somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চট্টগ্রামের জ্ঞানতাপস আচার্য যোগেশ চন্দ্র সিংহ

০৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:৫২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সাধনপুরের সন্তান আচার্য যোগেশ চন্দ্র সিংহ যিনি নিজের আলোয় আলোকিত করেছিলেন চট্টগ্রামের শিক্ষা-জগৎ।

কোনো কোনো মানুষের জন্মদিন ইতিহাসের ক্যালেন্ডারে একটি সাধারণ তারিখ হয়ে থাকে। আবার কোনো কোনো মানুষের জন্ম একটি জনপদের ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। তাঁরা হয়তো রাজা-বাদশাহ নন, ক্ষমতাবান রাজনীতিকও নন; তাঁদের হাতে থাকে না রাষ্ট্রের ক্ষমতা। তাঁদের হাতে থাকে বই, কলম আর মানুষ গড়ার স্বপ্ন। অথচ সময়ের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে দেখা যায়, তাঁরাই নীরবে একটি সমাজের ভিত বদলে দিয়েছেন।
আচার্য যোগেশ চন্দ্র সিংহ ছিলেন তেমনই একজন মানুষ।


চট্টগ্রামের বাঁশখালীর সাধনপুর গ্রামের সন্তান তিনি। এক শতাব্দীরও বেশি আগে যে গ্রাম থেকে তাঁর শিক্ষার যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই গ্রামের বিদ্যালয়ের উন্নয়নেও জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় তিনি ব্যয় করেছিলেন। শহরের নামী কলেজের অধ্যাপক হয়েও গ্রামের স্কুলের শিক্ষার পরিবেশ ও পাঠক্রম নিয়ে ভাবতেন। নিজের গ্রামের শিক্ষার্থীরা যেন ভালো শিক্ষা পায়, সে জন্য বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আবার চট্টগ্রাম শহরে এসে কর্মজীবী মানুষের উচ্চশিক্ষার জন্য নৈশ কলেজ প্রতিষ্ঠার নেতৃত্ব দিয়েছেন, নারীশিক্ষার প্রসারে কাজ করেছেন এবং প্রায় তিন দশক চট্টগ্রাম কলেজে অধ্যাপনা করেছেন।
শিক্ষা তাঁর কাছে কোনো চাকরি ছিল না; ছিল আজীবনের সাধনা।
আর সেই কারণেই তাঁর নামের আগে ‘আচার্য’ শব্দটি যেন নিছক একটি উপাধি নয়—তাঁর জীবন ও কর্মের যথার্থ পরিচয়।

