্জিন নৌকার ইঞ্জিনের শব্দে মাথা ধরে যেতে লাগল। কানে সবাই ইয়ারফোন লাগালাম। একজনের কাছে ইয়ারফোন ছিল না, সে মাঝির গামছা নিয়ে ভালো মত কান মুড়ে নিল। আবার শুরু সেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বাহার। একপাশে পাহাড় অন্যপাশে সমতল এলাকা। জানতে পারলাম দূরের সেই পাহাড়গুলো পড়েছে ইন্ডিয়ার ভিতর। বিকেল পরে গেছে। হঠাৎ শো শো শব্দ শুনতে পেলাম, নৌকা একটা মোড় ঘুরতেই চোখে পরল সেই শব্দের উৎস। এ কি দেখছি চোখের সামনে? অসাধারন সুন্দর এক ঝর্ণা। দুই সবুজ পাহাড়ের মাঝে সেই জলপ্রপাত। আর সেই দুই পাহাড়ের উপরদিকটায় একটি ছোট্ট ব্রিজ পাহাড় দুটোকে মিলিয়ে দিয়েছে। আর ব্রিজ দিয়ে পাড় হচ্ছে একটি গরুর গাড়ি। আর পাহাড়ের চুড়ায় একগুচ্ছ মেঘ। ঝর্ণার পানি প্রবল বেগে পরেই যাচ্ছে। সাদা শুভ্র সে পানি। মাঝি বলল আমাদের ভাগ্য ভালো, কারন প্রবল বৃষ্টি হওয়াতে পাহাড়ের ঢলে ঝর্ণা আরও অঝোর ধাড়ায় বয়ে যাচ্ছে। হালকা একটা রংধনুও দেখা যাচ্ছে। এমন কিছু নিজের চোখে আর কোথাও দেখতে পারিনি। সন্ধ্যা হয়ে আসাতে অল্প কিছুক্ষণ পরেই রংধনু উধাও হয়ে গেল। যেখানে নৌকা থামল সেখান থেকে জলপ্রপাত দেড়শ গজের মত দূরে। পাড়ে উঠলাম। সামনে দুটো সাইনবোর্ড। একটিতে কিছু নির্দেশাবলী লেখা ও অন্যটিতে বড় করে লেখা, “সামনে ভারত, অতিক্রম নিষেধ” কিন্তু কোনও কাঁটাতারের বেঢ়া নেই। সাইনবোর্ড উপেক্ষা করে আরও কিছুদূর এগিয়ে গেলাম, মানে ভিসা ছাড়া ভারতে ঢুকে পড়লাম। পরে আর এগুবার মত অবস্থা নেই, ঝর্ণা আর যেখানে দাঁড়িয়েছিলাম সেই দুটো জায়গাকে আলাদা করে রেখেছে একটা খাল। কিছু ডিঙি নৌকা দেখতে পেলাম। স্থানীয়দের কাছে জানতে পারলাম অই ডিঙি নৌকা গুলো দুইজন দুইজন করে ঝর্ণা পর্যন্ত নিয়ে যায়। কিন্তু সন্ধ্যা হয়ে আসাতে যাওয়াটা নিরাপদ নয়। তাই আর যাওয়া হল না। তাদের থেকে আরও জানা গেল ঝর্ণাটা আসলে বাংলাদেশেরই। কিন্তু ভারত এটা নিয়ে নিয়েছে। খারাপ লাগল, এত সুন্দর একটা জায়গাকে এভাবে কিভাবে দখল করা হল। সন্ধ্যা হওয়া পর্যন্ত সবাই বসে বসে ঝর্ণার রূপ উপভোগ করলাম। এবার যে চলে আসতে হবে, কেমন যেন লাগছিল। আসার সময় স্মৃতি স্বরুপ তিনটা পাথর নিয়ে এলাম। নৌকায় উঠলাম, ঝর্ণা যতদূর থেকে দেখা যাচ্ছিল ততদুর পর্যন্ত পিছু ফিরে রইলাম। অবশেষে আবার আসার শপথ নিয়ে চলে এলাম। এই সৌন্দর্য বলে বোঝানো সম্ভব না। নিজের চোখে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করতে চাইবে না। অন্ধকারের ভিতর নৌকা এগিয়ে যাচ্ছে, সবাই চুপ, মনে হয় আমার মত ওরাও ভাবছে সেই পান্থুমাই ঝর্ণার কথা। ভাবতেই হবে, এমনই জায়গা এটা ............
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে ডিসেম্বর, ২০১৮ রাত ৩:১৯
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শিশুতোষ কবিতাঃ মিষ্টি খাবো

লিখেছেন ইসিয়াক, ১৪ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ৭:৩৬




"মিষ্টি খাবো, মণ্ডা খাবো"—
বায়না ধরলো খোকা।
"চেঁচাস নে আর, বড্ড জ্বালাস,
তোর যে দাঁতে পোকা!"

খোকা বলে, "কোথায় পোকা?
দেখি না তো চোখে!
মাঝে মাঝে ব্যথা তবে
ওঠে থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসুন দেখে আসি, রাজাকার, লালবদর,ছাত্রদল ও শিবিরের উত্তরাধিকারীরা পাকিস্তানে কেমন আছে‼️

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১৪ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ৮:০১



কেমন আছে পাকিস্তানে বসবাসরত ৪০ লক্ষ বাঙালী?

১৯৭২ সালে ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে দাড়িয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বিচার করার হুঙ্কার দিলেন। পাকিস্তানে বসে তখন খুনি জুলফিকার আলী... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভাবতে পারি না

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ১৪ ই জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:১৪


আমি ভাবতে পারি না মধ্য রাতের চাঁদ
আমি ভাবতে পারি না স্নিগ্ধ ভোরের স্নান
মধ্য দুপুরের সূর্য তাপ, সন্ধ্যার ক্লান্তি মুখ!
আমাকে ডেকে নিয়ে যায় ঘাসফড়িং কিংবা
জোনাকির ঘরপোড়া দল- শান্তির সংগ্রামে
দাঁড়িয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

পতাকার যুদ্ধ অথবা গামছা ও কালিমা

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ১৪ ই জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:৪০

একটি দেশের পতাকা শুধু কাপড় নয়। এটা একটি চুক্তি—আমরা কে, এই প্রশ্নের সম্মিলিত উত্তর। বাংলাদেশের পতাকার রং লাল-সবুজ। লাল মানে রক্ত, সবুজ মানে মাটি। এই দুটি রঙের পেছনে একটি নির্দিষ্ট... ...বাকিটুকু পড়ুন

কি করে কি করি, কি যে করি !

লিখেছেন মেহবুবা, ১৪ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:০৫




আজ বেশ ক'দিন হোল আমার ব্লগবাড়িতে জ্বীন ভূতের কারসাজি চলছে! আধা পৃষ্ঠা জুড়ে কয়েকটি পোষ্ট আসছে, সব আসছে না।নিজ ব্লগবাড়িতে কত কি আয়োজন থাকে ; যেমন মন্তব্য,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×