somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাল্মীকির ভূত

১১ ই মার্চ, ২০১৪ সকাল ১১:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আদিকবি বাল্মীকি বেশ সুখেই ছিলেন স্বর্গলোকে। সেই কবে মর্তলোকে ক্রৌঞ্চীর বিরহব্যথা তাঁর শোকোদ্বেল কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল সর্বপ্রথম কবিতার রূপে। তারপর তো জীবনভর সাধনায় লিখলেন প্রথম অনুপম মহাকাব্য রামায়ন – সে কথা কি তিনি ভুলতে পারেন? কবিতা না লেখার অতৃপ্তি তাই প্রায়শ তার স্বর্গসুখে মরচে ধরায়। সুদীর্ঘকাল স্বর্গসুখে থেকেও তাঁর সেই অতৃপ্তি গেল কই? অগত্যা একদিন ভূর্জপত্র আর লেখনী নিয়ে বসে পড়লেন কবিতা লিখতে। কিন্তু এ তো স্বর্গলোক – এখানে দুঃখ নেই, এখানে শোক নেই। তাই লেখনী কামড়ে ধরে বুঝলেন, এখানে কবিতা অসম্ভব। যন্ত্রনায় ছটফট করে উঠলো তাঁর মন, মর্তের কথা ভেবে মর্তের মায়ায় নিজেকে ফেললেন জড়িয়ে, তারপর হঠাৎ দেখলেন – মর্তের টানে মর্তেরই পানে ছুটে চলেছেন তিনি।
রাজপথে আপন মনে পথ চলছিল পথচারীবৃন্দ। ছুটছিল অবিশ্রান্ত গাড়ির স্রোত। কিন্তু অকস্মাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল তা। সবাই সবিস্ময়ে তাকিয়ে দেখল, রাজপথের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে কে এক সৌম্যদর্শন জটাজুটধারী। মুনিবর নিজেও চমকিত।

ধীরপায়ে তিনি পথের একপাশে এসে বিহ্বল চোখে তাকিয়ে রিলেন শ্রেনিবদ্ধ অশ্বহীন শকটের দিকে। হঠাৎ তাঁর দৃষ্টি ছিটকে গিয়ে পড়ল পথের অপর পারের আলোকজ্জ্বল গ্রন্থালয়ে। সাজানী রয়েছে সেখানে অজস্র সুদৃশ্য গ্রন্থ। সহসা তাঁর মনে প্রশ্ন উঁকি দিল, আজও কি পাঠক পড়ে তাঁর সেই অমর কাব্য রামায়ন? অদম্য কৌতুহলে তিনি সূক্ষদেহে ঢুকে পড়লেন সটান সেই গ্রন্থাগারে। খুঁজতে লাগলেন হন্যে হয়ে অমর সেই কাব্য। পেয়েও গেলেন অচিরেই। আনন্দে ডগমগ হয়ে উঠলো মন।

এমন সময় এলেন সেখানে এক তরুন কবি। গ্রন্থাগারিক নিজেও কিঞ্চিত কাব্যরসিক। দুজনে শুরু হল কিছু কথা কাব্যবিষয়ে। কবি বললেন, এ তো অতি সত্যি কথা – রবীন্দ্রনাথের ধারে কাছে কেউ নেই আজ। পাঠকের কাছে তাই রবীন্দ্রনাথ ভিন্ন অন্য সব বিস্বাদ ঠেকে। সমস্ত কবিও আজ আচ্ছন্ন রবীন্দ্র প্রভাবে। এ প্রভাব এতই ব্যাপক, তা কাটিয়ে ওঠা প্রায় অসম্ভব। অথচ পাঠকের কাছে রবীন্দ্রনাথ ও পুরনো। তাঁরা চান নতুন কিছু, নতুন স্বাদের। কিন্তু কবিকুল অসহায়। সামনে রুদ্ধ পথ। তাই আজ চাই নতুন কোনও ব্যাস বাল্মীকি কালিদাস।

সহসা নিজের নাম উচ্চারিত হতে দেখে আনন্দে শিহরিত বাল্মীকির হৃদয়। তক্ষুনি ভর করলেন তিনি তরুন কবির ওপর। আর পুলকিত হলেন ভেবে, এখনও তাঁর প্রয়োজন আছে এই মরজগতে। তাঁকে নতুন করে নতুন ঢঙে লিখতে হবে কবিতা, এই ভক্ত কবিকেই আশ্রয় করে।

