ঘরর্ ঘরর্ ঘররর্ – এইরকম শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল । উঠে দেখি, বাবা আমার পাশে শুয়ে ঘুমাচ্ছেন । আর এই ঘরর্ ঘরর্-এর উৎসস্থল বাবার নাক । সাধারণত মায়ের সাথে কোনকিছু নিয়ে ঝগড়া হলেই হয় বাবা, না হয় মা – দুইজনের একজন আমার বিছানায় এসে ঘুমান । বুঝলাম ঝগড়া হয়েছে এবং সেটা হয়েছে আজ সকালে । কারণ কাল রাত্রেও তারা দুইজন একসাথে স্টার জলসায় সিরিয়াল দেখে সিরিয়ালের কাহিনী নিয়ে নিজেদের মধ্যে গঠনমূলক আলোচনা করতে করতে ঘুমাতে গিয়েছিলেন । সকালে কি নিয়ে ঝগড়া হলো, সেটা জানার জন্য মন আকুপাকু করতে লাগলো । বালিশের নিচ থেকে মোবাইলটা নিয়েই মুখ শুকিয়ে আমসত্ত্ব হয়ে গেল । ১৪টা মিসড্ কল, সবগুলাই জয়িতার । টাইমকলের পানি মিস করলেও মাফ আছে, কিন্তু জয়িতার কল মিস করলে মাফ নাই । তবুও নিজের মনকে সান্ত্বনা দিলাম এই ভেবে যে, ইচ্ছা করে তো আর কল মিস করি নাই । ধারেকাছে এটম বোমা পড়লেও সেই শব্দ বাবার নাকডাকার শব্দে চাপা পড়ে যাবে; আর এইটা তো সামান্য রিংটোন । হাত-মুখ ধুয়ে এসে নাস্তা খাওয়ার আগেই জয়িতার ঝাড়ি খাওয়ার প্রস্তুতি নিলাম । কল দিলাম, জয়িতা রিসিভ করেই বললো “তোমাকে সামনে পেলে তোমার মাথায় আমার ছোটভাইয়ের খেলার ব্যাট দিয়ে একটা বাড়ি দিতাম ।” আমি নিজের মাথায় হাত দিয়ে মনে মনে মাথাকে বললাম, “অনেক বড় বাঁচা বেঁচে গেলিরে মামা ।”, আর মুখে বললাম, “ঘুমিয়ে ছিলাম তো, তাই রিংটোন শুনতে পাই নাই ।” জয়িতা বললো, “ঘুমিয়েই থাকো, একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখবা সারা দুনিয়া পাল্টে গেছে আর তুমি বিছানাতেই পড়ে আছো ।” আমি বললাম, “দুনিয়া কখনোই পাল্টাবে না, পাল্টালে মানুষ পাল্টাবে । কবি বলে গেছেন, মানুষ পরিবর্তনশীল । কিন্তু আমার জানামতে কেউ বলে যান নাই যে, দুনিয়া পরিবর্তনশীল । এই কথা কাউকে বলতে শুনছো নাকি তুমি ?” এইবার জয়িতার রাগ ৫ম গিয়ারে উঠলো, হুঙ্কার দিয়ে বললো “তোমাকে সামনে পাইলে এখন খুন করতাম । তুমি জানো আমার বাসায় কি হইতেছে ?” কালকে বিকেলেই জয়িতার সাথে ঘুরলাম, একদিনে কি এমন হতে পারে বুঝে পেলাম না । একজন রাগ করলে আরেকজনের শান্ত থাকতে হয়, প্রেমের এই ফর্মুলা গুগলে পাইছি । তাই শান্তকন্ঠে বললাম, “আমি তো আর উইকিলিক্সের জুলিয়ান এ্যাসাঞ্জ না যে সবকিছুই জানব । তুমি না বললে কিভাবে জানবো যে তোমার বাসায় কি হইতেছে ?” এইবার জয়িতাও একটু শান্ত হল, বললো “আমাকে আজ দুপুরে দেখতে আসতেছে ।” আমি বললাম, “তোমাকে দেখতে আসার কি আছে ? তোমার কি মাথায় দুইটা শিং গজাইছে, নাকি এক্সট্রা দুইটা হাত বের হইছে ?” আবার জয়িতার রাগ উঠলো, সে সমস্ত গাধাজাতিকে অপমান করে আমাকে বললো “তোমার মত গাধার সাথে প্রেম করাই আমার ভুল হইছে । আমার শিং, হাত কিছুই গজায় নাই । আজ দুপুরে আমাকে ছেলেপক্ষ দেখতে আসবে ।” এইবার বুঝলাম জয়িতার সকালে ফোন করার কারণ ।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “ছেলে কি করে ? ছবি দেখছো ? দেখতে কেমন ? নাম কি ?”
