somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অপেক্ষা নয়, শুরু করুন

১৭ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে—এ কথা আমরা প্রায় প্রতিদিনই শুনি। আবার একই সময়ে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান অভিযোগ করে, দক্ষ ও কাজ জানে এমন মানুষ পাওয়া যাচ্ছে না। একদিকে চাকরিপ্রার্থী, অন্যদিকে দক্ষ জনবলের সংকট—এই দুই বাস্তবতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকেই ইঙ্গিত করে। সমস্যাটা শুধু চাকরির নয়, দক্ষতারও।

আজ অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই অভিজ্ঞ কর্মী খোঁজে। তখন নতুন একজন স্নাতক স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করে, "চাকরি না পেলে অভিজ্ঞতা আসবে কোথা থেকে?" এই প্রশ্নের উত্তর খুব সহজ, কিন্তু বাস্তবে প্রয়োগ করা কঠিন—কোনো না কোনো জায়গা থেকে শুরু করতে হবে।

আমি সবসময় তরুণদের একটি কথাই বলি—যে কোনো সৎ কাজ দিয়ে শুরু করুন। শুরুতে কাজটি আপনার স্বপ্নের চাকরি নাও হতে পারে, বেতন কম হতে পারে, পদমর্যাদা আপনার প্রত্যাশার মতো নাও হতে পারে। কিন্তু যদি শেখার আগ্রহ নিয়ে লেগে থাকেন এবং কাজটিকে ভালোবাসতে শিখেন, তাহলে একদিন আপনি নিজের জন্য একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করবেন। আর যদি সত্যিই দক্ষ হয়ে উঠতে পারেন, বিশ্বাস করুন—একসময় কাজই আপনাকে খুঁজে নেবে।

দুঃখের বিষয়, বর্তমান প্রজন্মের একটি বড় অংশ বাস্তব দক্ষতা অর্জনের চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি সময় ব্যয় করছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক কিংবা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেওয়া, অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক, ট্রেন্ড বা ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতা—এসব হয়তো সাময়িক বিনোদন দেয়, কিন্তু জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথ তৈরি করে না। বাস্তব জীবনে একজন নিয়োগকর্তা আপনার ফলোয়ার সংখ্যা দেখেন না; তিনি দেখেন আপনি কী জানেন, কী করতে পারেন এবং কত দ্রুত নতুন কিছু শিখতে পারেন।

আমি তরুণদের অনুরোধ করব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় নষ্ট করার পাশাপাশি নয়, বরং তার পরিবর্তে প্রযুক্তি শেখার দিকে গুরুত্ব দিন। আজকের পৃথিবী দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কম্পিউটারের মৌলিক দক্ষতা, Microsoft Excel, Word, PowerPoint, ই-মেইল কমিউনিকেশন, ডেটা অ্যানালাইসিস, ERP সফটওয়্যার, ডিজিটাল টুলস এবং বিশেষ করে Artificial Intelligence (AI) সম্পর্কে ভালো ধারণা ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করুন।

আমার দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, অনেক শিক্ষিত তরুণ-তরুণী ফেসবুক বা টিকটক ব্যবহারে খুবই দক্ষ, কিন্তু একটি ভালো Excel রিপোর্ট তৈরি করা, তথ্য বিশ্লেষণ করা, AI ব্যবহার করে কাজের গতি বাড়ানো কিংবা অফিসের ডিজিটাল সিস্টেমে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকে। অথচ ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে এগুলোই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতা। খুব শিগগিরই AI জানা কোনো অতিরিক্ত দক্ষতা নয়, বরং মৌলিক প্রয়োজন হয়ে দাঁড়াবে। তাই প্রযুক্তিকে ভয় না পেয়ে নিজের সহযোগী হিসেবে গ্রহণ করুন।

আমি আশার কথাও বলতে চাই। আমাদের দক্ষিণ চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত কোরিয়ান ইপিজেড (KEPZ) হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে। প্রতিদিন ভোরে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে অসংখ্য তরুণ-তরুণী সেখানে কাজে যোগ দিতে আসছেন। যাদের অনেকেই একসময় বেকার ছিলেন, আজ তারা নিজেদের পরিশ্রমে পরিবার চালাচ্ছেন এবং আত্মসম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করছেন। এই দৃশ্য আমাকে আশাবাদী করে। কারণ আমি বিশ্বাস করি, সুযোগ এখনও তৈরি হচ্ছে; দরকার শুধু সেই সুযোগের কাছে নিজেকে নিয়ে যাওয়ার সাহস।

বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের জন্য তৈরি পোশাক শিল্পে (RMG) এখনও বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। পৃথিবীর কোনো শিল্পই গুণগত মান নিশ্চিত করা ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। আর সেই কারণেই Quality Control (QC) বিভাগের গুরুত্ব কখনো কমবে না।

আমি নিজেও কর্মজীবনের শুরুতে QC হিসেবে কাজ করেছি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি, গার্মেন্টস শিল্পে শেখার সবচেয়ে বড় ক্ষেত্রগুলোর একটি হলো QC। এখানে কাজ করলে শুধু একটি পোশাক পরীক্ষা করাই শেখা হয় না; শেখা হয় পুরো উৎপাদন ব্যবস্থা, ফেব্রিক, সেলাই, ফিনিশিং, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মানদণ্ড, সমস্যা বিশ্লেষণ, দলগত কাজ এবং দায়িত্ববোধ। আমি প্রায়ই বলি, QC হলো পোশাক শিল্পের প্রাথমিক বিশ্ববিদ্যালয়। এখান থেকে শেখা অভিজ্ঞতা একজন মানুষকে ভবিষ্যতে Production, IE, Merchandising, Planning, QA কিংবা Factory Management—যেকোনো বিভাগে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।

