somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কূটনীতির টেবিলে কুরআনের আয়াত: ইরান কীভাবে সুক্ষ্ম বার্তায় তুরস্ককে বিদ্ধ করল

০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মনস্তাত্ত্বিক আর বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের ময়দানটা সবসময়ই এক ভিন্ন মাত্রা বহন করে। ইরান এই প্রচারণামূলক বা ন্যারেটিভ যুদ্ধে কতটা সুক্ষ্ম ও দূরদর্শী, সম্প্রতি তেহরানে আয়াতুল্লাহ খামেনির জানাজা এবং শোকসভাকে কেন্দ্র করে তার এক অবিশ্বাস্য নজির দেখা গেল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি দলের সামনে তারা যে তিলাওয়াত নির্বাচন করল, তা যেন আধুনিক কূটনীতির ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হয়ে থাকবে। বিশেষ করে, মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান সামরিক পরাশক্তি তুরস্কের প্রতিনিধি দলকে ইরান যেভাবে পবিত্র কুরআনের আয়াতের আয়নায় তাদের আসল রূপটি দেখাল, তা এককথায় ছিল এক মোক্ষম মনস্তাত্ত্বিক চাল।



সামরিক ও কৌশলগত দিক থেকে বিবেচনা করলে মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র তুরস্ক। শুধু মুসলিম বিশ্বই বা কেন, খোদ পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর মধ্যেও আমেরিকার পরেই রয়েছে তাদের সবচেয়ে বড় এবং আধুনিক সশস্ত্র বাহিনী। গাযা উপত্যকায় দীর্ঘ দুই বছর ধরে চলা ভয়াবহ নৃসংশতা ও গণহত্যার প্রেক্ষাপটে অনেক মুসলিম দেশের এই অজুহাত থাকতে পারে যে—ইসরায়েল বা আমেরিকার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মতো অর্থনৈতিক বা সামরিক সক্ষমতা তাদের নেই। কিন্তু তুরস্কের ক্ষেত্রে এই অজুহাত কোনোভাবেই খাটে না। তুরস্কের ড্রোন প্রযুক্তি, সামরিক অবস্থান এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়েও শুধু অর্থনৈতিক অবরোধ বা কঠোর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে তারা অনেক কিছু আদায় করতে পারত। অথচ, এই দীর্ঘ সময়ে আঙ্কারার ভূমিকা কেবলই গুটিকয়েক তীব্র নিন্দা আর গালভরা বিবৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, যা বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষকে চরমভাবে হতাশ ও ক্ষুব্ধ করেছে।

তেহরানের সেই অনুষ্ঠানে তুরস্কের ভাইস প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে আসা উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের সামনে ইরানের ক্বারী যখন তিলাওয়াত করতে দাঁড়ালেন, তখন ইরান অত্যন্ত সুক্ষ্ম চালটি চালল। তারা প্রতিটি দেশের রাজনৈতিক ভূমিকার ওপর ভিত্তি করে ভিন্ন ভিন্ন আয়াত নির্ধারণ করেছিল। আর তুরস্কের সামনে তিলাওয়াতের জন্য বেছে নেওয়া হলো সূরা নিসার ৯৫ নম্বর আয়াত, যেখানে বলা হয়েছে—মুমিনদের মধ্যে যারা সক্ষম অথচ ঘরে বসে থাকে, আর যারা আল্লাহর পথে স্বীয় ধন-প্রাণ দ্বারা জিহাদ করে, তারা সমান নয়। যারা স্বীয় ধন-প্রাণ দ্বারা জিহাদ করে, আল্লাহ তাদেরকে যারা ঘরে বসে থাকে তাদের উপর মর্যাদা দিয়েছেন।

আয়াতের প্রতিটি শব্দ যেন সরাসরি তুরস্কের নিষ্ক্রিয়তার দিকেই আঙুল তুলছিল। শক্তিশালী সেনাবাহিনী, আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র এবং বিশাল ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব থাকার পরেও যারা শুধু তাত্ত্বিক বুলি আউড়ে নিজেদের গুটিয়ে রেখেছে, তাদের জন্য “অক্ষম নয়, অথচ ঘরে বসে থাকে...” এর চেয়ে নিখুঁত এবং ধারালো উপমা আর কী হতে পারত? কোনো রকম রাজনৈতিক শিষ্টাচার না ভেঙে, প্রোটোকল বজায় রেখে পবিত্র গ্রন্থের অবিনশ্বর বাণী দিয়েই তুরস্ককে তাদের নৈতিক দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিল ইরান, যা একই সাথে ছিল এক গভীর নীরব তিরস্কার।

