somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিচার যখন দ্রুত, রাষ্ট্র তখন দৃশ্যমান

২৪ শে মে, ২০২৬ বিকাল ৫:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা নিয়ে মানুষের দীর্ঘদিনের অভিযোগ—মামলা হয়, বিচার শুরু হয়, কিন্তু রায় আসতে আসতে বছর পেরিয়ে যায়। সাক্ষী হারিয়ে যায়, ভুক্তভোগী ক্লান্ত হয়ে পড়ে, আর অপরাধী অনেক সময় আইনের ফাঁক গলে সমাজে ফিরে আসে। এই বাস্তবতার মধ্যেই মেহেরপুরের একটি রায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

৯ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের ঘটনায় মেহেরপুর শিশু সহিংসতা দমন আদালত অভিযুক্ত শাকিল হোসেনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, আদালত তিন লাখ টাকা জরিমানাও করেছেন এবং সেই অর্থ ভিকটিম পরিবারের কাছে পৌঁছে দিতে দণ্ডিতের সম্পত্তি নিলামে বিক্রির নির্দেশ দিয়েছেন।

কিন্তু এই রায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক শুধু শাস্তি নয়—বিচারের গতি। মাত্র ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে স্বশরীরে ও ভার্চুয়াল ভিডিও কলে সাক্ষ্য ও জেরা সম্পন্ন করে আদালত রায় দিয়েছেন। বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে এটি একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ।

এখানেই মূল প্রশ্নটি আসে—যদি ইচ্ছা থাকে, তবে কি দ্রুত বিচার সম্ভব?

বছরের পর বছর ধরে আমাদের দেশে ধর্ষণ, নারী নির্যাতন কিংবা শিশু নির্যাতনের মামলাগুলোতে বিচার বিলম্ব একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক পরিবার মামলা করতে ভয় পায়, কারণ তারা জানে—একটি মামলা মানে অসংখ্য তারিখ, আদালতে দৌড়ঝাঁপ, সামাজিক চাপ এবং অনিশ্চয়তা। ফলে অনেক অপরাধ কখনো আদালত পর্যন্তই পৌঁছায় না।

মেহেরপুরের এই রায় সেই হতাশার ভেতর একটি ভিন্ন বার্তা দিয়েছে। আদালত দেখিয়েছে, প্রযুক্তি ব্যবহার, কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং আন্তরিকতা থাকলে বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় আটকে থাকতে বাধ্য নয়। ভার্চুয়াল সাক্ষ্য গ্রহণের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক সময় সাক্ষীরা দূরে থাকে, নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে কিংবা বারবার আদালতে আসতে না পেরে অনুপস্থিত থাকে। প্রযুক্তি সেই জটিলতা কমাতে পারে।

তবে শুধু দ্রুত রায় দিলেই বিচারব্যবস্থা সফল হয়ে যায় না। বিচার হতে হবে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং মানবিক। কারণ বিচার যদি শুধুই প্রতিশোধে পরিণত হয়, তাহলে আইনের মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার বিচার যদি বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, তাহলে মানুষ রাষ্ট্রের ওপর আস্থা হারায়। এই দুইয়ের মাঝখানে যে ভারসাম্য—সেটিই প্রকৃত ন্যায়বিচার।

এই মামলায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ভিকটিম পরিবারের ক্ষতিপূরণের বিষয়টি আদালত গুরুত্ব দিয়েছেন। বাংলাদেশে অনেক সময় আমরা শুধু শাস্তির কথা বলি, কিন্তু ভুক্তভোগী পরিবার যে মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির ভেতর দিয়ে যায়, সেটি নিয়ে খুব কম আলোচনা হয়। আদালতের এই নির্দেশ সেই জায়গায়ও একটি ইতিবাচক বার্তা দেয়।

শিশু ধর্ষণ শুধু একটি ফৌজদারি অপরাধ নয়; এটি একটি সমাজের নৈতিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। যখন একটি শিশু নিরাপদ থাকে না, তখন উন্নয়ন, অর্থনীতি কিংবা রাজনৈতিক সাফল্যের বড় বড় গল্পও অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাই শুধু আদালতের রায় নয়, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং রাষ্ট্র—সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

মেহেরপুরের এই রায় হয়তো একটি মামলার সমাপ্তি। কিন্তু এটি একইসঙ্গে একটি প্রশ্নও রেখে গেছে—বাংলাদেশের প্রতিটি ভুক্তভোগী কি এমন দ্রুত ও কার্যকর বিচার পাওয়ার অধিকার রাখে না?

যদি উত্তর “হ্যাঁ” হয়, তবে এই রায়কে শুধু একটি সংবাদ হিসেবে নয়, বিচারব্যবস্থার জন্য একটি মানদণ্ড হিসেবে দেখা উচিত।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে মে, ২০২৬ বিকাল ৫:০৩
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শেষ ঠিকানা সাড়ে তিন হাত মাটির খরচ সাড়ে ৪ কোটি!

লিখেছেন কাজী আবু ইউসুফ (রিফাত), ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:২৩

শেষ ঠিকানা সাড়ে তিন হাত মাটির খরচ সাড়ে ৪ কোটি!




কবরের জমিতে বিলাসিতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক বৈষম্যের এক নির্মম চিত্র

মানুষের জীবনের শেষ ঠিকানা মাত্র সাড়ে তিন হাত মাটি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাকিস্তান পারল, বাংলাদেশ পারল না কেন: আরও একটি প্রশ্ন

লিখেছেন মুনতাসির, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫০

প্রথম আলোতে মুনির হাসানের ‘পাকিস্তান পারল, বাংলাদেশ পারল না কেন’ লেখাটি পড়লাম। পাকিস্তানে Google-এর নিজস্ব অফিস চালু হওয়াকে সামনে রেখে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন: তথ্যপ্রযুক্তি খাতে একসময় খুব বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

সর্ব্বহারা

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫০



দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়।
১৯৪৩ সালে জাপান ভারতে আচমকা বেশ কিছু বোমা হামলা করে। সম্ভবত হিটলারকে খুশি করতেই জাপান এই কাজ করে। একের পর এক বোমা ফেলে মাদ্রাজে (বতর্মান... ...বাকিটুকু পড়ুন

কেউ জানেনা

লিখেছেন অপ্‌সরা, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৪২


কেউ জানেনা
আমার একটা জগৎ আছে,
খুব গহীনে, সংগোপনে,
বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা
একটা জগৎ....
নিজের জগৎ, নিজের মত
আমার একটা জগৎ লাগে।

রোজ বিকেলে কাজের পরে
একটু যখন অবসরে,
একটু সময় চায়ের কাপে
নিজের মত, নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে পর্ণ এটাকের জনককে পাওয়া গিয়েছে?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:০৮




ব্লগার চারাগাছ সামুতে মডারেটর নেই বলে সন্দেহ করছেন। নিজের ধারণা পাকাপোক্ত করতে সামুতে পর্ণ এটাকের প্ল্যান করছেন। ইহা কি ব্লগার?

সামুতে পর্ণ এটাকের কারণে পর্ণ সাইটের ধুয়া তুলে বিগত সরকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×