বিমানবন্দরের একটি ঘটনা আবারও আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির পুরোনো প্রশ্নটি সামনে এনে দিয়েছে—ক্ষমতার পরিচয় কি আচরণের দায়কে বদলে দেয়?
মদিনা থেকে দেশে ফেরার পথে জামায়াতে ইসলামীর চার সংসদ সদস্যসহ ওমরাহযাত্রীদের লাগেজ ও জমজমের পানি সরবরাহে বিলম্বের ঘটনায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের দুই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বিমান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রাথমিক অনুসন্ধানে কন্টেইনার অফলোডিং ও পরিচালনাগত গাফিলতির বিষয়টি উঠে এসেছে এবং বিভাগীয় তদন্ত চলছে।
যদি কর্মকর্তাদের দায়িত্বে সত্যিই অবহেলা থেকে থাকে, তাহলে ব্যবস্থা নেওয়াই স্বাভাবিক। সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি মানে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভুল বা দুর্ব্যবহারের দায় থেকে অব্যাহতি পাওয়া নয়। বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে নাগরিকসেবা যত গুরুত্বপূর্ণ, জবাবদিহিও তত জরুরি।
কিন্তু প্রশ্নটি এখানেই শেষ নয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিমানবন্দরের একটি ভিডিওতে সাবেক সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের সঙ্গে বিমানবন্দরের কর্মকর্তাদের তর্ক-বিতর্কের দৃশ্য দেখা গেছে। পরবর্তী সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, নিরাপত্তাকর্মীকে লাঞ্ছিত করা এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো অভিযোগে মামলা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজ, সাক্ষ্য ও অন্যান্য আলামতের ভিত্তিতে তদন্ত করা হচ্ছে।
ভিডিওতে যা দেখা যায়, তার সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট হয়তো ভিডিওটুকু দিয়ে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তাই ভিডিও দেখে চূড়ান্ত রায় দেওয়ারও সুযোগ নেই। কিন্তু একটি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়—কোনো অভিযোগ থাকলেও প্রতিবাদ বা ক্ষোভ প্রকাশের ভাষা ও পদ্ধতি কি সীমাহীন হতে পারে?
আরেকটি বিষয়ও ভুলে গেলে চলবে না। আখতারুজ্জামান এর আগে বিএনপির রাজনীতিতে ছিলেন এবং ২০২২ সালে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে পঞ্চমবারের মতো বহিষ্কৃত হন বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে যোগ দেন।
এখানেই আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির আয়নাটি একটু পরিষ্কার হয়। একই আচরণ যদি নিজের দলের কেউ করে, তখন সেটি ‘দলবিরোধী’, ‘অশোভন’ বা ‘শৃঙ্খলাভঙ্গ’; আর দল বদলানোর পর সেই একই মানুষ কি হঠাৎ চরিত্রের নতুন সংস্করণ হয়ে যান?
রাজনীতিতে দল বদলানো অপরাধ নয়। কিন্তু দল বদলালে অতীত আচরণের দায়ও বদলে যাওয়ার কথা নয়। মানুষের পরিচয় বদলাতে পারে, কিন্তু ঘটনার ভিডিও বদলায় না; দল বদলাতে পারে, কিন্তু দায়িত্বশীলতার মানদণ্ড বদলানো উচিত নয়।
তাই বিমান কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ যেমন স্বচ্ছ তদন্তে প্রমাণিত হতে হবে, তেমনি বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলা বা সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগও নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হওয়া উচিত।
কারও রাজনৈতিক পরিচয় তাকে হয়রানি থেকে রক্ষা করবে না, আবার রাজনৈতিক পরিচয় দেখিয়ে কাউকে হয়রানির শিকার করাও গ্রহণযোগ্য নয়।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী হোক কিংবা রাজনৈতিক নেতা—আইনের সামনে পরিচয় নয়, আচরণ ও প্রমাণই হওয়া উচিত শেষ কথা।
কারণ বদ লোক বেহেশতে গেলেও অভ্যাস বদলাবে—এমন নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। তবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো, কে কোন দলে আছেন তা না দেখে তাঁর আচরণ, অভিযোগ ও প্রমাণের বিচার করা। আর সেই বিচার যদি হয় স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও প্রমাণনির্ভর—তবেই আস্থাটা টিকে থাকবে।
বিমানবন্দরে কে কাকে হারালেন—এটি বড় কথা নয়। বড় কথা হলো, রাষ্ট্রের নিয়ম কি শেষ পর্যন্ত সবার জন্য একই থাকে?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


