![]()
যারা এরপর যাবেন আগে যাননি, জেনে নিন, ট্রেনের টিকিটটা বেশ আগে কাটতে হবে, নাহলে মুস্কিলে পড়বেন। এসি চেয়ারই নিবেন, কেবিন ভাল না, অস্বস্তিকর।
সন্ধ্যেবেলায় পৌছলুম কোলকাতায়। ট্রেন থেকে নেমে ট্যাক্সিতে করে ছোটবেলার বন্ধু দিলীপের বাসায় যাব। পথে যেতে যেতে দেখলুম প্রতিমার হাট, তখন কালিপুজো চলছিল। টানা ৭-৮ দিন ধরে পুজো, মাইক আর শেষে প্রতিমা বিসর্জন। কোলকাতা কর্পোরেশনের শোভন চাটুজ্জেের একেবারে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্হা, কেউ কথা শোনেনা। গান বাজাবেই।
![]()
মেয়র শোভন চ্যাটার্জী।
মাইকে গান বেজেই চলেছে, সে এক ভয়াবহ অবস্হা! আবার সকালে অন্ধকার থাকতেই শুরু হত হেমন্ত, মান্না দে'র গান। রাত বারোটার পর একটু থামত। রোববারে বিসর্জন হলো তারপর একটু থামল! তবে বাজি পোড়ানো, বিসর্জনের রাতে ট্রাকে করে শত শত প্রতিমার গঙ্গার দিকে যাতায়াত বেশ ভালই লাগছিল।
আমার ভ্রমনটা তো রথ দেখা আর কলা বেচাও!
বেড়ানোর সাথে সাথে ডাক্তার দেখানোটাও প্ল্যানে আর কাজের মধ্যে ছিল। ক'দিন পর বেলভিউ হাসপাতালে নিজের শরীরটাকে
![]()
ডাক্তার নন্দীকে দেখিয়ে হালকা কিছু বাক্স প্যাটরা নিয়ে আয়েস করে রাতে উঠলুম হাওড়া- এনজেপি (নিউ জলপাইগুড়ি) সুপার ফাস্ট এসি এক্সপ্রেস ট্রেনে। টিকিট কাটা ছিল মাসখানেক আগে তাতেও ডব্লিউ এল মানে ওয়েটিং লিস্ট ছিল পরে আস্তে আস্তে কনফার্ম হয়েছে। কনফার্ম চেক করার জন্য একটা নম্বরে ফোন করলেই আপনাকে পুরো অবস্হাটা বলে দিবে। বন্ধু দিলীপ আলাদা গরম কাপড় নিতে বলল, তাই নিয়েছিলুম।
রাত ১১টা পাঁচে ছাড়বে। ট্রেন ছাড়লো নিউ জলপাইগুড়ির উদ্দেশ্যে, কাঁটায় কাঁটায় ঠিক টাইমে, রাত এগারোটা পাঁচেই!! অবাক হলুম না। ইন্ডিয়ান রেলওয়ের সুনাম আছে।
![]()
পুরো ট্রেনটাই এসি আর শোবার বন্দোবস্ত আছে খুব ভাল। ট্রেন থেকেই কম্বল বালিশ চাদর তোয়ালে ইত্যাদি দেয়া হয়। চমৎকার ব্যাবস্হা। আমাদের রেলের লোকেরা অখাদ্য বগী ইন্জিন ইত্যাদি কেনাকাটায় যতটা তৎপর যাত্রীসেবার মান উন্নত করার ব্যাপারে তাদের ততটাই কম আগ্রহ।
খাওয়া দাওয়া করেই উঠেছিলুম, তাই ট্রেনে খাওয়ার কোন ঝামেলা ছিলনা। পরদিন সকাল নটায় হ্যাঁ ঠিক ন'টায় পৌছলুম এনজেপি মানে নিউ জলপাইগুড়ি।
