somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জার্মান শিক্ষকের সততার জ্বলন্ত উদাহরণ

০৮ ই জুন, ২০১২ বিকাল ৪:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

জার্মান শিক্ষকের সততার জ্বলন্ত উদাহরণ

- হোসাইন আব্দুল হাই

মা, মাতৃভাষা আর মাতৃভূমি যে কতোটা আপন তা এ তিনের কোন একটি থেকে দূরে না গেলে বোঝা কঠিন৷ অথচ এই দূর প্রবাসে একান্ত এই তিন আপনকেই ছেড়ে থাকতে হয়৷ ফলে এই তিন আপনের প্রতি এক নিগূঢ় টান যেন আরো বেশি করে উদ্বেলিত করে৷

এ তো শুধু নিজের মা, মাতৃভাষা আর মাতৃভূমির কথা বললাম৷ কিন্তু জার্মান জাতি তাদের নিজেদের ভাষাকে যে কতোটা ভালোবাসে তা নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন৷ আমাদের জনদরদী রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে শিক্ষিত পেশাজীবীরা বাংলার সাথে ইংরেজি জুড়ে দেওয়া ছাড়া তো একটি বাক্যও গঠন করতে পারবেন কি না সন্দেহ রয়েছে৷ অথচ জার্মান জাতির সেই শীর্ষ ব্যক্তিটি থেকে শুরু করে ভবঘুরে পর্যন্ত সবার কাছে প্রথম এবং প্রধান মূল্যবোধ হলো একেবারে খাঁটি জার্মান ভাষায় কথা বলতে হবে৷ আর সেই জার্মান ভাষার সাথে একটু-আধটুও বিদেশি ভাষা যোগ করা চলবে না, জার্মান ভাষাবিদদের ঐকমত্যে স্বীকৃত শব্দ ছাড়া৷ তবে সম্প্রতি জার্মান ভাষাতেও কিছুটা বিদেশি শব্দের অনুপ্রবেশ লক্ষ্য করা যাচ্ছে৷ আর তা নিয়ে আলোচনাও শুরু হয়েছে৷

যাহোক, ইংরেজি, ফরাসি কিংবা স্পেনীয় ভাষা কেউ জানলো কি না তাতে জার্মানদের কিছুই আসে যায় না৷ তবে মাতৃভাষাকে পুরোপুরি বক্ষে ধারণ করে, লালন করে তারপর আরো দুয়েকটি ভাষা শেখার চেষ্টা তাদের অনেকেরই রয়েছে৷

ভাষা নিয়ে এতো কথা বলার পেছনে আসলে অন্য কারণ রয়েছে৷ সেটি হলো, মাতৃভাষার প্রতি এতোটা ভক্তি থেকেই বুঝি ব্যাপারটা এখন এতোদূর গড়িয়েছে যে, জার্মানিতে কেউ বাস করতে আসবে আর জার্মান ভাষা জানবে না তা যেন হতেই পারে না৷ বাজার-ঘাট, পথ-প্রান্তর, দপ্তর-আদালত সব জায়গায়, বলতে গেলে, একমাত্র মাধ্যম জার্মান ভাষা৷ এমনকি দীর্ঘ দীর্ঘ দলিল, চুক্তিনামা কিংবা বিভিন্ন আবেদন পত্র সবই জার্মান ভাষায়৷ এগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ দুয়েকটির হয়তো অন্য ভাষায় অনুবাদ জুটতে পারে বহু কষ্টে৷ ফলে একটু দীর্ঘ সময় জার্মানিতে থাকতে হলে কারো ভাষা না শিখে উপায় নেই৷ তাই তাদের ভাষা শেখার বিদ্যালয় কিংবা বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে প্রায় সর্বত্রই৷

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জার্মানির প্রতিনিধিত্বকারী গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ডয়চে ভেলেতে অর্ধ শতাধিক দেশের মানুষের সমাগম৷ তাই সেখানেও চালু আছে বিনা পয়সায় জার্মান ভাষা শিক্ষার একাধিক কোর্স৷ এছাড়া ডয়চে ভেলের পাশেই রয়েছে সুউচ্চ দু'টি ভবনে জাতিসংঘ এবং জার্মান ডাক সংস্থার কার্যালয়৷ তাই এই এলাকায় বিদেশি মানুষের আনাগোনা একটু বেশিই৷ তাই এখানেই রয়েছে আরো একটি বেসরকারি ভাষা শেখার প্রতিষ্ঠান৷ ফলে জার্মানিতে এসেই প্রথম মাস থেকেই জার্মান ভাষা শেখার প্রক্রিয়ার সাথে নিজেকে জুড়ে নিতে হয়েছে৷ ফলে ইতিমধ্যে জার্মানির সাধারণ মানুষের মধ্যে তো বটেই শিক্ষকদের মাঝেও যে সততা চোখে পড়েছে তা অভাবনীয়৷

জার্মানদের সময়জ্ঞানের এমনিতেই বিশেষ খ্যাতি রয়েছে৷ কিন্তু মহান পেশায় জড়িত শিক্ষকদের সময়জ্ঞান ও সতর্কতার মাত্রাটা বোধ হয় আরো এক ধাপ উপরে৷ কোন শিক্ষককেই কখনও এক মিনিট পরে আসতে দেখা যায় না৷ বরং পাঁচ-দশ মিনিট আগে এসে তাঁরা পড়ানোর প্রস্তুতি গ্রহণ করেন৷