সাধনপুরের মাটি থেকে যাত্রা

১৮৯০ সালে বাঁশখালীর সাধনপুর গ্রামের জমিদার প্যারীমোহন সিংহের পরিবারে জন্ম যোগেশ চন্দ্র সিংহের। তাঁর শৈশব কেটেছে এমন এক সময়ে, যখন গ্রামবাংলায় উচ্চশিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত এবং কলকাতা বা অন্য কোনো বড় শহরে গিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ ছিল বিরাট এক অর্জন।
কিন্তু তাঁর মধ্যে ছিল প্রবল জ্ঞানপিপাসা।
নিজ এলাকার বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে তিনি পটিয়া স্কুলে পড়াশোনা করেন। ১৯১০ সালে প্রথম বিভাগে এনট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর কলকাতা সিটি কলেজে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে লাভ করেন ‘বঙ্কিম মেডেল’। পরে ইংরেজি বিষয়ে অনার্স এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণিতে এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন।
সেই সময়ের বাস্তবতায় একজন গ্রামীণ তরুণের এমন শিক্ষাগত সাফল্য নিঃসন্দেহে অসাধারণ ছিল। স্থানীয় ইতিহাসে তাঁকে বাঁশখালী অঞ্চলের প্রথম এম.এ ডিগ্রিধারী ব্যক্তিত্ব হিসেবেও স্মরণ করা হয়।
কিন্তু তাঁর গল্পের আসল সৌন্দর্য এখানেই নয় যে তিনি কত বড় ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। সৌন্দর্য হলো—এই উচ্চশিক্ষা তাঁকে নিজের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করেনি।
বরং জীবনের পরবর্তী সময়ে তিনি বারবার ফিরে গেছেন সেই শিকড়ের কাছে।
নিজের বিদ্যালয়ের জন্য ফিরে এসেছিলেন তিনি
বানীগ্রাম সাধনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সঙ্গে যোগেশ চন্দ্র সিংহের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর। বিদ্যালয়টি ছিল তাঁর নিজের শিক্ষাজীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই জীবনের প্রতিষ্ঠিত পর্যায়ে এসে তিনি এই বিদ্যালয়কে শুধু একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থীর আবেগ দিয়ে দেখেননি; দেখেছেন একজন শিক্ষাবিদের দায়িত্ববোধ দিয়ে।
১৯৩৮ সাল থেকে প্রায় ১৯৫০ সাল পর্যন্ত তিনি বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ ও পাঠক্রম উন্নয়নের কাজে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। তিনি বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
এ সময় তিনি চট্টগ্রাম শহরের একজন প্রতিষ্ঠিত অধ্যাপক। তাঁর কর্মক্ষেত্র ছিল শহরের উচ্চশিক্ষার জগৎ। কিন্তু গ্রামের স্কুলের বিষয়টি তাঁর কাছে আলাদা কোনো বিষয় ছিল না।