জয়িতা বললো, “ছেলে না, ব্যাটা বল । নাম হারুনুর রশীদ । ছবি দেখছি, মটকু একটা । আমার মত চিকনা মেয়েকে বিয়ে করার এত শখ কেন বুঝলাম না । আর বয়সে আমার চেয়ে ১০/১২ বছরের বড় ।”
আমি জ্ঞানীর মত বললাম, “এইটাই জগতের নিয়ম । মটকু চিকনাকে বিয়ে করবে, কালো ফর্সাকে বিয়ে করবে, খাটো লম্বাকে বিয়ে করবে, ধনী গরীবকে বিয়ে করবে । এতে করে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষিত হয়, আর এটাকে বলা হয় প্রাকৃতিক সাম্যাবস্থা ।”
জয়িতা বললো, “তোমার প্রাকৃতিক সাম্যাবস্থার গুষ্টি কিলাই । আমি এই বুইড়া মটকুরে বিয়ে করে প্রাকৃতিক সাম্যাবস্থা বজায় রাখতে পারবো না, Impossible.”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “এখন তাহলে কি করবা ?”
জয়িতা উত্তর দিল, “আমি কিছু করবো না, যা করার তুমি করবা । সিনেমায় নায়কেরা নায়িকাদের উদ্ধার করতে কত কিছু করে, তুমিও তোমার প্রেমিকাকে উদ্ধার করবা ।”
আমি বললাম, “সিনেমাতে তো নায়ক ছোটবেলা দৌড় শুরু করলেই বড় হয়ে যায়, এমনকি বাসর রাত্রের দৃশ্য দেখানোর পরের দৃশ্যেই স্ত্রী আইসা বলে ‘এই, একটা সুসংবাদ আছে ।’ সিনেমার সাথে বাস্তবের কি তুলনা হয় ? তুমিই বলো ?”
এবার জয়িতা কাঁদো কাঁদো গলায় বললো, “আমি কিচ্ছু জানিনা, তোমাকে এই সম্বন্ধ ভাঙ্গতেই হবে ।” বলেই খট করে ফোন রেখে দিল ।
আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম । কাজী নজরুল ইসলাম “লাথি মার ভাঙ্গরে তালা” গান লিখলেও, “লাথি মার ভাঙ্গরে সম্বন্ধ” টাইপ কোন গান লিখে যান নাই । লিখলে না হয় ওই গান অনুসারে কাজ করা যাইতো । কি করা যায় ভাবতে ভাবতে নাস্তা খেলাম, নাস্তা খেয়ে উঠার সাথেই সাথেই মাথায় একটা বুদ্ধি আসলো । আমি জয়িতাকে ফোন দিয়ে বললাম তার আব্বার মোবাইল নম্বরটা দিতে, জয়িতা দিল । আমি বললাম, “ছেলেপক্ষ যখন আসবে, আমাকে জানাইয়ো ।” ফোন রাখার আগে জয়িতা প্রশ্ন করলো, “তেঁতুল প্লিজ, একটা কিছু কর ।” আমার নাম মিতুল হলেও জয়িতা মাঝে মাঝেই আমাকে তেঁতুল বলে ডাকে; ভালোবাসার ডাক আর কি ।
আমি বললাম, “অবশ্যই করবো । সিনেমার নায়কেরা নায়িকাকে উদ্ধার করতে কতকিছুই তো করে ।” এই বলে ফোন রেখে দিলাম ।
এবার ফোন দিলাম আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু অনিকে । অনি হচ্ছে এমন এক বিরল প্রজাতির মানুষ যাকে কল করলেই মোবাইলে লেখা ভাসে “waiting”, তার আর মিথিলার ২ বছরের প্রেম এবং তারা প্রায় সারাদিনই ফোনে, নইলে স্কাইপে কথা বলে । কিন্তু আজ এক চান্সেই অনিকে পেলাম ।
বললাম, “কিরে দোস্ত, আজ যে ওয়েটিং পাইলাম না !”
