
তিন দিন আগে একজন সরকারি অফিসার মোটর সাইকেল দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। দুর্ঘটনায় নিহত ময়মনসিংহের ত্রিশালের ইউএনও। তিনি ত্রিশালের একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটও। ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সাথে আমার পরিচয় ছিল না। তবে ফেসবুকে তিনি আমার ফ্রেন্ড লিস্টে আছেন। আমরা একই কলেজে পড়াশুনা করেছি। নটরডেম কলেজে। তিনি আমার দুএক বছরের সিনিয়র হবেন। যতদূর জানি তিনি বিবাহিত; কোন সন্তান নেই। তাঁর মৃত্যুর পর ফেসবুকে স্বামীস্ত্রীর যুগল ছবি দেখেছি। সদ্য বিধবা এই দুঃখিনী মেয়েটির কথা ভাবলে আমার চোখ ঘোলা হয়ে আসে। কয়েক বছর আগে বিয়ে হওয়া এই মেয়েটি নিশ্চয়ই এখন মা হওয়ার কথা ভাবছিল। কি জানি, মেয়েটি এখন সন্তানসম্ভবা কিনা? কী হবে এখন এই মেয়েটির? আহা রে!
আর রাশেদুল ইসলামের বাবা-মায়ের এখন কী অবস্থা! দেশের কয়জন বাবা-মায়ের সন্তান ম্যাজিস্ট্রেট হতে পারে? যতই আমরা রাশেদুল ইসলাম বা তাঁর কলিগদের ‘আমলা’ বলে গালমন্দ করি না কেন, একজন ম্যাজিস্ট্রেটের বাবার বুক যে গর্বে সবসময় কয়েক ইঞ্চি ফুলে থাকে তা অস্বীকার করি কীভাবে? আহা রে, বাকি জীবনে এই বাবা-মায়ের চোখ কি শুকাবে? কত পরিশ্রম, কত সৌভাগ্যের বদলে না রাশেদুল ইসলাম প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দিতে পেরেছেন। হয়তো একদিন তিনি সরকারের সচিব হতেন। দেশের জন্য কিছু একটা করতেন। একজন ব্যুরুক্রেট বানানোর জন্য সরকার নিশ্চয়ই তাঁকে অনেক প্রশিক্ষণ দিয়েছ। সরকার কি পারবে তাঁর জায়গায় এখন আরেকজনকে নিয়োগ দিতে? নাহ, পারবে না।
আমার আন্দাজ মতে প্রায় সাত বছর আগে রাশেদুল ইসলাম সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়েছেন। সম্ভবত গত সাত বছর তিনি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্বও পালন করেছেন। আমরা জানি, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ মোবাইল কোর্ট করে থাকেন। জনজীবনে অশান্তি সৃষ্টিকারী অনেক ছোটখাট অপরাধের শাস্তি মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে তাৎক্ষনিকভাবে দিয়ে দেওয়া হয়। অনেকবার রাস্তাঘাটে মোবাইল কোর্ট হতে দেখেছি। দেখেছি মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে মোটরযানের চালকদের শাস্তি দিতে। বেপরোয়া গাড়ি চালানোর জন্য, লাইসেন্স না থাকার জন্য কিংবা হেলমেট ছাড়া ‘হোন্ডা’ চালানোর জন্য। আমি নিশ্চিত, রাশেদুল ইসলামও নিশ্চয়ই এ ধরনের শাস্তি দিয়েছেন। আমার ধারনা, বাংলাদেশের প্রত্যেক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটই কমপক্ষে একবার হলেও হেলমেট ছাড়া হোন্ডায় চড়ার জন্য কাউকে না কাউকে শাস্তি দিয়েছেন।
