somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মা : এক মায়াবী বারাকাহর নাম

১২ ই মে, ২০২৬ সকাল ৯:৫৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মা নিয়ে যত কথা বলা হয়, ততই মনে হয়—আরও কিছু বলা বাকি রয়ে গেল। পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর, সবচেয়ে নির্ভরতার, সবচেয়ে অলৌকিক শব্দটির নাম “মা”। এই একটি শব্দের ভেতর লুকিয়ে থাকে আশ্রয়, নিরাপত্তা, বারাকাহ, মায়া, ত্যাগ, দোয়া আর এক অদ্ভুত নীরব জাদু। মা শুধু একজন মানুষ নন; মা যেন আল্লাহর পক্ষ থেকে পৃথিবীতে পাঠানো এক রহমতের ছায়া, এক নীরব ফেরেশতা, যিনি সংসারের অন্ধকারে চুপচাপ আলো জ্বালিয়ে রাখেন।

ছোটবেলায় মা-ই ছিল আমাদের একমাত্র সুপারহিরো। তখন পৃথিবী এত জটিল ছিল না। সব সমস্যার সমাধান ছিল শুধু একটি মানুষের কাছে—মা। জ্বর হলে মা, ভয় পেলে মা, ক্ষুধা লাগলে মা, মন খারাপ হলে মা। মনে হত, মা থাকলে কোনো বিপদ সত্যিই বড় কিছু নয়। মা যেন সব পারেন। সেই বয়সে বাবার কষ্ট, সংসারের অভাব, টানাপোড়েন—এসবের গভীরতা বুঝতাম না। শুধু বুঝতাম, মা আছেন, তাই সব ঠিক আছে।

আজ পেছনে তাকালে ছোটবেলার সেই অভাবের সংসারটা যেন কুয়াশার ভেতর থেকে ভেসে ওঠে। কি আশ্চর্য নিরস জীবন ছিল! অথচ সেই জীবনে অভিযোগ ছিল না, অশান্তি ছিল না, না পাওয়ার হাহাকারও ছিল না। কারণ, মা ছিলেন। মা তাঁর অদৃশ্য বারাকাহ দিয়ে সবকিছু এমনভাবে সামলে রাখতেন যে অভাব কখনো অভাব মনে হত না।

তখনকার গ্রাম্য জীবন ছিল একেবারেই আলাদা। ফ্রিজভর্তি মাছ-মাংস ছিল না, সুপারশপের চাকচিক্য ছিল না, প্রতিদিনের বিলাসী খাবারের আয়োজনও ছিল না। ভাল খাবার মানে ছিল—কোনো মেহমান আসলে বাড়িতে একটা মুরগি জবাই হওয়া। সেই মুরগির ঝোল, একটা ঠ্যাং কিংবা একটু বেশি মাংস পাওয়া যেন ঈদের আনন্দের মতো ছিল। বছরের বাকি সময়টাতে সংসার চলত বাবার চাষ করা মৌসুমি সবজি আর মায়ের আশ্চর্য হাতের রান্নায়।



ঝিঙ্গের মৌসুমে প্রতিদিন ঝিঙ্গে। পুঁইশাক উঠলে প্রতিদিন পুঁই। কিন্তু সেই একই সবজি প্রতিদিনও একঘেয়ে লাগত না। কারণ মা একই জিনিস দিয়ে কত শত স্বাদের জাদু তৈরি করতেন! একটা পুঁইয়ের লতা থেকেই যেন পুরো সংসারের রিজিক নেমে আসত। মা যত্ন করে পুঁইয়ের বীজ বুনতেন। ছোট্ট লতাটা লিকলিক করে বড় হত। মা সেটাকে মাচায় তুলে দিতেন। ধীরে ধীরে পুরো মাচা ভরে যেত সবুজ পাতার ঘন ছায়ায়। তারপর শুরু হত মায়ের রান্নাঘরের জাদু—পুঁই চিংড়ি, পুঁই বড়া, ডালের সঙ্গে পুঁই, পুঁই ভর্তা—কত কি!

মাঝে মাঝে মনে হত, আমাদের শরীর থেকেও যেন পুঁইশাকের গন্ধ বের হয়। অথচ তবুও কোনো বিরক্তি ছিল না। এখন বুঝি, ওটা ছিল মায়ের হাতের বারাকাহ। আল্লাহ মায়েদের হাতে এক অদ্ভুত রহমত দিয়ে দেন—অল্প জিনিসকেও পর্যাপ্ত করে তোলার রহমত।

একবার মা লাউ গাছ লাগিয়েছিলেন। সেই লাউগাছ যেন ছিল মায়ের আরেক সন্তান। কত যত্ন! কত আদর! লাউয়ের ডগাগুলো বেয়াড়ার মতো দ্রুত মাচায় উঠে যেত। মা প্রতিদিন পানি দিতেন, মাটি নিড়াতেন, পাতায় হাত বুলিয়ে দিতেন। তারপর একদিন দেখা যেত, মাচার নিচে ঝুলছে নাদুস-নুদুস সব লাউ। কি অপার্থিব আনন্দ ছিল মায়ের চোখে!