অনি বললো, “মিথিলা গোসলে গেছে, তাই বিরতি ।”
আমার ভুল ভাঙ্গলো, আমি এতদিন ভাবতাম অনি আর মিথিলা বাথরুমেও মোবাইল নিয়ে যায় । যাই হোক, এবার অনিকে সব খুলে বললাম, আর কি কি করতে হবে তাও বুঝিয়ে দিয়ে ফোন রেখে দিলাম । বসে বসে জয়িতার ফোনের অপেক্ষা করছি । একসময় জয়িতা ফোন দিল, রিসিভ করতেই কান্না শুরু করলো । একটু পর কাঁদতে কাঁদতেই বললো “এই লোক বয়সে আমার ১৬ বছরের বড়, আমি কোনমতেই এই বিয়ে করতে পারবো না ।” জয়িতা যে তার বাবার মুখের উপর না বলতে পারবে না সেটাও আমি জানি, কারণ আঙ্কেল এমনি খুব ভালো মানুষ কিন্তু একটু একগুঁয়ে টাইপের । জয়িতা যদি গিয়ে বলে যে সে এই লোককে বিয়ে করতে পারবে না, তাহলে আঙ্কেল কারণ জানতে চাইবেন । আর জয়িতা যদি বয়সের যুক্তি দেখায়, তাহলে আঙ্কেল হেসেই উড়িয়ে দেবেন । আমি বললাম, “তোমাকে একটা ছোট্ট কাজ করতে হবে, হারুনুর রশীদকে যখন তোমার সাথে একা কথা বলতে দিবে তখন তুমি তার মোবাইল নাম্বার চাইবা, ভাব এমন দেখাইবা যে তুমি তারে বিয়া করার জন্য পাগল । তারপর সে যখন তোমার মোবাইল নম্বর চাইবে তখন তুমি তার মোবাইলটা নিবা, তারপর তোমার নাম্বার সেভ করবা আর একটা নাম্বার পাঠাইতেছি মেসেজ করে ওইটা ‘ময়নাপাখি’ নামে সেভ করে পর পর বেশ কয়েকবার মিসকল মারবা । মোবাইলটা তার হাতে দিয়ো না, যতক্ষণ তোমার বাবা না আসেন ।” এই বলে আমি ফোন রেখে দিলাম । জয়িতাকে মিথিলার নাম্বারটা পাঠিয়ে দিলাম । আমার কাজ শেষ, এবার যা করার মিথিলা আর অনি-ই করবে । জয়িতা হারুনুর রশীদের মোবাইলটা নিতে পারলেই হয়; পারবে বলেই আমার বিশ্বাস, ওর মত বুদ্ধিমতী মেয়ে কমই আছে ।
বিকাল ৪টা, জয়িতার ফোন এল । রিসিভ করতেই উচ্ছসিত কন্ঠে জয়িতা বললো, “যা মজা পেলাম না আজ । আমি আর হারুনুর রশীদ যখন গল্প করছিলাম তখন বাবা ঘরে এসেই হারুনের মোবাইল চাইলো, আমি দিলাম । নিয়েই ডায়াল নাম্বার চেক করে ‘ময়নাপাখি’কে ফোন দিল । তারপর একটু হু হা করে ফোন রেখেই হারুনুর রশীদের দিকে তাকিয়ে বললো ‘ময়নাপাখি তোমার জন্য বসে আছে, এক্ষুনি তার কাছে যাও ।’ হারুন অনেক বুঝাতে চাইলো, কিন্তু বাবা কোন কথা শুনতেই রাজি না । বললো ‘এই মুহুর্তে বেরিয়ে যাও । তোমার মত লম্পটের কাছে মেয়ে বিয়ে দেবার চেয়ে কোন গাধার কাছে মেয়ের বিয়ে দিব ।’ আমি বাবাকে শান্ত হতে বললে বাবা একটু শান্ত হল ।”
জয়িতার বাবা তার মেয়েকে গাধার সাথে বিয়ে দেবেন শুনে আমার মনে আশার সঞ্চার হল ।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তারপর কি হল ?”
জয়িতা বললো, “ছেলেপক্ষের সবাই মুখ ভোতা করে বের হয়ে গেছে, আমি আমার রুমে এসে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেলাম কতক্ষণ । এই বুদ্ধি নিশ্চয়ই তোমার, তাই না তেঁতুল ?”
আমি কিছু বললাম না, শুধু হাসলাম । হঠাৎ একটা কথা মনে পড়লো, জিজ্ঞেস করলাম, “ময়নাপাখির নাম্বারটা হারুন মিয়ার মোবাইল থেকে ডিলিট করছিলা ?”
জয়িতা হেসে উত্তর দিল, “বাবা হারুন মিয়ার সামনেই আমাকে জিজ্ঞেস করলো ‘তুই কি ওকে নাম্বার দিছিস ?’ আমি হ্যা বলতেই হারুনের মোবাইল আমাকে দিয়ে বললো আমার নাম্বার ডিলিট করতে, তখন আমারটার সাথে ময়নাপাখির নাম্বারও ডিলিট করে দিছি ।”
আমার মনটা আনন্দে ভরে উঠলো, আসলেই ওর মত বুদ্ধিমতী মেয়ে কমই আছে ।।
(রাত ৮টা, মা বাবা এখন আবার একসাথে সিরিয়াল দেখতেছে । মিল হয়ে গেছে মনে হয়, ভালোই হল । ধন্যবাদ জানানোর জন্য অনিকে ফোন দিতেই মোবাইলে ভেসে উঠলো waiting; থাক এখন, কাল তো দেখা হবেই । কাল আরো একটা কাজ আছে, জয়িতা দেখা করতে বলেছে…)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



