somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যে পথ ধরে রথো রাফি হেঁটে যেতেন: চলে গেলেন ব্লগার রাফি

২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কবি, ব্লগার ও অনুবাদক রথো রাফির স্মরণ
রথো রাফি ব্লগ
রথো রাফি আর নেই—সত্যটি মেনে নেওয়া ভীষণ কঠিন। একজন মানুষের চিরপ্রস্থানের পর আমরা কেবল তার শারীরিক অনুপস্থিতিই টের পাই না, বরং গভীরভাবে উপলব্ধি করি তার সাথে হারিয়ে যাওয়া অসংখ্য অসমাপ্ত আলাপ, তর্ক আর ভাবনার শূন্যতাকে। আমার যোগাযোগে খুব ছিলাম তা নয়। তবে, এমন এক সময়ের সহযাত্রী ছিলাম যে তার সর্ম্পকে লেখা আমার কর্তব্য।
সামহয়্যার ইন ব্লগে তার পুরোনো লেখাগুলোর পাতায় চোখ রাখলে বোঝা যায়, জীবনকে কোনো সস্তা বা সহজ সমীকরণে তিনি কখনো মেনে নিতে চাননি। নিজের সাথে নিজের এক নিরন্তর তর্ক ছিল তার। স্বাধীনতা আর নির্ভরতার যে অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন, তার উত্তর তিনি খুঁজেছেন আজীবন। তার কাছে কবিতা কেবল ছন্দ, শব্দ বা অলংকারের খেলা ছিল না; বরং কবিতা ছিল তার প্রধান আশ্রয় ও আত্ম-জিজ্ঞাসার আয়না। একজন নরোম এবং শক্ত মানুষ।

তার লেখা ‘আমরা যারা হাঁটতে হাঁটতে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি ফিরতাম’—শিরোনামটিই এক অদ্ভুত ঘোর তৈরি করে। ঢাকার জ্যাম, বাসের ভিড়, বেকারত্বের হতাশা, বন্ধুদের আড্ডা আর শহরের অলিগলিতে আটকে পড়া অনিশ্চিত জীবনের এক নিখুঁত চিত্রায়ন এই লেখা। এই দীর্ঘ হাঁটা যেন গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য ছিল না; বরং তা ছিল নিজের অবস্থান, জীবনের ব্যর্থতা, শহরের ক্লান্তি আর চারপাশের সমাজকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের এক যাত্রা। যানজট আছে, শহরের কোলাহল আছে, কেবল সেই পথের নিপুণ পর্যবেক্ষক আর হাঁটবেন না এই পথে। সেই সময়টাও আর ফিরে আসবে না।

২০১৩ সালে লেখা ‘নিয়তি’তে তিনি বিশ্বাস ও নিঃসঙ্গতার কথা বলেছেন। প্রশ্ন তুলেছিলেন, “নির্ভরতা ছাড়া স্বাধীনতার কোন অর্থই হয় না!” এই একটি বাক্যের মাঝেই লুকিয়ে আছে এক দ্বিধাগ্রস্ত, সংবেদনশীল মানুষের প্রতিকৃতি। যিনি মুক্তি চান, আবার জানেন মানুষ চূড়ান্ত অর্থে একা বাঁচতে পারে না। সম্পর্কের প্রয়োজন তিনি বোঝেন, আবার সেই সম্পর্কের ভেতরের অদৃশ্য বন্দিত্বকেও তিনি অস্বীকার করতে পারেন না। তার লেখালেখিতে এই অস্বস্তি ফিরে এসেছে বারবার।

২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে লেখা ‘শাহবাগ প্রিয় শাহবাগ’ কবিতায় যেখানে তিনি গণমানুষের ন্যায়ের আকাঙ্ক্ষাকে মূর্ত করেছিলেন, ২০২৪ সালের ‘আমাদের গ্রাম’ কবিতায় এসে সেই সুর বদলে যায়। সেখানে জায়গা করে নেয় নীরবতা, ভয় আর ক্ষমতার কাছে মানুষের বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ার আখ্যান। কবিতা যে সামাজিক বাস্তবতার সাথে বোঝাপড়া করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম, তার লেখাগুলো সে কথাই প্রমাণ করে।

অনুবাদক হিসেবেও তার ক্যানভাস ছিল বিস্তৃত। এরিখ ফ্রাইড, মাহমুদ দারবিশ কিংবা চার্লস বুকাউস্কি থেকে শুরু করে ফিলিস্তিনি ও আরব বিশ্বের কবিতাকে তিনি বাংলা পাঠকের সামনে তুলে এনেছেন। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে, ২০২৬-এর আগস্টে প্রকাশিত ‘বারোমাস্যা’ কবিতায় তিনি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা ও নিপীড়িত শিশুদের যে অস্বস্তিকর চিত্র এঁকেছেন, তা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ পাঠকের নেই।