এরকমই মহান এবং খুবই দক্ষ একজন শিক্ষকের একটি ঘটনা আমাদের প্রচণ্ড আলোড়িত করে৷ ডয়চে ভেলেতে আমাদের একেকটি ভাষা শেখার কোর্স চলে দিনে দেড় ঘণ্টা করে৷ আমাদের সেই মহান শিক্ষক সপ্তাহে একদিন পড়াতেন৷ কোন এক জরুরি প্রয়োজনে একদিন জানালেন সেদিন তিনি আমাদের এক ঘণ্টা পড়াবেন৷ আমরাও খুশি যে, ভালই হলো একটু আগেই ছুটি পেলাম আজ৷ পরের সপ্তাহেও তিনি জানালেন, সেদিনও এক ঘণ্টা পড়াবেন৷ কিন্তু তৃতীয় সপ্তাহে এসেও তিনি একইকথা বললেন৷ আমরা একটু আশ্চর্য হলাম যে, তিনি কি ফাঁকি দেওয়া শুরু করলেন? কিন্তু না৷ তিনি নিজেই তাঁর অবস্থান পরিষ্কার করার জন্য খুলে বললেন আসল হিসাব৷

তাঁর যুক্তি হচ্ছে, তিনি একদিন জরুরি প্রয়োজনে আধা ঘণ্টা কম পড়িয়েছেন৷ তাই তিনি তিন দিনই আধা ঘণ্টা করে কম পড়িয়ে তিন দিনে মোট তিন ঘণ্টা পড়িয়েছেন৷ যাতে করে এই তিন ঘণ্টার জন্য তিনি দেড় ঘণ্টা করে দুই দিন পড়ানোর সম্মানি ডয়চে ভেলের কাছ থেকে নিতে পারেন৷ অর্থাৎ তিনি তিন দিনই পড়িয়েছেন কিন্তু টাকা নিবেন দুই দিনের৷ কারণ তিন দিনে তিনি মোট দেড় ঘণ্টা অর্থাৎ একদিনের পড়া কম পড়িয়েছেন৷ তাঁর এই হিসাব শুনে আমরা তো সবাই যেন আকাশ থেকে পড়লাম৷ আর তখনই বুঝলাম, কী করে এই জাতির পক্ষে এতো অল্প সময়ে ইউরোপের সবচেয়ে ধনী দেশে এবং একটি সভ্য ও উন্নত দেশে পরিণত হওয়া সম্ভব হয়েছে৷ তখনই বুঝলাম, সত্যিই একজন শিক্ষক কতোটা মহান হতে পারেন, যদি তাঁর মধ্যে সততা থাকে৷
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই জুন, ২০১২ বিকাল ৪:৪৫
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইসলাম প্রতিষ্ঠায় যুদ্ধের প্রয়োজন নেই, ভালোবাসাই যথেষ্ট

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২১ শে জুন, ২০২৬ রাত ১১:৪৮



চীনের লিংশান পর্বতে শুয়ে আছেন ইসলামের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ)-এর দুই সাহাবী সা-কে-জু (Sa-Ke-Zu) এবং
উউ-কো-শুন (Wu-Ko-Shun)। এই নামেই তাঁদের চিনতো স্থানীয় চীনবাসীরা। অবাক হতে হয়, আরব... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রিয় সামু ব্লগারদের কাছে খোলা চিঠি.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২২ শে জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫০

প্রিয় সামু ব্লগারদের কাছে খোলা চিঠি.....

প্রিয় সহব্লগার,
একসময় সামু ছিল আমাদের ছোট্ট এক মহাবিশ্ব।
দৈনিক গড়ে তিন-চারশ' ব্লগার অনলাইনে থাকতেন। প্রতি মিনিটেই নতুন নতুন পোস্ট আসত। কেউ গল্প লিখছেন, কেউ কবিতা, কেউ... ...বাকিটুকু পড়ুন

অন্য ধর্মের অনুসারীদের সাথে সদয় আচরণ করলে আল্লাহর ভালোবাসা পাবেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২২ শে জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৭

১) "দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে নিজ দেশ থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদয় আচরণ ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেননি। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল

লিখেছেন রোকসানা লেইস, ২২ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:০৭



বাংলাদেশে শেষ কবে সিনেমা হলে গিয়ে মুভি দেখেছিলাম মনে নাই। গতকাল সন্ধ্যায় আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিলাম, স্টার সিনেপ্লেক্স মুভি থিয়েটারে। এখন আর আগের মতন সিনেমা হল নেই। অনেক কিছু বদলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগে প্রথম ১০০০০০ মন্তব্যপ্রাপ্ত রাজীব নুর'কে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা!!

লিখেছেন বিজন রয়, ২২ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪০



প্রাপ্ত মন্তব্য ১,০০,০০০!!
ঐতিহাসিক!

এই ব্লগের ইতিহাসে রাজীব নুর আপনি সর্বপ্রথম ১০০০০০ মন্তব্য পেয়ে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করলেন!

আপনাকে অভিনন্দন আর শুভেচ্ছা প্রাণঢালা।

আপনি আবার এই ব্লগে সর্বপ্রথম ১০০০০০ মন্তব্যকারীও বটে!
সেটা নিয়ে আমি এই... ...বাকিটুকু পড়ুন

×