বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সংস্কার বিতর্ক এখন কেবল দলীয় মতভেদের বিষয় নয়; বরং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)–এর অবস্থান ঘিরে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা সাধারণ নাগরিকের মধ্যেও নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে—রাষ্ট্র আগে, নাকি দল?
জুলাই সনদ ও প্রস্তাবিত সংস্কারসমূহের মূল দর্শন হচ্ছে ক্ষমতার একক কেন্দ্রীকরণ ভেঙে প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। দীর্ঘদিন ধরে দেখা গেছে, গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে দলীয় প্রভাব প্রবল হলে জবাবদিহিতা দুর্বল হয়ে পড়ে। দুর্নীতি দমন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা কিংবা আর্থিক নিয়ন্ত্রণ—সব ক্ষেত্রেই তখন জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই বাস্তবতা থেকেই স্বাধীন নির্বাচন প্রক্রিয়া, বহুপক্ষীয় অংশগ্রহণ এবং সাংবিধানিক সুরক্ষার মতো ধারণা সামনে এসেছে।
উদাহরণ হিসেবে দুর্নীতি দমন কমিশনের নিয়োগপ্রক্রিয়ার প্রস্তাবটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। যদি নিয়োগে বিরোধী দল, বিচার বিভাগ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয় এবং সেই কাঠামো সংবিধানে সুরক্ষিত থাকে, তবে কোনো সরকারই সহজে দলীয় অনুগত ব্যক্তিকে বসিয়ে তদন্ত প্রক্রিয়া প্রভাবিত করতে পারবে না। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না কোনো নির্দিষ্ট দল; বরং শক্তিশালী হবে রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ব্যবস্থা এবং জনগণের অধিকার।
এখানেই রাজনৈতিক আপত্তির প্রকৃতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আপত্তি থাকা স্বাভাবিক—গণতন্ত্রে মতভেদই আলোচনার প্রাণ। কিন্তু যদি আপত্তির কেন্দ্রবিন্দু হয় ক্ষমতার ভারসাম্য রোধ করা, তবে প্রশ্ন উঠবেই: এই বিরোধ কি নীতিগত, নাকি কৌশলগত? সংস্কার বাস্তবায়িত হলে কোনো দলের একক কর্তৃত্ব কমতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হলে শেষ পর্যন্ত লাভবান হয় পুরো দেশ।
জনগণের সচেতন অংশ তাই এখন আরও গভীর আলোচনার আহ্বান জানাচ্ছে—আবেগ নয়, যুক্তি দিয়ে; দলীয় আনুগত্য নয়, রাষ্ট্রীয় স্বার্থের আলোকে। কারণ ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ছাড়া টেকসই গণতন্ত্র সম্ভব নয়। আর গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি তখনই তৈরি হয়, যখন রাজনৈতিক দলগুলোও নিজেদের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেয়।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