হেলমেট ছাড়া মোটর সাইকেলে চড়া মারাত্মক ‘রিস্কি’। হেলমেট পড়া থাকলে অনেক মারাত্মক দুর্ঘটনাও খুব একটা ক্ষতি করে না। আমি মোটর সাইকেল দুর্ঘটনার অনেক ভয়ংকর ভিডিও দেখেছি, যেখানে হেলমেট থাকার কারণে আরোহীদের তেমন কিছু হয় না। আগ্রহীরা ইউটিউবে দেখে নিতে পারেন। অধিকাংশ দুর্ঘটনায় আরোহীরা দূরে ছিটকে পড়েন। ছিটকে পড়ে কোথাও ধাক্কা খেলে শরীরে আঘাত লাগে। হাতে-পায়ে আঘাত লাগলে ক্ষতিটা অল্পের উপর দিয়ে যায়, প্রাণঘাতী হয় না। কিন্তু মাথায় লাগলে সেটা ভয়ানক হয়। মৃত্যুর আশংকা দেখা দেয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আহত ব্যক্তি মারা যায়। হেলমেট মৃত্যুর আশংকা অনেক কমিয়ে দেয়। আমি একজন এক্সপার্টের মুখে শুনেছি, শুধুমাত্র হেলমেট পড়লেই নাকি মোটর সাইকেল দুর্ঘটনায় ৬০-৭০ ভাগ মৃত্যু এড়ানো যাবে।
ফেসবুক এবং পত্রিকায় রাশেদুল ইসলামের দুর্ঘটনার যে খবর পড়েছি বা ছবি দেখেছি তাতে মনে হয়েছে দুর্ঘটনার সময় তিনি হেলমেট পড়া অবস্থায় ছিলেন না। ছবি দেখে মনে হয়েছে, যদি তিনি ওই সময় হেলমেট পড়া থাকতেন তাঁর হয়তো তেমন কিছুই হতো না। কারণ, তাঁর শরীর মোটামুটি অক্ষতই ছিল। শুধু মাথা থেকে রক্ত ঝরছিল। হেলমেট পড়া থাকলে মাথার আঘাত হয়তো মরণঘাতী হতো না। হয়তো হেলমেট পড়া থাকলে রাশদুল ইসলামের লাশ আমাদের দেখতে হতো না; তাঁর স্ত্রী বিধবা হতো না; তাঁর গর্বিত বাবা-মা সন্তানহারা হতো না; আর রাষ্ট্র একজন অফিসার হারাতো না।
হেলমেট পরিহিত মোটর সাইকেল আরোহী বাংলাদেশে তেমন একটা দেখা যায় না। সাধারণ মানুষ না হয় অসাবধানতার কারণে হেলমেট পড়েন না। কিন্তু একজন ম্যাজিস্ট্রেট তো সাধারণ নন। তিনি তো বিচারক, বিজ্ঞ ব্যক্তি। কয়জন ম্যাজিস্ট্রেট বলতে পারবেন যে তাঁরা ব্যক্তিগত বা সরকারি কাজে মোটর সাইকেলে চড়লে হেলমেট পড়েন? কয়জন বলতে পারবেন তাঁরা তাঁদের আশেপাশের লোকজনকে (কর্মচারী/আত্ত্বীয়-স্বজন) হেলমেট পড়তে নির্দেশ দেন? প্রশাসন ক্যাডারের খুব বেশি অফিসারকে মোটর সাইকেলে চড়তে হয় না। সাধারণত এসিল্যান্ডদের মোটর সাইকেলে চড়তে হয়। বাকিরা প্রায় সবাই গাড়িতে চড়েন। আচ্ছা, যারা গাড়িতে চড়েন তাঁরা কি গাড়িতে সীটবেল্ট পড়েন? ছোট্ট একটা উদাহরণ দেই। একজন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট যখন গাড়িতে চড়েন, তিনি নিজে কি সীটবেল্ট পড়েন বা তাঁর ড্রাইভার, গানম্যানকে কি সীটবেল্ট পড়তে বলেন? আমার মনে হয় না।
যারা এসিল্যান্ড হিসেবে কাজ করেন তাদেরকে মোটর সাইকেলে চড়ে দ্বায়িত্ব পালন করতে হয়। সরকার তাঁদের জন্য গাড়ির ব্যবস্থা করতে পারছে না। এটা ঠিক, কাজের সুবিধার্থে তাঁদের গাড়ি দেওয়া উচিত। এর চেয়ে অনেক কম গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তারাও সরকারি গাড়ি পান। যাইহোক, গাড়ি দেওয়া না দেওয়াটা সরকারের নীতিগত বিষয়। আপাতত যে মোটর সাইকেলটা আছে সেটা সাবধানে চালনো উচিত। তাঁদের গাড়ি না থাক, হেলমেট পড়তে তো বারণ নাই? যে আইন তাঁরা অন্যের উপর প্রয়োগ করছেন সে আইন তাঁরা নিজেরা ভাঙবেন কেন?
বড় দুর্ঘটনা মানুষের জীবনে একবারই ঘটবে। ওই একবারের দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্যই আমাদের সারা জীবন সাবধানী হতে হবে। একবার কিছু হয়ে গেলে তখন বোঝা যায় অসাবধানতার মূল্য কত। কিন্তু তখন আর কিছুই করার থাকে না। থাকে শুধু কান্না আর কষ্ট।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা এপ্রিল, ২০১৬ রাত ১১:০৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


