মাসুদ মজুমদার কাকা বলতে শুনেছি, কয়েক দিন আগের ঘটনা। সন্ধ্যায় টিভি সেটের সামনে বসা। বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপের বিষয় নিয়ে একটি ধারাভাষ্য শুনছিলাম। সেই মুহুর্তে একটি শব্দ কানে বাজল এবং বাঁধল! ধারাভাষ্যে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে নানা ধরনের ইতিবাচক বক্তব্য তুলে ধরা হচ্ছিল। হঠাৎ শেষ করা হলো ‘বঙ্গবন্ধু তোমাকে প্রণাম’ বলে! আমি জানি না বঙ্গবন্ধু জীবিত থাকলে এ ধরনের শব্দ চয়নে তিনি ব্যথিত হতেন কি না! প্রণাম একটি বিশেষ ধর্মের লোকজন শ্রদ্ধাবনত হয়ে গুরুজনদের জন্য ব্যবহার করেন। তারা সালাম বলেন না। বাঙ্গালি মুসলমানও প্রণাম জানায় না। একটি শব্দ নিয়ে ধর্মান্ধতা বা রক্ষণশীলতা প্রকাশ করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক অভিধানেও সালামের প্রতিশব্দ হিসেবে প্রণাম শব্দ গ্রহন করা হয়নি। তাই আমাদের মন ও মননের প্রতীক বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে শুরু হয়েছে ভাষা শহীদদের সম্মানে বইমেলা। উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী। এক দিকে আমাদের ভাষার লড়াই, স্বতন্ত্র্য রক্ষার আন্দোলন-অন্য দিকে কলকাতাইয়া শব্দের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার, তাও আবার বঙ্গবন্ধুর জন্য বরাদ্দ করা কোনো সুখকর আলামত স্পষ্ট করে না।
কোকোর মৃত্যুর পরও কোনো কোনো চ্যানেলে ও পত্রিকায় মরদেহ, শেষকৃত্যসহ এমন সব শব্দ চয়ন করেছে, যা আবহমান বাংলার নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ শুনতে ও বলতে অভ্যস্ত নয়। লাশ বলতে আমরা অভ্যস্ত। মৃত্যুকে আমরা ইন্তেকালও বলি। জানাজাকে আমরা শেষকৃত্য বা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াও বলি না। মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার পর পরই আমরা পড়ি- আল্লাহর কাছ থেকে আসে আবার আল্লাহর কাছে ফিরে যায়। তাও আরবিতে বলতেই আমরা অভ্যস্ত। তাই পড়ি- ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন। আজকাল আমরা অনেক শব্দ আমদানি করছি বিন দেশিদের ব্যবহৃত ভান্ডার থেকে। কলকাতা থেকে আমদানি করা কিংবা অনুসরণ করে আমাদের শব্দভান্ডার বাড়াচ্ছি বৈ কমাচ্ছি না। তবে শব্দের অপপ্রয়োগ বাড়ার ক্ষেত্রে আমাদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য নষ্ট হচ্ছে না বা সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আমাদের গ্রাস করছে কি না, সবাইকে তা ভেবে দেখতে অনুরোধ করছি। আমরা কখনো কূপমন্ডুক হতে যাবো না কিন্তু অতি আধুনিক হতে গিয়ে অস্তিত্ব বিপন্ন হতেও দিতে পারিনা। আমরা জল-পানির যুদ্ধ করতে চাই না। পুরো ভারতে বলে পানি পিহতা হ্যায়। পশ্চিমবঙ্গে জল পান করে। আমরা জলও পান করি আবার পানিও পান করি। বরং পান করার পরিবর্তে ‘খাই’ অশুদ্ধ শব্দ বলতেই আমরা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। এতে আমাদের কোনো গোঁড়ামি নেই। করবস্থানকে শ্মশান, জানাজাকে অন্য কিছু, দাফন-কাফনকে অপভ্রংশ শব্দের ভাষায় বলতে আমরা একেবারেই অনভ্যস্ত। কুলখানি, চল্লিশা গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়, সব দোয়া সব সময় করা যায়। দিন মেপে দোয়ার নিয়ম যুক্তিগ্রাহ্য নয়। তাও এসব দোয়ার অনুষ্ঠানকে প্রার্থনা সভা বলা আমাদের সাথে যায় না। তাই দয়া করে কিংবা মতলববাজি করে আমাদের ওপর অনাকাঙ্খিত কিছু আরোপ করা সমীচীন হচ্ছে না। তাতে সাংস্কৃতিক সঙ্ঘাত অনেক পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার জম্ম দেবে, যা আমাদের আবার একটি ভাষা আন্দোলনের দিকে ঠেলে দেবে বলে মনে করি। যার রাজনৈতিক রুপটাও হবে অনাকাঙ্খিত।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





