somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দেয়ালের রং, রাজনীতির ভয়

১৮ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৫:০৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




একটা ফ্লাইওভারের পিলারে কিছু তরুণ-তরুণী গ্রাফিতি আঁকতে চেয়েছিল। ঘটনাটা শুনতে খুব সাধারণ। পৃথিবীর বহু শহরে দেয়াল, ব্রিজ, আন্ডারপাস—সবই মানুষের অনুভূতি প্রকাশের ক্যানভাস হয়ে ওঠে। কোথাও প্রতিবাদ, কোথাও স্মৃতি, কোথাও স্বপ্ন। কিন্তু আমাদের দেশে সেই রং-তুলির ঘটনাই হঠাৎ রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নিল। প্রশ্ন উঠল—কেন?
“জুলাই গ্রাফিতি” নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটার মূল জায়গা আসলে শুধু ছবি আঁকা নয়; বরং স্মৃতি ও প্রতীকের নিয়ন্ত্রণ। রাজনীতিতে প্রতীক খুব শক্তিশালী জিনিস। একটি দেয়ালচিত্র কখনও কখনও একটি বক্তৃতার চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলে। কারণ দেয়ালের ভাষা সরাসরি মানুষের চোখে পড়ে, মানুষের মনে ঢুকে যায়।
যারা গ্রাফিতি আঁকতে চেয়েছে, তাদের কাছে এটি হয়তো একটি সময়, একটি আন্দোলন বা একটি প্রজন্মের অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই এমন প্রকাশকে “নিরপেক্ষ শিল্প” হিসেবে দেখে না। তারা মনে করে, যে দেয়ালে একটি প্রতীক উঠছে, সেটি হয়তো ভবিষ্যতের জনমতও তৈরি করছে। এখানেই শুরু হয় ভয়।
বিএনপির আপত্তির জায়গাটা সম্ভবত এখানেই—তারা হয়তো মনে করেছে, এই গ্রাফিতির পেছনে রাজনৈতিক বার্তা আছে, অথবা এটি তাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে ব্যঙ্গ বা আক্রমণ করতে পারে। আমাদের রাজনীতিতে দুর্ভাগ্যজনকভাবে সমালোচনা আর শত্রুতাকে অনেক সময় এক করে দেখা হয়। ফলে একটি ছবি, একটি স্লোগান, এমনকি একটি রঙও দলীয় পরিচয়ের অংশ হয়ে যায়।
কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—একটি গ্রাফিতি ঠেকাতে ১৪৪ ধারা কেন?
এখানেই নতুন প্রজন্মের আপত্তি সবচেয়ে বেশি।
এই প্রজন্ম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বড় হয়েছে। তারা প্রশ্ন করতে শেখেছে। তারা জানে, মত প্রকাশ দমন করে চিন্তা থামানো যায় না। বরং দমন যত বাড়ে, প্রতিরোধও তত দৃশ্যমান হয়। তাই কয়েকজন তরুণ দেয়ালে ছবি আঁকতে গেলে সেখানে পুলিশি বাধা, নারীদের সঙ্গে ধস্তাধস্তি বা প্রশাসনিক কড়াকড়ি—এসব অনেকের কাছেই অস্বস্তিকর মনে হয়।
কারণ মানুষ এখন আর শুধু “কি হলো” দেখে না, “কেন হলো” সেটাও বিচার করে।
ইতিহাস বলছে, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ কখনও দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতি নিশ্চিত করতে পারেনি। দেয়াল মুছে ফেলা যায়, কিন্তু মানুষের ভেতরের প্রশ্ন মুছে ফেলা যায় না। বরং যে রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক শক্তি শিল্প, ব্যঙ্গ কিংবা ভিন্নমতকে সহ্য করতে পারে না, মানুষ ধীরে ধীরে তাদের আত্মবিশ্বাস নিয়েই প্রশ্ন তোলে।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো—আমাদের রাজনীতি এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে একটি ফ্লাইওভারের পিলারও নিরপেক্ষ থাকতে পারে না। সেখানে আঁকা একটি ছবি নিয়েও দলীয় পরিচয়ের চশমা পরে বিচার হয়। কেউ ভাবে এটি প্রতিবাদ, কেউ ভাবে অপমান, কেউ ভাবে ষড়যন্ত্র।
কিন্তু শিল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—এটি প্রশ্ন তোলে। আর প্রশ্নকে ভয় পেলে সমাজ কখনও পরিণত হয় না।
হয়তো সময় এসেছে দেয়ালকে শুধু দেয়াল হিসেবে দেখার। প্রতিটি রঙকে রাজনৈতিক যুদ্ধ হিসেবে না দেখে, কখনও কখনও মানুষের অভিব্যক্তি হিসেবেও দেখার। কারণ গণতন্ত্রের সৌন্দর্য শুধু নির্বাচনে নয়; মানুষের কথা বলার অধিকারেও।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৫:০৭
৪টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রুশদেশের চিরায়ত শিশুসাহিত্য

লিখেছেন জ্যোতির্ময় ধর, ১৮ ই মে, ২০২৬ রাত ৩:১৭


ঊনবিংশ শতাব্দীর মহান লেখক চেখভ , তুর্গেনেভ , দস্তয়েভ্‌স্কি , তলস্তয়ের নাম বিশ্ববাসীর কাছে সুপরিচিত। এই লেখকেরা - রাশিয়ার জাতীয় গৌরব । ঊনবিংশ শতাব্দীর রুশ লেখকদের মধ্যে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভবিষ্যতের স্পষ্ট বার্তা

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১৮ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:১৭



কারিনা ইস্যুতে যা ঘটেছে, তা শুধু একটি পরিবারের আত্মপক্ষ সমর্থন না- এটা জনমতের একটি স্পষ্ট প্রতিফলন। যদি শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেই হেটস্পিচ আসতো, তাহলে কারিনার মা জানাজার পর... ...বাকিটুকু পড়ুন

রক্তের দাগে ধুয়ে যাওয়া আভিজাত্য: কারিনা কায়সারের বিদায় এবং আমাদের কিছু নির্মম শিক্ষা

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১৮ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৯



​বাঙালি সংস্কৃতির চিরায়ত নিয়মে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষ সব বৈরিতা ভুলে যায়। জানাজার খাটিয়া সামনে রেখে স্বজনরা কেবল ক্ষমা চান, চিরবিদায়ের প্রার্থনা করেন। কিন্তু গতকাল আমরা এক অভূতপূর্ব ও হাহাকারে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ড. ইউনুস শুধুমাত্র বাই বর্ন বাংলাদেশী!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ১৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১০


আমেরিকার সাথে চুক্তির কথাটি আসলেই ইউনুসের উপদেষ্টাসহ তার লোকজন বলে বিএনপি ও জামাতের সাথে আলোচনা করেই চুক্তিটি হয়েছে!
বিএনপি ও জামায়েতের সাথে আলোচনা করলেই কি এই চুক্তি সঠিক হয়ে যায়?

আপনাদের বিএনপি-... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিজেকে জানুন, নিজেকে গড়ুন

লিখেছেন মোঃ ফরিদুল ইসলাম, ১৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৭

"নিজেকে জানুন, নিজেকে গড়ুন — নীরবতা হোক আপনার শক্তির সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র।"
সব সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব আপনার একার না। আপনি যদি বারবার বোঝান, কিন্তু কেউ বুঝতে না চায় — তাহলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×