বিদ্যালয়ের পড়াশোনার পরিবেশ কেমন হওয়া উচিত, পাঠক্রম কীভাবে আরও উন্নত করা যায়, শিক্ষার মান কীভাবে বাড়ানো সম্ভব—এসব নিয়ে তিনি কাজ করেছেন। তাঁর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে তিনি নিজের গ্রামের শিক্ষার্থীদের জন্য কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন।
এখানে তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রকাশ পায়।
মানুষ নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সাধারণত সামনে তাকায়; যোগেশ চন্দ্র সিংহ সামনে এগোনোর পাশাপাশি পেছনেও তাকিয়েছিলেন। তিনি ভুলে যাননি সেই বিদ্যালয়কে, যে বিদ্যালয় তাঁর জীবনের প্রথম শিক্ষার দরজা খুলে দিয়েছিল।
এক অর্থে বলা যায়, সাধনপুরের সেই বিদ্যালয় তাঁকে শিক্ষা দিয়েছিল, আর তিনি পরবর্তী জীবনে সেই বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করার মাধ্যমে তার ঋণ শোধ করার চেষ্টা করেছিলেন।
এ কারণেই তাঁর সঙ্গে বানীগ্রাম সাধনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সম্পর্ক শুধু ইতিহাসের একটি তথ্য নয়; এটি তাঁর চরিত্রের একটি সুন্দর প্রতিচ্ছবি।
চট্টগ্রাম কলেজে তিন দশকের শিক্ষকতা
কলকাতার উচ্চশিক্ষা শেষে ১৯১৮ সালে যোগেশ চন্দ্র সিংহ চট্টগ্রামে ফিরে আসেন এবং চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের ইংরেজি বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।
এরপর প্রায় ত্রিশ বছর তাঁর জীবন জড়িয়ে থাকে চট্টগ্রাম কলেজের সঙ্গে। ১৯১৮ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানে অধ্যাপনা করেন এবং কর্মজীবনের শেষ পর্যায়ে সহকারী অধ্যক্ষের দায়িত্বও পালন করেন।
তাঁর ক্লাস ছিল প্রচলিত অর্থে শুধু ইংরেজি সাহিত্যের ক্লাস নয়। শেলী, কিটস কিংবা ইংরেজি সাহিত্যের অন্যান্য কবি-সাহিত্যিককে পড়াতে গিয়ে তিনি বাংলা সাহিত্য, রবীন্দ্রনাথ এবং ভারতীয় দর্শনের প্রসঙ্গ টেনে আনতেন। সাহিত্যকে তিনি কোনো নির্দিষ্ট ভাষা বা ভূগোলের মধ্যে আবদ্ধ করে দেখতেন না।
তাঁর কাছে সাহিত্য ছিল মানুষের চিন্তা ও অনুভূতির বৃহত্তর জগৎ।
ফলে ছাত্রদের কাছে তিনি শুধু একজন ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন না; ছিলেন চিন্তার দুয়ার খুলে দেওয়া একজন শিক্ষক।
তাঁর অসাধারণ স্মৃতিশক্তির কথাও ছাত্রদের স্মৃতিচারণে পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘ কবিতা তিনি অনর্গল আবৃত্তি করতে পারতেন। বই পড়া, সাহিত্য নিয়ে ভাবা এবং জ্ঞানচর্চা ছিল তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
দেশভাগের সময়ও চট্টগ্রাম ছিল তাঁর ঠিকানা
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হলো। চট্টগ্রামের সামাজিক বাস্তবতাও বদলে গেল। বহু পরিবার নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেশান্তরী হলো।
কিন্তু যোগেশ চন্দ্র সিংহ চট্টগ্রাম ছাড়লেন না।
যে শহর তাঁকে শিক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে, যে জনপদ তাঁর কর্ম ও চিন্তার ক্ষেত্র হয়েছে, সেই চট্টগ্রামেই তিনি থেকে গেলেন। রহমতগঞ্জের নিজ বাসভবন হয়ে উঠল তাঁর পরবর্তী জীবনের ঠিকানা।
এমনকি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তিনি সপরিবারে চট্টগ্রামেই ছিলেন বলে পারিবারিক স্মৃতিচারণে জানা যায়।
তাঁর পরিচয় কোনো একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর ছাত্র, সহকর্মী ও পরিচিতজনদের স্মৃতিতে তিনি ছিলেন উদার, মানবিক ও সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে থাকা একজন মানুষ।
অবসরের পরও অবসর নেননি
১৯৪৮ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিলেন। কিন্তু শিক্ষাবিদ যোগেশ চন্দ্র সিংহের কাছে অবসর মানে জ্ঞানচর্চা থেকে অবসর নয়।
১৯৪৯ সালে চট্টগ্রাম কমার্স কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি সেখানে ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। নবপ্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাঁর অভিজ্ঞতা কাজে লাগে।
এরপর আসে তাঁর জীবনের আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়।
চট্টগ্রামের কর্মজীবী মানুষদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করার প্রয়োজনীয়তা তখন স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। দিনের বেলা যারা চাকরি বা ব্যবসায় ব্যস্ত থাকেন, তাঁদের পক্ষে নিয়মিত কলেজে পড়াশোনা করা সম্ভব ছিল না। এই বাস্তবতা থেকেই নৈশ কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
১৯৫৪ সালে যোগেশ চন্দ্র সিংহ সেই নৈশ কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
এ উদ্যোগের তাৎপর্য ছিল অনেক বড়। শিক্ষা শুধু দিনের বেলায় কলেজে যাওয়ার সুযোগ পাওয়া মানুষের জন্য নয়—জীবিকার পাশাপাশি যারা পড়তে চায়, তাদের জন্যও উচ্চশিক্ষার পথ খুলে দিতে হবে।
পরবর্তীকালে এই প্রতিষ্ঠানই চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের বিকাশের সঙ্গে যুক্ত হয়।
একজন গ্রামের বিদ্যালয়ের শিক্ষা-পরিবেশ উন্নয়নে কাজ করা শিক্ষাবিদ এবার পুরো শহরের কর্মজীবী মানুষের জন্য উচ্চশিক্ষার দরজা খুলে দেওয়ার কাজে নেতৃত্ব দিলেন।
নারীশিক্ষার ক্ষেত্রেও তাঁর পদচিহ্ন
চট্টগ্রামের নারীশিক্ষার ইতিহাসেও যোগেশ চন্দ্র সিংহের নাম গুরুত্বপূর্ণ ভাবে উচ্চারিত হয়।
১৯৫৭ সালে চট্টগ্রামে মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হলে তিনি এর সঙ্গে যুক্ত হন এবং প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সীমিত সুযোগ ও সীমিত শিক্ষার্থী নিয়ে যে প্রতিষ্ঠানটির পথচলা শুরু হয়েছিল, সেটিই পরবর্তীকালে চট্টগ্রামের নারীশিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
আজকের চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজ সেই ঐতিহ্যেরই উত্তরসূরি।
তাঁর কর্মজীবনের দিকে তাকালে তাই একটি বিস্ময়কর ধারাবাহিকতা দেখা যায়—গ্রামের বিদ্যালয়, শহরের কলেজ, কর্মজীবীদের জন্য নৈশ শিক্ষা এবং নারীদের উচ্চশিক্ষা—শিক্ষার প্রায় প্রতিটি স্তরেই তিনি কোনো না কোনোভাবে যুক্ত ছিলেন।
কলমেও ছিল তাঁর আরেকটি জীবন

