বেশ কয়েক বছর ধরেই মার্চ মাসের শেষদিকে ফেসবুকে ‘এপ্রিল ফুল বর্জন করুন’, ‘এপ্রিল ফুল মুসলমানদের এক নিদারুণ শোকের দিন’, ‘যারা এপ্রিল ফুল পালন করে তারা ইসলামের অবমাননা করে’ – এই ধরণের কিছু স্ট্যাটাস দেখা যায় । অতিধার্মিকেরা কেউ কেউ আবার নিজেদের অগাধ জ্ঞানের প্রয়োগ করে ‘ইতিহাস’ ঘেটে তুলে আনে ১লা এপ্রিল দিনটির ‘প্রকৃত’ ঘটনা । দেখে দেখে এখন চোখ ব্যথা হয়ে গেছে । বাধ্য হয়েই তাই ঘটনার একটু ভিতরে যাওয়ার লোভ সামলাতে পারলাম না ।
এখানে এপ্রিল ফুল বিষয়ে প্রশ্ন আসে মূলত দুইটা ।
১) কি হয়েছিল ১লা এপ্রিল ?
২) কেনই বা মুসলমানদেরকে এটা পালন না করার আহবান জানানো হয় ?
প্রথমে ২ নাম্বার প্রশ্নটা নিয়েই কথা বলা যাক । এই প্রশ্নটির উত্তরে দুই ধরনের জবাব পাওয়া যায় ।
১) ১লা এপ্রিল খ্রীস্টানেরা মুসলমানদেরকে ‘কোন এক’ যুদ্ধে পরাজিত করে এবং অনেক মুসলমানকে আগুনে পুড়িয়ে মারে ।
২) খ্রীস্টানেরা তামাকজাত নেশা এবং মাদকের সাথে মুসলমানদের পরিচয় ঘটায় যা পরবর্তীতে তাদেরকে শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয় যা তাদের পতনের অন্যতম মূল কারণ ।
১নাম্বার উত্তরটিই বেশি প্রচলিত । এর একটা কারণ হয়তো এই উত্তরের মাঝে যুদ্ধ তথা শত্রুতার একটা ব্যাপার আছে । কিন্তু আসলেই কি খুব বড় কোন যুদ্ধ হয়েছিল ? আসলেই কি ১লা এপ্রিল খ্রীস্টানেরা মুসলমানদেরকে যুদ্ধে পরাজিত করে আগুনে পুড়িয়ে মেরেছিল ? উত্তরঃ না ।
স্পেনের শেষ মুসলিম সাম্রাজ্য গ্রানাডা (আলমেইরা ও মালাগা-ও এর অংশ ছিল) মুসলিমদের হাতছাড়া হয় ১৪৯২ সালের ২রা জানুয়ারী, ১লা এপ্রিল নয় ।
উইকিপিডিয়া অনুসারে, “On January 2, 1492, the last Muslim leader, Muhammad XII, known as Boabdil (Arabic: Abu Abdullah) to the Spanish, surrendered complete control of Granada, to Ferdinand and Isabella, Los Reyes Catlicos, (The Catholic Monarchs - the title given to the couple by Pope Alexander VI), after the city was besieged”
অর্থাৎ, ১৪৯২ সালের ২রা জানুয়ারী গ্রানাডার শেষ মুসলিম সম্রাট ৭ম মুহাম্মদ যে কিনা বোয়াবদিল নামে পরিচিত, (আরবী নাম আবু আব্দুল্লাহ) স্পেনিশ ক্যাথলিক সম্রাট ফার্দিনান্দ এবং ইসাবেলার কাছে সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করেন ।
M B Synge নামের এক ঐতিহাসিক তার “Brave Men and Brave Deeds” প্রবন্ধে লিখেন, “December had nearly passed away. The famine became extreme, and Boabdil determined to surrender the city on the second of January,”
বঙ্গানুবাদ করলে দাঁড়ায়, “ডিসেম্বর প্রায় শেষের পথে । খাদ্যের সংকট চরম আকার ধারণ করেছিল । বোয়াবদিল ২রা জানুয়ারী আত্মসমর্পণ করার মনস্থির করেন ।”
মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ নামক আরেকজন তার “Rejoinder to Columbus and America” প্রবন্ধে লিখেন, “Regarding the fall of Granada, it is true that in early 1492 (possibly end of January) Isabella and Ferdinand's army captured it but it was not completely conquered. ... Several small pockets around Granada were still unconquered, and insurgency erupted which was totally demolished in October 1492. ... At that time Isabella and Ferdinand began to sleep in peace”
এরকম আরো অনেক তথ্যপ্রমাণ হাজির করা যায়, যা থেকে সহজেই বুঝা যায় যে স্পেনে মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে ১৪৯২ সালের ২রা জানুয়ারী, ১লা এপ্রিলের আরো প্রায় তিন মাস আগে । আর আত্মসমর্পণও হয়েছিল শান্তিপূর্ণভাবে । গ্রানাডার আত্মসমর্পণ এবং বোয়াবদিলের গ্রানাডা ত্যাগের ঘটনার আরো বিস্তারিত পাবেন Click This Link লিঙ্কে ।
মুসলিমদেরকে ঘরে আটকে রাখা, আগুনে পুড়িয়ে মারা ইত্যাদি কথাবার্তাগুলো খুব সম্ভবত মিথ্যাচারে একটু উন্নত মসলা হিসেবে কাজ করে, তাই এইগুলাই ঘুরে ফিরে শোনা যায় সবচেয়ে বেশিবার । অশিক্ষিতদের কথা বাদ দিলাম, অনেক সচেতন এবং শিক্ষিত মুসলিমও তাদের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই পরাজয়ের তারিখটি জানে না! অথচ ফেসবুকে ইসলামের দেখভাল করার দায়িত্বটি তারা নিজেদের কাঁধে কত সুন্দরভাবেই না তুলে নিয়েছে!!
