somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যে ঘরটাকে চিনিনি

৩০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আমার নাম নাবিল।

আমাদের গ্রামটা নদীর পাড়ে। বর্ষায় নদী উপচে উঠলে উঠানের শেষ সীমানা পর্যন্ত পানি চলে আসে। শীতে সেই নদী শুকিয়ে চর জেগে ওঠে। চরজুড়ে কাশফুল, ধানের গন্ধ আর বিকেলের মিষ্টি রোদ।

এই গ্রামেই আমার জন্ম।

তবু বহু বছর ধরে মনে হতো, আমার জীবনটা এই গ্রামের চেয়ে অনেক বড়।

বিয়ের পর আমার স্ত্রী নীলাকে আমি কখনো ঠিকমতো বুঝিনি।

মেয়েটা ছিল খুব সাধারণ। সাজগোজের প্রতি তেমন আগ্রহ নেই, বড় কোনো শখ নেই, কোথাও বেড়াতে যাওয়ার বায়না নেই। তার পৃথিবী বলতে ছিল আমাদের বাড়ি, উঠানের পেয়ারা গাছ, রান্নাঘর আর আমি।

আমি প্রায়ই তাকে বলতাম,

—তোমার কোনো শখ নেই?

সে হেসে বলত,

—আছে তো।

—কী?

—তুমি ভালো থাকো।

আমি হেসে উড়িয়ে দিতাম।

তখন এসব কথা আমার কাছে খুব সাধারণ মনে হতো।

আমি বাজারের আড্ডায় বসতাম, বন্ধুদের সঙ্গে নদীতে মাছ ধরতে যেতাম, কখনো হাটে, কখনো পাশের গ্রামে। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হলেও বাড়ি ফেরার তাড়া থাকত না।

নীলা অপেক্ষা করত।

কখনো উঠানে বসে, কখনো বারান্দায়।

আমি ফিরলে গরম ভাত দিত।

কোনোদিন জিজ্ঞেস করত না—

“এত দেরি হলো কেন?”

বরং বলত,

—হাত-মুখ ধুয়ে এসো, ভাত বেড়ে দিচ্ছি।

আমি বুঝতেই পারিনি, অপেক্ষা করাটাও ভালোবাসার একটা ভাষা।

---

সেদিন দুপুরে আমি বাজার থেকে ফিরছিলাম।

বাড়ির সামনে অস্বাভাবিক ভিড় দেখে দৌড়ে ঢুকলাম।

উঠানের এক পাশে নীলা পড়ে আছে।

মুখের এক পাশ বেঁকে গেছে।

আমি ডাকলাম,

—নীলা!

সে চোখ মেলে তাকাল।

কিন্তু কোনো কথা বলল না।

হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর ডাক্তার বললেন, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছে।

কয়েকদিন হাসপাতালে থাকার পর তাকে বাড়িতে নিয়ে এলাম।

নীলা বেঁচে ছিল, কিন্তু আগের নীলা আর ছিল না।

ডান পাশ অবশ। কথা বলতে পারে না। নিজে উঠে বসতে পারে না। খাওয়াতেও সাহায্য লাগে।

প্রথমদিকে একজন নার্স রেখেছিলাম।

কিন্তু ধীরে ধীরে গ্রামের মানুষজন আসতে শুরু করল।

আর তখনই আমি এমন একটা সত্য জানতে পারলাম, যা সুস্থ অবস্থায় নীলার পাশে থেকেও কখনো জানতে পারিনি।

নীলা শুধু আমার স্ত্রী ছিল না।

সে অনেক মানুষের আপনজন ছিল।

পাশের বাড়ির জয়নব খালা প্রতিদিন এসে তার মাথায় তেল দিয়ে যেতেন।

বৃদ্ধ কাশেম চাচা বাজার থেকে শাকসবজি এনে বলতেন,

—ভাবির পছন্দের লাউটা পাইছি। টাকা নেব না।

মাদ্রাসার ছোট্ট সাকিব এসে একদিন বলল,

—চাচি ভালো হলে আবার আমাকে পিঠা বানাইয়া দিবে তো?

আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম।

আমি জানতাম না, নীলা এত মানুষকে ভালোবাসত।

আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়—এত মানুষ তাকে ভালোবাসত।

---

এক রাতে প্রচণ্ড বৃষ্টি।

বিদ্যুৎ নেই।

ঘরের টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ।

হঠাৎ নীলার বিছানার কাছে গিয়ে বুঝলাম, বিছানা নোংরা হয়ে গেছে।

নার্স সেদিন আসেনি।

কী করব বুঝতে পারছিলাম না।

হঠাৎ একটা পুরোনো রাত মনে পড়ল।

বিয়ের কয়েক বছর পর একবার আমার ভীষণ জ্বর হয়েছিল। সারা রাত ঘেমে বিছানা ভিজিয়ে ফেলেছিলাম।

নীলা একাই সব পরিষ্কার করেছিল।

আমি তখন আধঘুমে বলেছিলাম,

—কাল করলেই তো হতো।

সে মৃদু হেসে বলেছিল,

—তুমি কি ভেজা বিছানায় ঘুমাতে পারবে?