এদিকে তরুন কবি অতর্কিতে হয়ে পড়লেন অপ্রকিতস্থ। তাঁর কণ্ঠ থেকে বেরোতে চাইল ছন্দবদ্ধ শ্লোক। অতিকষ্টে তিনি নিজেকে করলেন সংযমিত। মান রাখতে দ্রুত চলে গেলেন নিজের কক্ষে। খাতা কলম নিয়ে বসতেই, ঝড়ের বেগে তাঁর লেখা হয়ে গেল গুচ্ছের কবিতা। লেখা সাঙ্গ হলে সম্বিৎ ফিরে পেলেন। দেখলেন যা কিছু লিখেছেন, সবই অভিনব। এ গদ্য ও নয়, এ পদ্য ও নয় – গদ্যের মতো মিলহীন, কিন্তু পদ্যের মত কোথাও যেন রয়েছে এক অন্তর্লীন ছন্দ। উপমাগুলো হয়ে গেছে সব উদ্ভট। সমাসগুলোর অর্থের নেই কোনও সংগতি। এক পঙতির সঙ্গে অন্য পঙতির নেই কোনও ভাবগত যোগাযোগ। রসের আভাস আছে, কিন্তু ভাবের প্রকাশ নেই – এ যেন এক বিচিত্র খিচুড়ি। সব মিলে যা লেখা হল, তা কি বিষয়ে তাই বোঝা দুস্কর। সবটাই যেন হেঁইয়ালি। আবৃত্তি করতে গিয়েও খেলেন হোঁচট। হতোদ্যম হয়ে কিয়ৎক্ষন বসে রইলেন চুপচাপ।

কিন্তু হঠাৎ তাঁর মনে হলো, এ বস্তু নতুন। হোক না এ হেঁয়ালি, হোক না দুর্বোধ্য, মহাবিশ্বের কতটুকু বুঝি, তা বলে কি তা নিরর্থক? তাছাড়া আছে এর অন্তর্লীন এক ছন্দ। আরো আছে এর কবিতার মতো আকার। তার ওপর পাঠক ও আছেন কিছু হুজুক প্রিয়। এ বস্তু হাতে পেলে তাঁরা নেচে উঠবেন দুহাত তুলে। প্রচারের গুনে সামান্য পাথর পায় পুজো, আর কাব্যের দেহ পেয়ে এ হবে উপেক্ষিত ! অতএব, বিলম্ব নয়, অচিরেই চাই এর প্রতিষ্ঠা। কিন্তু সবেমাত্র যে বস্তু জন্ম নিল তার নামটি হবে কি?

পুরনোর সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করেছে এ, সুতরাং এর নাম হোক, আধুনিক কবিতা। প্রথম কবিতার জন্মদাতা বাল্মীকি, জানে সর্বজনে। কিন্তু জানে না – প্রথম আধুনিক কবিতার জন্মদাতা বাল্মীকির ভূত।

(কালেক্টেড)
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

তোমার মুখের রেখা আঁকতে চেয়েছি।

লিখেছেন জায়েদ হোসাইন লাকী, ০৬ ই নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫০



রাতটি ছিল নিকোটিনে ভেজা
ধোঁয়ার ভেতরে তোমার অবয়ব হঠাৎ উধাও হয়ে গেল
চাঁদ তখন লাল আর ঠিক আমার ফুসফুসের মতোই ক্লান্ত।
তুমি আলো হয়ে রইলে, আমি অবাধ্য আলোর ফসিল

আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছবি ব্লগ - ছোঁয়া

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ০৬ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:১৭

আজ বৃষ্টি তাকে প্রথম ছুঁয়েছে। ওর স্পর্শে তার সমস্ত সত্তা যেন হীরের মত স্বচ্ছ স্ফটিকে ছেয়ে গেছে। বৃষ্টি বলেছে, সে আকাশের কাছে গিয়েছিল। মেঘের কাছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

কলকাতায় নিয়মিত যারা যাতায়ত করেন তারা এই প্রশ্নের মূখোমুখি হবেন প্রায়ই।

লিখেছেন ইমরান আশফাক, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৩৩

আচ্ছা, আপনাদের মধ্যে যারা কলকাতায় যাতায়ত করে থাকেন তারা স্হানীয়দের কাছেকি এই প্রশ্নটির মূখোমুখী হয়েছেন নিয়মিতভাবে: দেশভাগের সময় বাংলাদেশকে দেয়া হয়েছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মুর্শিদাবাদ আর ভারতকে দেয়া হয়েছিলো খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনা কেন কওমী জননী হয়েছিলেন ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ২:২৯


আওয়ামী লীগ করেন এমন অনেক মানুষ বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তি বোধ করেন। শেখ হাসিনা কেন কওমি জননী উপাধি গ্রহণ করলেন? আসলে সবাই যা বলতে চান,আওয়ামী লীগের রাজনীতি তো এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য নির্মূলে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৭


প্রস্তাবিত প্রকল্প: স্বাবলম্বী বাংলাদেশ - দারিদ্র্যমুক্তির নতুন নগর

আমি যদি সরকারের দারিদ্র্য নির্মূল বিভাগের প্রধান হতাম, তাহলে আমার প্রথম লক্ষ্য হতো বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করা ১ কোটি ৭০... ...বাকিটুকু পড়ুন

×