অবশ্য ঘুম থেকে উঠেছিলুম সকাল ৬ টায়। হাত মুখ ধুয়ে সাথে আনা হালকা নাস্তা করলুম আর খেলুম ট্রেনের গরম গরম কফি, ১০ টাকা। চা কফি ছাড়া অন্য কোন হকার উঠলনা। নিষেধ আছে।
![]()
প্লাটফরমটা কমলাপুরের কয়েকগুন হবে। একটা বিশাল এসি ওয়েটিং রুম দেখলুম।
সিড়ি ধরে উঠে ম্যালা খানিকটা হেঁটে স্টেশনের বাইরে নামলুম। আমরা যাবো কালিম্পং। এনজেপি থেকে বাস কালিম্পং যায় না যায় শিলিগুড়ি বাস স্টপ থেকে কালিম্পং যেতে হবে।
শিলিগুড়ি জায়গাটা এনজেপি স্টেশন থেকে আধ ঘন্টার যাত্রা। একটা টেম্পোতে উঠে পড়লুম যাবো শিলিগুড়ি বাসস্ট্যান্ড। মাইল তিনেক হবে, চলে আসলুম আধ ঘন্টার মধ্যেই। শিলিগুড়ি বাস স্টপেজের কাউন্টার থেকে কালিম্পং যাবার টিকিট নিলুম ১০০ টাকায়। ভাল কথা বাস স্টপেজে ভিড় টিড় দেখলুমনা। লাইন ফাইন, ভিড় এসব নেই!
চমৎকার চকচকে মিনিবাসে যেতে হবে প্রায় সাত হাজার ফুট উঁচু কালিম্পং এ। কোনো হাক ডাক বা প্যাসেন্জারদের ডাকাডাকি নেই। পনের মিনিটের মধ্যেই রওয়ানা হলুম। পরিষ্কার রাস্তা, ভাঙ্গাচুড়া নেই। আধ ঘন্টা পর পাহাড়ে উঠা শুরু হল। বেশ ভাল রাস্তা। কিছু জায়গাতে বিটুমিন উঠা ছিল সেখানে হুড়মুড় করে কর্মিরা রাস্তা মেরামতের কাজ করছে।
পাহাড়ের গায়ে ছোট ছোট ঝর্ণা আর রেস্তোরা।
একটা রোস্তোরাতে বসে মোমো খেলুম। (মোমো এক ধরনের স্টীমে ভাপানো ময়দার পিঠা, ভেতরে পুর দেয়া থাকে, মরিচের ভর্তা দিয়ে খায়, খেতে বেশ মজা)।
আধ ঘন্টা পর আবার যাত্রা। বেলা দেড়টা নাগাদ কালিম্পং শহরে। মিনিবাস তো আমাদের নামিয়ে দিল বাস স্টপেজে, হোটেলে যাই কেমনে।এক ট্যাক্সিওয়ালাকে আমাদের হোটেলের নাম ঠিকানা দেখালুম,সে বলল দুশ টাকা। খিদে লেগেছিল, সুতরাং তাই সই, উঠে পড়লুম। ১০ মিনিটে হোটেল! ভাল কথা ওখানে রিকশা বা সিএনজি জাতীয় কিছুই নেই, ট্যাক্সিই ভরসা, অথবা পদযুগল। কিন্তু বাক্স প্যাটরা নিয়ে পাহাড়ি পথে চলা প্রায় অসম্ভব। হোটেলটা ছিল পশ্চিম বঙ্গ সরকারের টুরিজম লজ। ছবি নীচে।
আগেই টাকা দিয়ে কোলকাতা থেকে বুক করেছিলুম। বেশ সস্তা। রুমে কোন ফ্যান নেই কারণ ফ্যান দরকার নেই। হীটার আছে।