সেদিন কথাটা শুনে কোনো উত্তর দিইনি।

আজ বুঝলাম।

ভালোবাসা আসলে বড় কোনো ঘোষণা নয়।

কখনো কখনো ভালোবাসা মানে রাতের অন্ধকারে কারও নোংরা বিছানা পরিষ্কার করে দেওয়া।

আমি নিজেই সব পরিষ্কার করলাম।

নীলার কাপড় বদলে দিলাম।

তারপর তার পাশে বসে হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম,

—তুমি এতদিন এসব একা করতে?

নীলা আমার দিকে তাকিয়ে রইল।

তার ঠোঁট কাঁপল।

কথা বের হলো না।

কিন্তু চোখ দুটো ভিজে উঠল।

সেই চোখের জল আমাকে অস্বস্তিতে ফেলল।

সেখানে অভিযোগ ছিল না।

ছিল যেন একটা প্রশ্ন—

“এতদিন পর বুঝলে?”

---

পরদিন ভোরে আমি নদীর ধারে গেলাম।

কুয়াশায় নদী প্রায় দেখা যায় না।

চরের ওপর কয়েকটা বক দাঁড়িয়ে।

দূরে কৃষকেরা ধান কাটছে।

আমি অনেকক্ষণ বসে রইলাম।

আমার মনে হচ্ছিল, এতদিন আমি ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে সুখ খুঁজেছি।

অথচ যে মানুষটা আমার ঘরটাকে প্রতিদিন একটু একটু করে সুন্দর করেছে, তাকে কখনো দেখিইনি।

---

সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে দেখি কয়েকজন মহিলা নীলার পাশে বসে গল্প করছে।

জয়নব খালা বলছিলেন,

—নীলা ভালো হইলে আবার উঠানে বসে আমাদের সঙ্গে গল্প করবে।

আরেকজন বললেন,

—ওর হাতের নারকেলের পিঠার মতো পিঠা আর কেউ বানাতে পারে না।

আমি দরজার আড়াল থেকে শুনছিলাম।

হঠাৎ বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে গেল।

আমি নীলাকে স্ত্রী হিসেবে পেয়েছিলাম।

কিন্তু মানুষ হিসেবে চিনিনি।

---

সেদিন রাতে নীলার পাশে বসে ছিলাম।

জানালা দিয়ে চাঁদের আলো এসে তার মুখে পড়েছে।

অসুস্থতার কারণে মুখ শুকিয়ে গেছে। চুল এলোমেলো। চোখের নিচে কালি।

তবু আমার চোখে সে সেদিন অদ্ভুত সুন্দর।

আমি তার হাত ধরলাম।

বললাম,

—নীলা, আমি তোমাকে খুব কম বুঝেছি।

সে তাকিয়ে রইল।

—তুমি যখন আমার জন্য অপেক্ষা করতে, আমি ভাবতাম তুমি ঘরে বসে আছ। এখন বুঝি, তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করতে।

তার চোখের কোণে পানি জমল।

আমি বললাম,

—আমি যদি আবার শুরু করতে পারতাম!

নীলার চোখ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল।

আমি জানি না সে আমার কথা বুঝেছিল কি না।

কিন্তু তার আঙুলটা আমার হাতের ভেতর সামান্য নড়ে উঠেছিল।

---

পরদিন সকালে আমি একটা সিদ্ধান্ত নিলাম।

চায়ের দোকানে গিয়ে বন্ধুদের বললাম,

—আজ থেকে আড্ডা কমাব।

একজন হেসে বলল,

—বউয়ের কাছে হার মানলি?

আমি বললাম,

—না। এতদিন বউকে হারিয়ে রেখেছিলাম। এখন তাকে ফিরে পেয়েছি।

সেদিন থেকেই আমার জীবন বদলে গেল।

ভোরে উঠি।

গরুকে খাবার দিই।

উঠান পরিষ্কার করি।

নীলার ওষুধের সময় লিখে রাখি।

নিজে তাকে খাওয়াই।

বিকেলে তার বিছানা উঠানে এনে দিই, যাতে সে আকাশ দেখতে পারে।

প্রথম কয়েকদিন গ্রামের লোকজন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকত।

একদিন কাশেম চাচা হেসে বললেন,

—নাবিল, তোমারে তো নতুন মানুষ মনে হয়।

আমি হেসে বললাম,

—পুরোনো মানুষটাই ভুল ছিল চাচা।

---

শীতের এক সকালে নীলাকে রোদে বসিয়েছিলাম।

তার মাথায় তেল দিচ্ছিলাম।

হঠাৎ অনুভব করলাম, আমার হাতের ওপর তার আঙুল কাঁপছে।

আমি থেমে গেলাম।

নীলা আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

চোখে পানি।

সে অনেক চেষ্টা করে ঠোঁট নাড়ল।

কোনো শব্দ হলো না।

আমি ঝুঁকে বললাম,

—কী বলবে?