শ্রেণিকক্ষের বাইরে যোগেশ চন্দ্র সিংহ ছিলেন একজন গভীর মননের লেখক।
ধর্ম, দর্শন, সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিকতা ও সাহিত্য তাঁর লেখার প্রধান বিষয়। মাতৃবন্দনা, মাতৃপ্রশস্তি, পিতৃপূজা, পিতৃতর্পণ, আমার ধর্ম, রাসলীলা, সরস্বতী তত্ত্ব, গীতা বোধিনীসহ বিভিন্ন গ্রন্থে তাঁর চিন্তার পরিচয় পাওয়া যায়।
তবে তাঁর সাহিত্যকর্মের মধ্যে ‘ধ্যানী রবীন্দ্রনাথ’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

রবীন্দ্রনাথকে তিনি শুধু কবি হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন জীবন, মৃত্যু, প্রেম, আত্মা, মানুষ ও সৃষ্টির রহস্য নিয়ে গভীর চিন্তার এক বিশাল জগৎ।
এই কারণেই তাঁর রবীন্দ্রচর্চা ছিল আলাদা। তিনি রবীন্দ্রনাথকে পড়েছেন একজন সাহিত্যিকের পাশাপাশি একজন চিন্তকের দৃষ্টিতে।
তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেও বই ছিল নিত্যসঙ্গী। নিজের পাঠাগারে দীর্ঘ সময় কাটানো, পড়াশোনা করা, লেখা—এসব ছিল তাঁর স্বাভাবিক জীবনযাপন।জীবনের শেষ প্রান্তেও সেই অভ্যাস বদলায়নি।
মৃত্যু এসেছিল সাধনার শেষ প্রান্তে
১৯৭৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর, ৮৯ বছর বয়সে চট্টগ্রামের রহমতগঞ্জের নিজ বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন আচার্য যোগেশ চন্দ্র সিংহ।
তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী জন্মভূমি বাঁশখালীর সাধনপুরেই তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
জীবনের শেষ ঠিকানা আবার ফিরে গেল শুরুর ঠিকানায়।
যে সাধনপুর থেকে তাঁর শিক্ষার যাত্রা শুরু হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেই সাধনপুরের মাটিই তাঁকে আপন করে নিল।
এ যেন একটি পূর্ণ বৃত্ত।
তাঁকে মনে রাখার কারণ কী?
যোগেশ চন্দ্র সিংহকে মনে রাখার অনেক কারণ আছে। তিনি উচ্চশিক্ষিত ছিলেন—এটি একটি কারণ। তিনি দীর্ঘদিন চট্টগ্রাম কলেজে অধ্যাপনা করেছেন—এটি আরেকটি কারণ। তিনি লেখক ছিলেন, রবীন্দ্রচিন্তক ছিলেন, একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন—এসবও তাঁর পরিচয়ের অংশ।
কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় সম্ভবত অন্য কোথাও।
তিনি জ্ঞানকে নিজের মধ্যে আটকে রাখেননি।
নিজের গ্রামের বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ ও পাঠক্রম উন্নয়নে কাজ করেছেন। শহরের কলেজে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে পড়িয়েছেন। কর্মজীবী মানুষের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করেছেন। নারীশিক্ষার প্রসারে কাজ করেছেন। আর জীবনের অবসর সময় ব্যয় করেছেন পড়াশোনা ও লেখালেখিতে।
অর্থাৎ, তাঁর জীবন ছিল জ্ঞান অর্জন এবং জ্ঞান বিতরণের এক দীর্ঘ যাত্রা।

