কবি, ব্লগার ও অনুবাদক রথো রাফির স্মরণ
রথো রাফি ব্লগ
রথো রাফি আর নেই—সত্যটি মেনে নেওয়া ভীষণ কঠিন। একজন মানুষের চিরপ্রস্থানের পর আমরা কেবল তার শারীরিক অনুপস্থিতিই টের পাই না, বরং গভীরভাবে উপলব্ধি করি তার সাথে হারিয়ে যাওয়া অসংখ্য অসমাপ্ত আলাপ, তর্ক আর ভাবনার শূন্যতাকে। আমার যোগাযোগে খুব ছিলাম তা নয়। তবে, এমন এক সময়ের সহযাত্রী ছিলাম যে তার সর্ম্পকে লেখা আমার কর্তব্য।
সামহয়্যার ইন ব্লগে তার পুরোনো লেখাগুলোর পাতায় চোখ রাখলে বোঝা যায়, জীবনকে কোনো সস্তা বা সহজ সমীকরণে তিনি কখনো মেনে নিতে চাননি। নিজের সাথে নিজের এক নিরন্তর তর্ক ছিল তার। স্বাধীনতা আর নির্ভরতার যে অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন, তার উত্তর তিনি খুঁজেছেন আজীবন। তার কাছে কবিতা কেবল ছন্দ, শব্দ বা অলংকারের খেলা ছিল না; বরং কবিতা ছিল তার প্রধান আশ্রয় ও আত্ম-জিজ্ঞাসার আয়না। একজন নরোম এবং শক্ত মানুষ।
তার লেখা ‘আমরা যারা হাঁটতে হাঁটতে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি ফিরতাম’—শিরোনামটিই এক অদ্ভুত ঘোর তৈরি করে। ঢাকার জ্যাম, বাসের ভিড়, বেকারত্বের হতাশা, বন্ধুদের আড্ডা আর শহরের অলিগলিতে আটকে পড়া অনিশ্চিত জীবনের এক নিখুঁত চিত্রায়ন এই লেখা। এই দীর্ঘ হাঁটা যেন গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য ছিল না; বরং তা ছিল নিজের অবস্থান, জীবনের ব্যর্থতা, শহরের ক্লান্তি আর চারপাশের সমাজকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের এক যাত্রা। যানজট আছে, শহরের কোলাহল আছে, কেবল সেই পথের নিপুণ পর্যবেক্ষক আর হাঁটবেন না এই পথে। সেই সময়টাও আর ফিরে আসবে না।
২০১৩ সালে লেখা ‘নিয়তি’তে তিনি বিশ্বাস ও নিঃসঙ্গতার কথা বলেছেন। প্রশ্ন তুলেছিলেন, “নির্ভরতা ছাড়া স্বাধীনতার কোন অর্থই হয় না!” এই একটি বাক্যের মাঝেই লুকিয়ে আছে এক দ্বিধাগ্রস্ত, সংবেদনশীল মানুষের প্রতিকৃতি। যিনি মুক্তি চান, আবার জানেন মানুষ চূড়ান্ত অর্থে একা বাঁচতে পারে না। সম্পর্কের প্রয়োজন তিনি বোঝেন, আবার সেই সম্পর্কের ভেতরের অদৃশ্য বন্দিত্বকেও তিনি অস্বীকার করতে পারেন না। তার লেখালেখিতে এই অস্বস্তি ফিরে এসেছে বারবার।
২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে লেখা ‘শাহবাগ প্রিয় শাহবাগ’ কবিতায় যেখানে তিনি গণমানুষের ন্যায়ের আকাঙ্ক্ষাকে মূর্ত করেছিলেন, ২০২৪ সালের ‘আমাদের গ্রাম’ কবিতায় এসে সেই সুর বদলে যায়। সেখানে জায়গা করে নেয় নীরবতা, ভয় আর ক্ষমতার কাছে মানুষের বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ার আখ্যান। কবিতা যে সামাজিক বাস্তবতার সাথে বোঝাপড়া করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম, তার লেখাগুলো সে কথাই প্রমাণ করে।
অনুবাদক হিসেবেও তার ক্যানভাস ছিল বিস্তৃত। এরিখ ফ্রাইড, মাহমুদ দারবিশ কিংবা চার্লস বুকাউস্কি থেকে শুরু করে ফিলিস্তিনি ও আরব বিশ্বের কবিতাকে তিনি বাংলা পাঠকের সামনে তুলে এনেছেন। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে, ২০২৬-এর আগস্টে প্রকাশিত ‘বারোমাস্যা’ কবিতায় তিনি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা ও নিপীড়িত শিশুদের যে অস্বস্তিকর চিত্র এঁকেছেন, তা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ পাঠকের নেই।
রথো রাফির সব কথার সাথে হয়তো সবাই একমত হবেন না। তার রাজনৈতিক দর্শন, সমাজভাবনা বা কবিতার ভাষা নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু তাকে পড়তে গিয়ে একটি বিষয় খুব স্পষ্ট হয়—তিনি প্রশ্ন করতে জানতেন। তিনি প্রচলিত ধারণাকে সন্দেহ করতেন, এমনকি নিজের চিন্তাকেও কখনো ছাড় দিতেন না। সামহয়্যার ইন ব্লগে তার রেখে যাওয়া ১৬৩টি পোস্ট কেবল কিছু লেখার সংখ্যা নয়, বরং বাংলা ব্লগিংয়ের সেই সময়কার এক ঐতিহাসিক দলিল—যখন মানুষ দীর্ঘ গদ্য লিখত, কবিতা ও অনুবাদের চর্চা করত এবং নিজের চিন্তাকে পাঠকের সামনে সাহসের সাথে মেলে ধরত।
মৃত্যুর পর আমরা প্রায়ই মানুষকে সমস্ত দ্বিধা ও অসম্পূর্ণতা থেকে মুছে ফেলে এক নিখুঁত চরিত্রে পরিণত করতে চাই। রথো রাফির ক্ষেত্রে এই ভুলটি না করাই শ্রেয়। তার ভেতরে যে ক্ষোভ, অস্বস্তি, প্রশ্ন আর তর্ক ছিল—সেগুলো সমেতই তাকে নতুন করে পাঠ করা উচিত।
আজ তার চিরবিদায়ের বেলায় সেই দীর্ঘ হাঁটার লেখাটিই বারবার মনে পড়ছে। আমরা সবাই কোনো না কোনো গন্তব্যের দিকে হেঁটে চলেছি। কেউ আগে পৌঁছায়, কেউ পরে, আর কেউ হয়তো মাঝপথেই হারিয়ে যায়। আমাদের হাঁটার স্মৃতিগুলো শুধু রয়ে যায় অন্যদের কাছে। রথো রাফি তার হাঁটার গল্পের কিছুটা আমাদের জন্য লিখে রেখে গেছেন।
সেই পথের বাকি অংশটুকুতে তিনি আর আমাদের সহযাত্রী হবেন না। বিদায়, রথো রাফি।
সহব্লগার শরৎ চৌধুরী, ২২শে অক্টোবর ২০২৬।

সর্বশেষ এডিট : ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