সে পারল না।

শুধু আমার হাতটা শক্ত করে ধরল।

মাত্র কয়েক সেকেন্ড।

কিন্তু সেই স্পর্শে আমার মনে হলো, সে যেন আমাকে একটা উত্তর দিল।

সে আমার পরিবর্তন দেখেছে।

আমার অপেক্ষা দেখেছে।

আমার হাতের যত্ন অনুভব করেছে।

তার চোখে তখন শুধু কষ্ট ছিল না।

ছিল স্বস্তি।

যেন বহুদিন ধরে যে মানুষটার জন্য দরজা খোলা রেখেছিল, সে অবশেষে ঘরে ফিরেছে।

আমি তার হাতটা নিজের দুই হাতের মধ্যে নিয়ে বললাম,

—এবার থেকে তোমাকে একা অপেক্ষা করতে হবে না।

নীলার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

তার ঠোঁটের কোণে খুব সামান্য হাসি ফুটে উঠল।

---

বাইরে তখন শীতের রোদ।

ধানের খড়ের ওপর শিশির ঝলমল করছে।

দূরের মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে।

নীলা কথা বলতে পারে না।

হাঁটতে পারে না।

আগের মতো সংসারও করতে পারে না।

তবু সেদিন মনে হলো, আমাদের সংসার আবার শুরু হয়েছে।

এবার নীলা একা সংসার করছে না।

আমি তার পাশে আছি।

বহু বছর ধরে যে ঘরটাকে শুধু থাকার জায়গা ভেবেছিলাম, সেদিন প্রথমবার বুঝলাম—

ঘর আসলে একটা মানুষকে ঘিরে তৈরি হয়।

আর সেই মানুষটা হারিয়ে যাওয়ার আগেই তাকে চিনে নেওয়াই ভালো।

আমি দেরি করেছি।

তবে এবার আর কোথাও যাওয়ার নেই।

আমার ঘরেই আমার পৃথিবী।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:১২
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিয়োগের রূপকথা

লিখেছেন ইসিয়াক, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৩



মা বরাবরই পাতে ভাত কম নিতো , বলতো- ভাতে না-কি  বাত বাড়ে।
বিশেষ বিশেষ দিনে বাড়ি পোষা মোরগের ঝোল কিংবা রুই মাছের তরকারীর সবটুকু  আমাদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

দৃষ্টিকটু পোশাক ও দৃষ্টিকটু আচরণ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪



আপডেট - হাফপেন্ট আন্দোলন: ৩০/০৯/২০২৬
হাফপেন্ট পরে মেট্রো ট্রেন ও বাসে চলাচল বাংলাদেশের একটি নাগরিক চাহিদা হতে পারে। যেহেতু সমস্যা মেট্রোতে হয়েছে, আমি ধারণা করেছি বাংলাদেশে ফেসবুকে “হাফপেন্ট আন্দোলন” হওয়ার সম্ভবনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

কঠিনতম সব চ্যালেঞ্জের মুখে বিএনপির ভবিষ্যৎ কি অন্ধকার??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:১০



বিএনপির সামনে অনেক কঠিন সব চ্যালেঞ্জ...

তাদের মোকাবেলা করতে হচ্ছে দ্বিমুখী বিরোধী-দলীয় রাজনীতি বা কর্মকাণ্ড (যেটা কিনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে আগে কখনো দেখা যায়নি)।

জামাত-এনসিপি যতই লীগের ফিরে আসার বিরুদ্ধে বিএনপির... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার নানা মরহুম শাহাবুদদীন মাহমুদ জায়গীরদার

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৯:২৫



আমার আম্মার সেঝ চাচা’র লেখা ‘My life is not mine’ বইটি পড়ছি। বইটিতে ‘মাইজম ভাই’ নামের একটি অধ্যায় আছে। এতে সেঝ নানা আমার নানার বিভিন্ন সত্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

মৃত্যু পেরিয়ে আবার ব্লগে------

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ৩০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:০৬




প্রায় ০৩ মাস হয়ে গেলো ব্লগে আসনা হয় না, আসা হয়না মানে লিখা হয়না। প্রিয়জনের মৃত্যু শোক কাটিয়ে ব্লগে উকি দেওয়া হয় কিন্তু পোস্ট দেওয়া হয় না।


গত... ...বাকিটুকু পড়ুন

×