সেই লাউ দিয়ে মা রান্না করতেন লাউ-শোল, লাউ-ইলিশ, লাউ-চিংড়ি। আর যেদিন মাছ থাকত না, সেদিন লাউ দিয়ে ডাল। তবুও খাওয়ার টেবিলে কোনো অপূর্ণতা থাকত না। মনে হত, এটাই পৃথিবীর সেরা খাবার। আজ হাজার রেস্টুরেন্টের খাবারেও সেই স্বাদ পাওয়া যায় না। কারণ সেই স্বাদের ভেতরে ছিল মায়ের মমতা, কষ্ট, দোয়া আর নীরব ত্যাগের সুবাস।

সংসারে যখন টাকার টান পড়ত, মা চুপচাপ বিষণ্ণ মুখে একটা লাউ কেটে দিতেন। বাবা খুব সংকোচ নিয়ে সেটি বাজারে বিক্রি করতে যেতেন। যেতে যেতে রংচটা শার্টের হাতায় চোখ মুছতেন। মা আঁচলে মুখ ঢেকে চুপ করে বসে থাকতেন। বুকের ব্যথা বাড়লে লাউগাছের পাশে পিঁড়ি পেতে বসতেন। বড় আপা মাথায় তেল দিত, আমি পা টিপে দিতাম। মা তখনও হাসতেন। এক মলিন, ক্লান্ত, অথচ আশ্চর্য প্রশান্তির হাসি।

মা কখনো সংসারের অভাবকে প্রকাশ্যে আনেননি। তখনকার মানুষদের জীবনে এক ধরনের আভিজাত্য ছিল—অভাব থাকলেও তা প্রকাশ করার রীতি ছিল না। পাশের ঘরের মানুষও বুঝতে পারত না, কারও ঘরে উপোস চলছে। আর সেই গোপন অভাবকে মা তাঁর জাদুকরী হাতে ঢেকে রাখতেন।

একদিন লাউ, আরেকদিন পেঁপে, আরেকদিন কাকরোল ভাজি, কখনো পুঁইশাকের চচ্চড়ি—এইভাবেই সংসার চলত। অথচ মনে হত না কিছু কম আছে। কারণ মা ছিলেন সংসারের অলৌকিক কেন্দ্রবিন্দু। মা যেন এক রহস্যময় বারাকাহর উৎস, যার কাছে অভাব খুবই তুচ্ছ।

আজ আমরা বড় হয়েছি। নিজেরাও বাবা-মা হয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ, এখন ঘরে অভাব নেই। ফ্রিজে মাছ-মাংস থাকে, বাজারে সবকিছুর প্রাচুর্য আছে। কিন্তু সেই পুঁইশাকের গন্ধমাখা দিনগুলো কোথায় হারিয়ে গেল? সেই লাউয়ের ডালের স্বাদ কেন আর ফিরে আসে না? কারণ আজ বুঝি—স্বাদটা রান্নার ছিল না, স্বাদটা ছিল মায়ের হাতের।

মা জীবনের শেষ দিকে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তখন চেষ্টা করেছি, চিকিৎসার যেন কোনো অভাব না হয়। ওষুধ, চিকিৎসা, হাসপাতাল—সবকিছু somehow হয়ে যেত। আজ মা নেই বহু বছর। মাঝে মাঝে হিসাব মেলাতে বসে মনে হয়—মায়ের চিকিৎসার পেছনে যে বিশাল খরচ হত, সেটা কিভাবে সামলাতাম? এখন তো সেই খরচ নেই, কিন্তু সেই অদ্ভুত স্বস্তিও নেই। তখন বুঝতে পারি—ওটা ছিল মায়ের রিজিক, মায়ের বারাকাহ।

মা চলে যাওয়ার পর মানুষ সবচেয়ে বেশি যে কষ্টটা পায়, সেটা হলো—অনুশোচনা। মনে হয়, “আহা! মা থাকলে আরও কত কিছু করতাম!” অথচ সত্যিটা বড় নির্মম—মা থাকতে আমরা সেইভাবে কিছুই করি না। মায়ের ভালোবাসাকে আমরা খুব সহজলভ্য ভেবে নিই। তাঁর কষ্টকে স্বাভাবিক ভাবি। তাঁর দোয়াকে অভ্যাস মনে করি।