তাই যারা পড়াশোনা শেষ করে বেকার বসে আছেন, তাদের বলব—নিখুঁত চাকরির অপেক্ষায় সময় নষ্ট করবেন না। প্রথম সুযোগটিকে গ্রহণ করুন। কারণ কর্মজীবনের প্রথম চাকরিটি আপনার শেষ গন্তব্য নয়; সেটিই আপনার ভবিষ্যতের ভিত্তি।

সবশেষে একটি কথা স্পষ্ট করে বলতে চাই। এই লেখা পড়ে দয়া করে কেউ আমার কাছে চাকরির জন্য সুপারিশ, রেফারেন্স বা বিশেষ ব্যবস্থা করার অনুরোধ করবেন না। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, নিজের যোগ্যতায় একটি কাজ খুঁজে পাওয়ার গৌরব, আত্মমর্যাদা ও তৃপ্তির সঙ্গে কোনো কিছুর তুলনা হয় না। সুপারিশে পাওয়া সুযোগের মূল্য অনেকেই দিতে পারেন না। নিজের চেষ্টায় অর্জিত সাফল্য মানুষকে বিনয়ী করে, আত্মবিশ্বাসী করে এবং দায়িত্বশীল করে তোলে। তাই নিজেই খোঁজ করুন, নিজেই আবেদন করুন, নিজেই সাক্ষাৎকার দিন। নিজের যোগ্যতায় অর্জিত একটি চাকরির আনন্দই আলাদা।

মনে রাখবেন, পৃথিবীতে সফল মানুষের গল্প খুব কমই আরামদায়কভাবে শুরু হয়েছে। যারা আজ বড় অবস্থানে আছেন, তাদের অধিকাংশই ছোট একটি সুযোগ দিয়ে পথচলা শুরু করেছিলেন। কোনো কাজকে ছোট ভাববেন না, কোনো শেখাকে অবহেলা করবেন না এবং কোনো ব্যর্থতাকে শেষ মনে করবেন না।

কাজকে ভালোবাসুন, শেখাকে অভ্যাসে পরিণত করুন, প্রযুক্তিকে সঙ্গী করুন এবং নিজের দক্ষতায় বিশ্বাস রাখুন। ইনশাআল্লাহ, একদিন এমন সময় আসবে যখন আপনাকে চাকরি খুঁজতে হবে না—আপনার দক্ষতার জন্য কাজই আপনাকে খুঁজে নেবে।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:০৩
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্যা সিক্রেট অফ ব্লগ ল্যাং মারামারি

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৬ ই জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৫

ব্লগে টিকে থাকতে হলে আপনাকে মানসিক ভাবে শক্ত হতে হবে। আপনাকে অন্য কোন ব্লগার ল্যাংচি মেরে ফেলে দিবে, এরজন্যে আপনার প্রস্তুত থাকা উচিৎ। এই 'আমেরিকা বনাম ইরান' ল্যাং মারা খাওয়ায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

গভীর ক্রন্দন

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ১৬ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১১:৫৮


মেম্বার বাড়ি আর সরকার বাড়ির শত্রুতা দীর্ঘদিনের। জমিজমা লইয়া আজ এমন একখানি ঘটনা ঘটিয়া যাইবে, কেহ বোধহয় কল্পনাও করিতে পারেন নাই।

সকাল আটটায় কাঠের ব্যাপারী খসরু আসিয়া হাজির। দলিল লেখক আবু... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাজারের আগুন নিভবে পে-স্কেলে, প্রবৃদ্ধি ছুঁয়ে যাবে দশ শতাংশ ...

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৭ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:৩৮


কেরামত মওলা সাহেবকে চেনেন না এমন মানুষ সচিবালয়ে কমই আছেন। তিনি মন্ত্রিপরিষদের একজন সিনিয়র সচিব। আজ নতুন পে স্কেল নিয়ে গঠিত সচিবদের কমিটির সবচেয়ে ক্ষমতাধর এবং গুরুত্বপূর্ণ মানুষটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইসলামাবাদে জুলাই শহীদদের স্মরণে অনুষ্ঠান

লিখেছেন মাথা পাগলা, ১৭ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ৭:৪৩



পাকিস্তানের ইসলামাবাদে বাংলাদেশ হাইকমিশনে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মরণে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বক্তারা দাবি করেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কোনো ব্যক্তি বা দলের একক অর্জন নয়; এটি ছিল ছাত্র-জনতার সম্মিলিত আন্দোলনের ফল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপা আর ফিরে আসবে না......

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৭ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ১০:৪১

যুগে যুগে গণ-আন্দোলন ও তীব্র জনরোষের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হওয়া বিভিন্ন দেশের স্বৈরশাসকদের তালিকাঃ

(১) মোহাম্মদ রেজা পাহলভিঃ (ইরান - ১৯৭৯)১৯৭৯ সালে ইরানি বিপ্লবের সময় লাখ লাখ মানুষের প্রবল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×