রথো রাফির সব কথার সাথে হয়তো সবাই একমত হবেন না। তার রাজনৈতিক দর্শন, সমাজভাবনা বা কবিতার ভাষা নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু তাকে পড়তে গিয়ে একটি বিষয় খুব স্পষ্ট হয়—তিনি প্রশ্ন করতে জানতেন। তিনি প্রচলিত ধারণাকে সন্দেহ করতেন, এমনকি নিজের চিন্তাকেও কখনো ছাড় দিতেন না। সামহয়্যার ইন ব্লগে তার রেখে যাওয়া ১৬৩টি পোস্ট কেবল কিছু লেখার সংখ্যা নয়, বরং বাংলা ব্লগিংয়ের সেই সময়কার এক ঐতিহাসিক দলিল—যখন মানুষ দীর্ঘ গদ্য লিখত, কবিতা ও অনুবাদের চর্চা করত এবং নিজের চিন্তাকে পাঠকের সামনে সাহসের সাথে মেলে ধরত।

মৃত্যুর পর আমরা প্রায়ই মানুষকে সমস্ত দ্বিধা ও অসম্পূর্ণতা থেকে মুছে ফেলে এক নিখুঁত চরিত্রে পরিণত করতে চাই। রথো রাফির ক্ষেত্রে এই ভুলটি না করাই শ্রেয়। তার ভেতরে যে ক্ষোভ, অস্বস্তি, প্রশ্ন আর তর্ক ছিল—সেগুলো সমেতই তাকে নতুন করে পাঠ করা উচিত।
আজ তার চিরবিদায়ের বেলায় সেই দীর্ঘ হাঁটার লেখাটিই বারবার মনে পড়ছে। আমরা সবাই কোনো না কোনো গন্তব্যের দিকে হেঁটে চলেছি। কেউ আগে পৌঁছায়, কেউ পরে, আর কেউ হয়তো মাঝপথেই হারিয়ে যায়। আমাদের হাঁটার স্মৃতিগুলো শুধু রয়ে যায় অন্যদের কাছে। রথো রাফি তার হাঁটার গল্পের কিছুটা আমাদের জন্য লিখে রেখে গেছেন।
সেই পথের বাকি অংশটুকুতে তিনি আর আমাদের সহযাত্রী হবেন না। বিদায়, রথো রাফি।

সহব্লগার শরৎ চৌধুরী, ২২শে অক্টোবর ২০২৬।

সর্বশেষ এডিট : ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:১০
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মক্কা থেকে বদর: মুসলিম ভ্রাতৃত্বের ভূরাজনীতি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:৪৫


মুসলিম বিশ্বে ঐক্যের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। অন্তত চুক্তিগুলোর নাম শুনলে তেমনটাই মনে হয়। মক্কা ও বদর। মুসলিম ইতিহাসের দুটি পরিচিত নাম। নাম শুনে মনে হতে পারে, বহুদিনের বিভেদ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্মোন্মাদদের কল্পিত বাস্তবতা: "দি ম্যাট্রিক্স" এবং নীল বড়ি

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:১৭


বাংলাদেশ ধর্মোন্মাদ ও জঙ্গিদের কবলে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধম্যের কল্যানে এই ধর্মোন্মাদনা দাবানলের মতো সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে।

ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে, কদিন আগে সাতক্ষীরায় একদল ধর্মোন্মাদ ও জঙ্গি ওয়াহিদুজ্জামান শামীম... ...বাকিটুকু পড়ুন

যারা ব্রয়লার মুরগী খায় তারা সমকামী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৩


ওয়াজ শোনেন অথচ মুফতি কাজী ইব্রাহিম হুজুরকে চেনেন না, এমন মানুষ বাংলাদেশে খুব কমই আছেন। হুজুরের আরেকটি বড় পরিচয় হলো, তিনি করোনার ওষুধ স্বপ্নে পেয়েছেন বলে দাবি করেছিলেন। হুজুর... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেইপ শিফটার ৩ - মাছ কন্যা

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:১৯


২০১১ এর দিকে নর্থ –ইয়র্কে থাকাকালীন রুমার বাসার আশেপাশে তেমন কোন বাঙালি দোকান ছিল না ।সেই টরোন্টর নামকরা চাইনিজ সুপারমার্কেট –টা বেশ দূরে। পায়ে হেঁটে যাওয়ার পথ নয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে পথ ধরে রথো রাফি হেঁটে যেতেন: চলে গেলেন ব্লগার রাফি

লিখেছেন শরৎ চৌধুরী, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:০৩

কবি, ব্লগার ও অনুবাদক রথো রাফির স্মরণ
রথো রাফি ব্লগ
রথো রাফি আর নেই—সত্যটি মেনে নেওয়া ভীষণ কঠিন। একজন মানুষের চিরপ্রস্থানের পর আমরা কেবল তার শারীরিক অনুপস্থিতিই টের পাই না, বরং গভীরভাবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×