কিন্তু মা চলে গেলে পৃথিবীর আকাশটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে যায়। তখন বুঝি, মাথার ওপর থেকে একটা অদৃশ্য ছায়া সরে গেছে। তখন সংসারে সবকিছু থাকলেও কোথাও যেন বারাকাহ কমে যায়।

মায়েরা আসলেই দুঃখিনী হয়। নিজের কষ্ট গোপন রেখে সন্তানের প্লেটে শেষ টুকরো মাছটা তুলে দেন। নিজের নতুন কাপড়ের শখ চাপা দিয়ে সন্তানের বই কিনে দেন। নিজের ওষুধ বাদ দিয়ে সন্তানের জন্য দোয়া করেন। অথচ বিনিময়ে খুব বেশি কিছু চান না। শুধু চান—সন্তানটা একটু কাছে বসুক, একটু কথা বলুক, একটু সম্মান করুক।

তাই যাদের মা এখনও বেঁচে আছেন, দেরি করবেন না। মায়ের পাশে বসুন। তাঁর গল্প শুনুন। তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে দিন। তাঁর জন্য সময় বের করুন। কারণ পৃথিবীতে মা’র বিকল্প কিছু নেই। আর যাদের মা নেই, তারা শুধু দোয়া করতে পারেন—

“রব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানি সাগিরা।”

হে আল্লাহ! আমাদের মায়েদের প্রতি রহম করুন, যেভাবে তারা শৈশবে আমাদের ভালোবাসা, মায়া আর অগণিত ত্যাগ দিয়ে লালন-পালন করেছিলেন।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই মে, ২০২৬ সকাল ৯:৫৬
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমির+ওলামা বাদ দিয়ে কোরআন+হাদিস মানলে পার্থিব জীবনে হীনতা এবং কিয়ামতে কঠিন শাস্তি পেতে হবে

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২৯ শে মে, ২০২৬ সকাল ১১:৫৯



সূরাঃ ২, বাকারা। ৮৪ নং ও ৮৫ নং আয়াতের অনুবাদ-
৮৪। (হে ইহুদী সম্প্রদায়) আমি যখন ওয়াদা নিয়েছিলাম যে, পরস্পর রক্তপাত করবে না এবং স্বীয় বাসস্থান থেকে আপন ব্যক্তিদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জুলাই ভুলে গেছে সবাই, শুধু জুলাই ভোলেনি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৯ শে মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৮


জুলাই কোটা আন্দোলনের প্রায় দুই বছর পূর্ণ হতে চলেছে। গত দুই বছরে দেশে অনেক কিছু বদলেছে। সমাজের অনেক কুৎসিত দিক নতুন করে সামনে এসেছে। অনেক মানুষকে নতুন করে চেনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজ ঈদের দ্বিতীয় দিন

লিখেছেন সামিয়া, ২৯ শে মে, ২০২৬ রাত ৯:৩৬



হঠাৎ বৃষ্টি নামছে। ঈদের দ্বিতীয় দিন আজ।
আমি শ্বশুরবাড়ির বারান্দায় বসে আছি এক মগ কফি হাতে নিয়ে সামনে ভেজা আকাশ। বাতাসে কেমন কাঁচা মাটির গন্ধ। এই গন্ধটা অদ্ভুতভাবে মানুষকে অতীতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

এ ডিসেকশন অব এ স্করপিয়ন

লিখেছেন আদম_, ২৯ শে মে, ২০২৬ রাত ১০:৪২



একজন বৃ্শ্চিক জাতক গান ভালোবাসে- গান সব রাশির জাতকরাই ভালোবাসে, তবে বৃশ্চিকের চয়েসটা ভিন্ন। বৃশ্চিক ভালোবাসে কোয়ালিটি, জেনুইনটি, অথেনটিসিটি। আউল-ফাউল জিনিস বৃশ্চিককে গেলানো যাবেনা- বৃশ্চিক গলার্ধকরণ করেনা খেলোয়ার জাহান... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফামস স্ট্যাচু অফ দ্যা টাউন মিউজিসিয়ান অফ ব্রেমেন

লিখেছেন রোকসানা লেইস, ৩০ শে মে, ২০২৬ রাত ১:৫৬



দুই বছর আগে গিয়েছিলাম, জার্মানির ব্রেমেন শহরে। সেখানে গিয়ে দেখা হয়েছিল ছোটবেলায় গল্পে শোনা চরিত্র গুলোর সাথে। গল্পের সেই চরিত্রগুলোকে কেউ সাজিয়ে রেখেছে এভাবে এই শহরে, যাওয়ার আগে জানা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×