এবার আসি তুলনামূলকভাবে কম প্রচলিত ২য় উত্তরটিতে । “খ্রীস্টানেরা তামাকজাত নেশা এবং মাদকের সাথে মুসলমানদের পরিচয় ঘটায় যা পরবর্তীতে তাদেরকে শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয় ।”
প্রথমেই বলে রাখা প্রয়োজন যে, মাদকের খারাপ দিকগুলো আল-কোরানে অত্যন্ত সুন্দরভাবে বর্ণিত আছে এবং হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) ১৪০০ বছর আগে নিজেও বলে গেছেন মাদকের ভয়াবহতার কথা । তাই আজ থেকে ৫২০ বছর আগে, অর্থাৎ ১৪৯২ সালে মুসলিমেরা মাদক কি জিনিস তা জানতো না এই কথাটা একটু হাস্যকর শোনাবে । আর তামাকজাত নেশা অর্থাৎ সিগারেটও তখন আবিষ্কার হয়নাই, তাই এটার সাথে মুসলিমদের পরিচয় ঘটানোও সেইসময় সম্ভব ছিল না । ১৪৯৩ সালে আমেরিকার আবিস্কারক কলম্বাস দক্ষিণ আমেরিকায় প্রথম তামাক গাছের সন্ধান পান, অর্থাৎ তামাক আবিস্কারেরই আরো প্রায় ১ বছর আগে গ্রানাডায় মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে । ঐতিহাসিকদের মতে, ১৯শতকের আগে সিগারেটের প্রচলন ইউরোপে খুব বেশি ছিল না । শুধুমাত্র অভিজাত লোকেরাই সিগারেট খেতো । সিগারেটের বাণিজ্যিক উৎপাদন মূলত শুরু হয় ১৮৮০ সালের দিকে, স্পেনে মুসলিমদের পরাজয়ের প্রায় ৪০০ বছর পর ।
এবার আসা যাক প্রথম প্রশ্নে । কি হয়েছিল ১লা এপ্রিল ? ‘এপ্রিল ফুল’ ধারণাটির সাথে মুসলিমদেরকে বোকা বানিয়ে একটি ঘরে ঢুকিয়ে পুড়িয়ে মারার কোন সম্পর্কই নেই । সম্পর্ক আছে নতুন বছর পালনের অনুষ্ঠানের । অতীত রোমান সাম্রাজ্যে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বছর শুরু হতো ১লা এপ্রিল । ২৫মার্চ থেকে শুরু হয়ে নতুন বছর বরণ করার উৎসব চলতো সাতদিনব্যাপী । ঠিক যেমন বর্তমান ইউরোপে নতুন বছর বরণ করার উৎসব শুরু হয় ২৫ডিসেম্বর বড়দিন(যিশুখ্রীষ্টের জন্মদিন) থেকে এবং শেষ হয় ১লা জানুয়ারী । ১৫৭০ সালের প্রথমভাগে ফ্রান্সের রাজা ৪র্থ চার্লস সর্বপ্রথম গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার (আমরা এখন যে ক্যলেন্ডার ব্যবহার করি) ব্যবহারের নিয়ম চালু করেন । তিনি এই মর্মে তার রাজ্যে একটি আদেশ জারি করেন । তখন তো আর এইযুগের মত যোগাযোগ-ব্যবস্থা বা প্রযুক্তি ছিল না । চিঠিপত্রের বাহকেরা যাতায়াত করতো পায়ে হেটে । তাই কোন একটি চিঠি বা আদেশ পৌছুতে কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় নিতো । এরপর থেকে ১লা জানুয়ারীই নতুন বছর পালন শুরু হয় । কিন্তু এরমধ্যে কিছু মানুষ আবার সম্রাটের এই নতুন ক্যালেন্ডার ব্যবহার করার আদেশ প্রত্যাখান করে । তারা আগের মতোই ১লা এপ্রিল নতুন বছর পালন করতো । তবে তারা