সাধনপুরের সন্তানকে আমরা কতটা মনে রেখেছি?

এই প্রশ্নটিই আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
একজন মানুষ ৮৯ বছর বেঁচে ছিলেন। তাঁর জীবনের প্রায় ছয় দশক কেটেছে শিক্ষা, সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চার সঙ্গে। তাঁর ছাত্ররা পরবর্তীকালে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তাঁর সঙ্গে যুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সময়ের সঙ্গে বড় হয়েছে। তাঁর লেখা আজও গবেষণার বিষয় হতে পারে।
তবু আমাদের স্থানীয় ইতিহাসে এমন মানুষদের অনেক সময় ধীরে ধীরে বিস্মৃতির আড়ালে চলে যেতে দেখি।
আমরা রাস্তার নাম জানি, ভবনের নাম জানি, প্রতিষ্ঠানের নাম জানি; কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর নাম কতজন জানি?
আমরা বড় বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বর্তমান সাফল্য দেখি; কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর শুরুর দিনের সংগ্রাম, স্বপ্ন ও মানুষগুলোর কথা কতটা মনে রাখি?
বানীগ্রাম সাধনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী একদিন চট্টগ্রামের অন্যতম শ্রদ্ধেয় শিক্ষাবিদ হয়েছিলেন। অথচ সেই মানুষটিই আবার নিজের গ্রামের বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সম্পাদক হয়ে প্রায় এক যুগ শিক্ষার পরিবেশ ও পাঠক্রম উন্নয়নে কাজ করেছিলেন—এই ইতিহাস আমাদের নতুন প্রজন্ম কতটা জানে?
সম্ভবত এখানেই আমাদের দায়বদ্ধতা।
কারণ ইতিহাস শুধু রাজা-বাদশাহ, যুদ্ধ কিংবা রাজনৈতিক ঘটনার সমষ্টি নয়। ইতিহাস তৈরি হয় এমন মানুষদের হাতেও, যারা নিঃশব্দে একটি প্রজন্মকে শিক্ষিত করেন, একটি বিদ্যালয়কে এগিয়ে নেন, একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন এবং মানুষের সামনে জ্ঞানের নতুন দরজা খুলে দেন।
আচার্য যোগেশ চন্দ্র সিংহ ছিলেন তেমনই এক নীরব নির্মাতা।
তিনি হয়তো নিজের নামে বড় কোনো স্মৃতিসৌধ রেখে যেতে চাননি। কিন্তু তিনি রেখে গেছেন ছাত্র, প্রতিষ্ঠান, বই এবং চিন্তার উত্তরাধিকার।
আর একজন শিক্ষাবিদের জন্য এর চেয়ে বড় স্মৃতিস্তম্ভ আর কী হতে পারে?
সাধনপুর তাঁকে জন্ম দিয়েছিল। চট্টগ্রাম তাঁকে কর্মক্ষেত্র দিয়েছিল। আর তিনি তাঁর শিক্ষা, মেধা ও মনন দিয়ে দুটোকেই ঋদ্ধ করে গেছেন।
আজ যখন বানীগ্রাম সাধনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা বই হাতে হাঁটে, যখন চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হাজারো তরুণ-তরুণী জ্ঞান অর্জনের স্বপ্ন দেখে, তখন হয়তো খুব কম মানুষই জানে—এই দীর্ঘ শিক্ষাযাত্রার ইতিহাসে একদিন সাধনপুরের এক সন্তান তাঁর নিজের জীবন দিয়ে একটি উজ্জ্বল অধ্যায় লিখে গিয়েছিলেন।
তাঁকে নতুন করে স্মরণ করা তাই শুধু অতীতকে স্মরণ করা নয়।
এটি আমাদের নিজেদের শিকড়কে চিনে নেওয়া।
আচার্য যোগেশ চন্দ্র সিংহের জীবন আমাদের শেখায়—জ্ঞান অর্জনের সর্বোচ্চ সার্থকতা তখনই, যখন সেই জ্ঞানের আলো নিজের শিকড় পর্যন্ত ফিরে যায় এবং অন্যের পথও আলোকিত করে।
সাধনপুরের সেই সন্তান আজ নেই।
কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া আলো নিভে যায়নি।
প্রশ্ন শুধু একটাই—আমরা সেই আলোর কথা কতটা মনে রেখেছি?
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:২২
৮টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