এর আগেও ইরান তাদের প্রচারণামূলক লড়াইয়ে দারুণ সব বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছে। কখনো ‘লেগো মুভি’র অ্যানিমেশন ব্যবহার করে, কখনো টুইটারে হাস্যরসাত্মক কিন্তু তীক্ষ্ণ বার্তার মাধ্যমে তারা প্রতিপক্ষকে কুপোকাত করেছে। তবে কূটনৈতিক কোনো প্রথা না ভেঙে, সম্পূর্ণ ধর্মীয় ও ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ একটি পরিবেশকে ইরান যেভাবে নিজেদের রাজনৈতিক ও কৌশলগত বার্তা দেওয়ার মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করল, তা সত্যিই অভাবনীয়। উপস্থিত প্রতিটি দেশের দুর্বলতা কিংবা তাদের ভূমিকার চুলচেরা বিশ্লেষণ করে ঠিক সেই দেশের উপযোগী কুরআনের আয়াত সিলেক্ট করার এই প্রক্রিয়াটি ইরানের চরম সূক্ষ্ম বুদ্ধিমত্তাকেই প্রমাণ করে। সামনের সারিতে বসে নিজেদের নিষ্ক্রিয়তার এমন সত্য উদ্ভাসন হজম করা ছাড়া তুরস্কের প্রতিনিধিদের তখন আর কিছুই করার ছিল না। ইরান আরও একবার দেখাল যে, আধুনিক যুদ্ধ শুধু কামানের গোলার জোরে নয়, শব্দের সুক্ষ্ম প্রয়োগেও জেতা যায়।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:৫৯
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জুলাই: বাঙালি জাতির জন্য এক অভিশাপ ও মূল্যায়ন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:০১


জুলাই: বাঙালি জাতির জন্য এক অভিশাপ ও মূল্যায়ন

আমাদের দৃষ্টিতে, তথাকথিত "জুলাই" বাংলাদেশের জন্য কোনো গৌরবের অধ্যায় নয়; বরং এটি জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতা, অর্থনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রশ্নবিদ্ধ... ...বাকিটুকু পড়ুন

জাপান যেভাবে মাত্র ৭ বছরে অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:২৭



জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হায়াতো ইকেদা ১৯৬০ সালের শেষভাগে তাঁর বিখ্যাত "ইনকাম ডাবলিং প্ল্যান" বা "আয় দ্বিগুণকরণ পরিকল্পনা" চালু করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জাপানের অর্থনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে হেরে যাচ্ছি ০২

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৪


কাহিনীটা ৯০ এর দশকের শুরুতে। বুশ তখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট- মার্কিনিদের আগ্রাসন চলছে তখন ইরাক জুড়ে। হাটে মাঠে ঘাটে আড্ডায় গল্প আলোচনা মিডিয়ায় এমনকি বাসর ঘরেও তখন নব পরিণীতার সাথে তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভাংগুক অচলায়তন

লিখেছেন মাসুদ রানা শাহীন, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৯


ভয় পাবেন না
আশার পিদিম জ্বালিয়ে রাখুন
প্রাণের ধুকপুকি জাগিয়ে রাখুন
হেরে যাবেন না।

ঘাবড়াবেন না
নতুন স্বর ও সাহসী উচ্চারণে অনবদ্য হোন
ক্ষুরধার সৃষ্টির ঔজ্জ্বল্যে উদ্ভাসিত হোন
থামবেন না।

নগদমূল্যে বিকোবেন না
ক্লান্ত শিরায় নতুন রক্ত বইয়ে দিন
তাতিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জাতিসত্তার পরিচয়ের বাজার

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:২১

ইতিহাসে কোনো আদর্শ সত্যিকার অর্থে মরে না। সে শুধু নাম বদলায়, পরাজিত আদর্শেরও পুনর্জন্ম হয়।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগ একটি আসনও পায়নি। কিন্তু সেই রাতে মুসলিম লীগ মরেনি,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×