এ প্রসঙ্গে হোটেলটার বুকিং করার ইতিহাসটা বলে নিলে ভাল হয়। কোলকাতার বিবাদি বাগে পশ্চিম বঙ্গ সরকারের পর্যটন অফিস। ক'দিন আগেই সকালে পকেটে টাকা নিয়ে গেলুম ঐ অফিসে হোটেল বুক করার জন্য। রুমের প্রচন্ড চাহিদা কারন নিরাপদ থাকার জায়গা আর কম টাকায়!ভদ্রমহিলার নাম রুপালী চৌধুরী কাউন্টারে বসা ছিলেন। আমার প্লান ছিল প্রথমে দার্জিলীং আর তার দুদিন পর কালিম্পং যাবো। কাউন্টারের ওপার থেকে মহিলা একটা কাগজে কলম ঘোরাতে ঘোরাতে বললেন দার্জিলীংএ ঐদিন রুম নেই দুদিন পরের হবে। দমে গেলুম কি করি? রুপালী উপায় বাৎলালেন, বললেন আগে দার্জিলীং না গিয়ে আগে কালিম্পং যান ওখানে ঘুরে আসতে আসতে দার্জিলীংএ রুম খালি হবে আপনি পেয়ে যাবেন।
বিনা পয়সায় এত চমৎকার একটা পরামর্শ! তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ দিয়ে টাকা দিয়ে দুজায়গাতেই রুম বুক করে নিলুম।
যাহোক কালিম্পং এ রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে লান্চ করার জন্য ডাকলুম নেপালী ওয়েটারকে। ভাত মাংশ সব আছে, খেলুম। আমাদের দেশে পর্যটকদের জন্য সরকারীভাবে এসব সুবন্দোবস্ত কল্পনাই বটে! লান্চ টান্চ করে বেরিয়ে পড়লুম কারণ সন্ধ্যে হব হব করছিল। কাছেই লাগোয়া ক্যান্টনমেন্ট, পুরো এলাকাটাই অসম্ভব সুন্দর। একটা গলফ কোর্স আছে, মিলিটারীরা খেলে, বাইরের লোকের খেলা বারণ। গলফ কোর্সের ছবি নীচে। ক্যামেরাটা গোলমাল করছিল, ছকিগুলো নীল হলো কিভাবে জানা নেই। অবশ্য আমি ক্যামেরা চালানোতে বেবী ইসলামের খালু!
কিছুক্ষন দেখলুম। বেশী হাটার উপায় নেই, পাহাড়ি পথে হাঁটা সহজ নয়। পাশের একটা মিলিটারী ক্যান্টিনে কফি খেতে ঢুকলুম। নিজেদেরই সার্ভ করতে হয়। বেশ ভাল লাগল।
পরদিন শহরটা ঘুরিয়ে দেখানোর জন্য কালকের সেই ট্যাক্সিওয়ালাকেই ডাকলুম। এর নাম রাজেশ, বলল পুরো শহর দেখাতে ঘন্টা পাঁচেক লাগবে, ভাড়া হাজার টাকা। সস্তাই মনে হল। আর পাহাড়ীরা সরল হয়, কাউকে ঠকায়না। বেশ কয়েকটা মন্দির, আর দর্শনীয় জায়গা দেখালো, সারাদিনই কেটে গেল।
বৌদ্ধদের মন্দির কাম স্কুল:
বুদ্ধদেবের মন্দির
হনুমানজীর বিখ্যাত মন্দির:
দুষ্প্রাপ্য ক্যাকটাসের বাগান:
মাঝখানে আমরা একটা রেস্তোরাতে ঢুকে লান্চ সারলুম। রাজেশকে অফার করলুম, সে শুধু একটা মিস্টি খেল। তার এই ব্যাবহারটা আমাদের খুব ভাল লাগল।বিকেলে ও বিদায় নিয়ে চলে গেল। আমরা হোটেলে । পরদিন আমাদের বিদায়, কাল যাবো দার্জিলীং।
সে গল্প আরেকদিন। এখন ক্লান্ত।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই ডিসেম্বর, ২০১৪ বিকাল ৫:১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