সংখ্যায় খুব বেশি ছিল না । যারা ১লা জানুয়ারী নতুন বছর পালন করা শুরু করে, তারা তখন এই ১লা এপ্রিল নতুন বছর পালন করা মানুষদেরকে বোকা বলতো । এপ্রিল মাসের বোকা, ইংরেজীতে April Fool. বলে রাখা দরকার যে, এখনো ইউরোপের অনেক গোঁড়া খ্রীষ্টানেরা বর্তমান গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে না । তারা নিজেদের বিভিন্ন অনুষ্ঠান যেমন বড়দিন, ইস্টার সানডে ইত্যাদি পালন করে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ।
এগুলোই হল এপ্রিল ফুল বিষয়ক কিছু সহজ এবং সত্য কথা । ভ্রান্ত কোন কিছু শুনেই তা নিয়ে নাচানাচি করা আর চিলে কান নিয়ে গেছে শুনে চিলের পিছনে ছোটা একই জিনিস । এপ্রিল ফুল শুধুই মজা করার জন্য পালন করা হয় সারাবিশ্বে । তবে অন্যের ক্ষতির কারণ হতে পারে এইরকম কোন মজা করা ঠিক না । আর না জেনে, না বুঝে এপ্রিল ফুলের সাথে ধর্মকে গুলিয়ে ফেলাটাও বুদ্ধিমানের কাজ না । এতে শুধু বিভ্রান্তিই সৃষ্টি হয়, আর কিছু না । অবশ্য যারা ধর্মকে সামনে রেখে নানারকম আকাশ-কুসুম গল্প তৈরী করে তাদের মূল উদ্দেশ্যই বিভ্রান্তি ছড়ানো এবং ধর্মে ধর্মে বিভেদ সৃষ্টি করা । তারা কারা সেইটা বুঝতেও খুব বেশি বুদ্ধি খরচ করতে হয় না । অমি রহমান পিয়াল ভাইয়ের একটা স্ট্যাটাসই অনেক কিছু বলে দিতে সক্ষম “স্কুলে থাকতে বেশ মজার খেলা ছিলো এপ্রিল ফুল। কিভাবে কারে বোকা বানানো যায় ফার্স্ট পিরিয়ডের আগেই (এপ্রিল ফুলের সময়সীমা নাকি দুপুর ১২টা) এ নিয়ে মার্চ থেকেই প্ল্যানিং। এখন ছাগু তরফে শুনি এদিন নাকি কোথায় মুসলমানদের ম্যাসাকার করা হইছিলো ভুলায়া ভালায়া। মনে পড়লো একাত্তরে ইফতারির দাওয়াত দিয়া নিয়া গিয়াও বুদ্ধিজীবিদের হত্যা করা হইছে (ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় অল্প ক'জন সৌভাগ্যবানের একজন আমার বাবা), ১৪ ডিসেম্বর গভর্নর হাউজে দেশের তাবৎ সরকারী কর্মকর্তাদের দাওয়াত ছিলো, তাদের অপেক্ষায় ছিলো মেশিনগান যা মিত্রবাহিনীর বিমান হামলায় ধুলিস্যাত হয়ে যায়, মুজিবনগরে শপথ অনুষ্ঠানে কোরআন তেলওয়াত করছিলো বইলা ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র বাকের আলীরে লাল পিপড়ার ঢিবিতে বেধে রাখা হইছিলো, সীমান্ত পার করে দিবে বলে সহায় সম্পদ কেড়ে নিয়ে পাকিদের গুলির মুখে তুলে দেওয়া হইছিলো। শঠতা মুসলমানরাও জানে সেটা দেখাইছিলো কিছু এদেশীয় জারজ, আর আজ ওরাই এপ্রিল ফুলের জুজু দেখায়! ওরাই, যারা জাতির জনকের সপরিবার হত্যাকাণ্ডের দিন বিশাল কেক কেটে উৎসব করে নকল জন্মদিনের উছিলায়। শঠতা কারে বলে!”

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



