আন্তর্জাতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনে শব্দের লড়াই সবসময়ই অস্ত্রের চেয়ে ধারালো। তবে তেহরানে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষ বিদায় ও সম্মাননা জানানোর অনুষ্ঠানে ইরান যে মনস্তাত্ত্বিক কূটনীতির প্রদর্শন করল, তা এককথায় নজিরবিহীন। প্রথাগত রাজনৈতিক বিবৃতির ধার না ধেরে, ইরান উপস্থিত প্রতিটি দেশের প্রতিনিধি দলের সামনে পবিত্র কুরআন শরিফ থেকে অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে ভিন্ন ভিন্ন আয়াত তিলাওয়াত করে শোনালো। এর মাধ্যমে তারা কোনো কূটনৈতিক শিষ্টাচার না ভেঙেও, মুসলিম বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর দ্বিমুখী নীতি ও নিষ্ক্রিয়তাকে একদম কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তুরস্কের পর ইরানের এই সুক্ষ্ম ও ধারালো তিরস্কারের শিকার হতে হলো সৌদি আরবকে।

রিয়াদ থেকে আসা উচ্চপর্যায়ের সৌদি প্রতিনিধিদল যখন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলো, তখন তাদের সামনে ইরানের ক্বারী তিলাওয়াত করলেন সূরা আলে-ইমরানের ১৩ নম্বর আয়াত:
“তোমাদের জন্য অবশ্যই নিদর্শন আছে সেই দু’দল সৈন্যের মধ্যে যারা পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে দাঁড়িয়েছিল (বদর প্রান্তরে)। একদল আল্লাহর পথে যুদ্ধ করছিল এবং অপরদল ছিল কাফির, কাফিররা মুসলিমদেরকে প্রকাশ্য চোখে দ্বিগুণ দেখছিল। আল্লাহ যাকে ইচ্ছে স্বীয় সাহায্যের দ্বারা শক্তিশালী করে থাকেন, নিশ্চয়ই এতে দৃষ্টিমানদের জন্য শিক্ষা রয়েছে।”
ইসলামের ইতিহাসে প্রথম এবং সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ যুদ্ধ ‘বদর’-এর প্রেক্ষাপট টেনে এই আয়াতটি নির্বাচন করা কোনো কাকতালীয় ঘটনা ছিল না। এটি ছিল সৌদি রাজপরিবারের সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক ভূমিকার ওপর এক চরম মনস্তাত্ত্বিক আঘাত।
গাযা ও লেবাননজুড়ে যখন একদিকে মুসলিম প্রতিরোধ যোদ্ধারা এবং অন্যদিকে ইসরায়েলি বাহিনী এক রক্তক্ষয়ী অসম যুদ্ধে লিপ্ত, তখন মুসলিম বিশ্বের ‘নেতা’ দাবিদার সৌদি আরবের ভূমিকা বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের ক্ষুব্ধ করেছে। যখন দুটি পক্ষ স্পষ্ট—একদল নিজেদের অস্তিত্ব ও পবিত্র ভূমির জন্য লড়ছে, আর অন্য দল আধুনিক মারণাস্ত্র নিয়ে গণহত্যা চালাচ্ছে—তখন সৌদি শাসকেরা শুধু যে নীরব থেকেছেন তা-ই নয়, বরং বিভিন্ন উপায়ে সেই আগ্রাসী পক্ষকে পরোক্ষ সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে।
সৌদি প্রতিনিধিদের সামনে বদর প্রান্তরের সেই সত্য-মিথ্যার চূড়ান্ত লড়াইয়ের আয়াতটি পড়ে ইরান যেন এক চরম সত্যকে উন্মোচন করল। আয়াতটি মনে করিয়ে দেয়, যখন আল্লাহর পথে লড়াই করা দলের পাশে দাঁড়ানো প্রতিটি মুসলিমের নৈতিক দায়িত্ব, তখন সেই দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া বা কাফেরদের পক্ষে নীরব সমর্থন জোগানো কতটা বড় ঐতিহাসিক বিচ্যুতি। “নিশ্চয়ই এতে দৃষ্টিমানদের জন্য শিক্ষা রয়েছে”—আয়াতের এই শেষ অংশটি যেন সৌদি কূটনীতিবিদদের চোখের সামনে এক জ্বলজ্বলে আয়না ধরেছিল, যেখানে তাদের বর্তমান নীতির দেউলিয়াত্ব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।
এর আগে ইরান বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং অ্যানিমেশনের মাধ্যমে তাদের প্রচারণামূলক যুদ্ধের (Narrative War) শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়েছে। কিন্তু শোকের এক রাষ্ট্রীয় মঞ্চকে, সম্পূর্ণ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখে যেভাবে তারা রিয়াদের নীতিকে বিশ্বমঞ্চে প্রশ্নবিদ্ধ করল, তা এককথায় ‘মাস্টারস্ট্রোক’। কোনো কটু কথা নেই, কোনো প্রোটোকল লঙ্ঘন নেই; অথচ পবিত্র গ্রন্থের অবিনশ্বর বাণীর ধার দিয়ে সৌদি আরবের রাজকীয় অহংকারকে এক নিমেষেই গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো। তেহরানের সেই সভাকক্ষে বসে নিজেদের এই সুক্ষ্ম তিরস্কার হজম করা ছাড়া সৌদি প্রতিনিধিদের আর কোনো উপায় ছিল না। ইরান আবারও প্রমাণ করল, আধুনিক যুগের যুদ্ধ কেবল রণাঙ্গনেই সীমাবদ্ধ নয়, শব্দের নিখুঁত ও সুক্ষ্ম প্রয়োগে প্রতিপক্ষকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে পরাস্ত করার শিল্পেও তারা অনন্য।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