এদেশে এখন শেখ হাসিনা প্রয়োজন- নাকি আমরা তাঁর সময়ের কিছু বাস্তবতাকে নতুন করে অনুভব করছি?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫৭


এদেশে এখন শেখ হাসিনা প্রয়োজন- নাকি আমরা তাঁর সময়ের কিছু বাস্তবতাকে নতুন করে অনুভব করছি?

একটা সময় ছিল- শেখ হাসিনার নাম উচ্চারণ করলেই কারও চোখে ক্ষোভ, কারও মনে শ্রদ্ধা,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মুক্তিযোদ্ধাদের তরুণ প্রজন্ম পছন্দ করে না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:৪৮


২০২৫ সালের ডিসেম্বরের কথা। একদিন মিরপুরে গেলাম, যে স্কুলে পড়েছি সেটার কী অবস্থা দেখতে গেলাম। এখনো কয়েকজন শিক্ষক আমাকে চেনেন। পুরাতন জায়গা বলে একটা টানও ছিল। দীর্ঘ প্রায় ১৫... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার দৃষ্টিতে - 'ব্লগার ওমর খাই-আম' বনাম 'ব্লগার সত্যপথিক শাইয়্যান'

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:৩২



চ্যাটজিপিটিকে আমার এবং ওমর খাই-আমের ব্লগপেইজের লিংক দিয়ে বলেছিলাম মূল্যায়ন করতে। সে আমাদের রেটিং দিয়েছে এরকম -
সত্যপথিক শাইয়্যানঃ 8.0/10, আর ব্লগার ওমর খাই-আমঃ 7.8/10!!!

বিস্তারিত মূল্যায়ন শেষে সে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মহাজগত বিষয়ে আমার গবেষণায় এআই সহায়তা

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৬:৫১





কোন কিছু না থাকা শূন্য অসীম ছিল। কারণ তাতে তাকে সীমা দেওয়ার মত কিছুই ছিল না। সেই শূন্যে কোন কিছু হতে কোন বাধা ছিল না। কে বাধা দিবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

কিসের রিকন্সিলিয়েশন‼️কার সাথে কে চায় এই রিকন্সিলিয়েশন⁉️

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ০৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৭:০০



বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে "রিকন্সিলিয়েশন" বা সমঝোতা-ভিত্তিক রাজনীতি নিয়ে বিতর্কটা অনেক পুরনো, এবং প্রশ্নটা সেই বিতর্কের মূল জায়গায়।

এটা কেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×