somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ধর্মীয় বিধানের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবার অধিকার কার?

২৬ শে মে, ২০১৪ সকাল ৮:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ভারতের কেরালাবাসী এক মুসলমান কোনো কারণে সিদ্ধান্ত নিলেন যে তিনি আহমদিয়া বা কাদিয়ানি মতাদর্শ অনুসারে জীবন যাপন করবেন। কথাটা শোনামাত্র প্রতিবেশীরা তাকে জানিয়ে গেলেন যে তিনি আর মুসলমান পদবাচ্য নন এবং নিজের স্ত্রীর সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তার তালাক হয়ে গেছে, কারণ মুসলমান ও অমুসলমানের মধ্যে বিবাহ অসম্ভব। বিষয়টি আদালতে গড়ালে নিম্ন আদালত ফরিয়াদীকে অমুসলিম বলে রায় দেন। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি পরবর্তীতে উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হলে কেরালা হাইকোর্ট রায় প্রদান করেন যে আহমদিয়া বা কাদিয়ানি সম্প্রদায় অবশ্যই মুসলমান হিসেবে গণ্য হবেন।

দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ-টাউনের একটি আদালতও একটি মামলায় কাদিয়ানিদের মুসলমান হিসেবে ঘোষণা দিয়ে তাদের বিরোধী পক্ষকে সকল মসজিদ, কবরস্থান ইত্যাদি স্থানে কাদিয়ানিদের প্রবেশ ও সেসব স্থান ব্যবহারে তাদেরকে বাধা প্রদান করা থেকে বিরত থাকতে আদেশ দিয়েছে। সুতরাং আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার আহমদিয়া সম্প্রদায় মুসলমান।

পাকিস্তানের প্রায় জন্মলগ্ন থেকেই সে দেশের বিশেষত সুন্নী মুসলমানরা আহমদিয়া সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণা করার জন্য আন্দোলন করতে থাকেন। এ নিয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাও সংঘঠিত হয়েছে বেশ কয়েকবার। শেষ পর্যন্ত ১৯৭৪ সালে সাংবিধানিকভাবে আহমদিয়া সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণা করা হয়। পাকিস্তানের সংবিধানের ২৬০(৩) অনুচ্ছেদে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে - ‘যারা আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস স্থাপন করার সঙ্গে সঙ্গে মুহাম্মদ (সা.) কে চূড়ান্ত এবং সর্বশেষ নবী হিসেবে বিশ্বাস করেন এবং অন্য কাউকে নবী বা ধর্ম-সংস্কারক হিসেবে বিশ্বাস করেন না শুধু তারাই মুসলমান। অন্যদিকে যারা খ্রিষ্টান, হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, পারসিক সম্প্রদায় এবং কাদিয়ানি বা লাহোরি বা আহমদিয়া সম্প্রদায়, বাহাই সম্প্রদায় ও শিডিউল কাস্ট হিসেবে পরিচিত বা তারা নিজেরা সে রকম দাবি করেন তারা সবাই অমুসলিম।’ সুতরাং দেখা যাচ্ছে, ভারতের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে অবস্থান করলে একজন কাদিয়ানি মুসলমান হিসেবে গণ্য হবেন, কিন্তু মানবসৃষ্ট রাষ্ট্র-সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানের ভূমিতে পা রাখা মাত্রই তার মুসলমানিত্ব খারিজ হয়ে যাবে। আরেকটু পশ্চিমে এগিয়ে গিয়ে দক্ষিণ-আফ্রিকায় প্রবেশ করা মাত্র আবার তিনি মুসলমান বলে গণ্য হবেন। এর মানে হচ্ছে, কাদিয়ানি বা আহমদিয়া সম্প্রদায় একই সঙ্গে মুসলিম ও অমুসলিম, কারণ জাতীয়তা বা আবাসস্থল পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের ধর্মীয় পরিচয়েরও পরিবর্তন ঘটে। কোনো লোক কি একই সাথে মুসলিম ও অমুসলিম হতে পারে? মুসলিম হওয়ার শর্ত কি একেক দেশে একেক রকম হতে পারে? যে কোন কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন মানুষ এ বিষয়ে একমত হবেন যে, মুসলিম হওয়ার মাপকাঠি দেশে দেশে ভিন্ন ভিন্ন হওয়ার কথা নয় এবং হওয়া উচিতও নয়। তবুও এহেন অনুচিত এবং অদ্ভুত ঘটনা বাস্তবে কেন ঘটে? এ ধরণের ঘটনা তখনই ঘটে যখন ধর্মীয় বিধি বিধানের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষ রাষ্ট্রের শরণাপন্ন হয়।

রাষ্ট্রের উদ্ভব মানুষের যুথবদ্ধতার সঙ্গে সম্পর্কিত। মানুষ যুথবদ্ধ হয়ে বসবাস করে কোন ধর্মীয় কারণে নয়, জৈবিক অস্তিত্ত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য। আধ্যাত্মিক প্রয়োজন মেটানো রাষ্ট্রের লক্ষ্য নয়। এ বিশেষ প্রয়োজনটি মেটাতে পারে ধর্ম। ধর্মবিশ্বাস ও পরকাল সম্পর্কিত বিষয়গুলোর যে কোন ধরনের বিহিত করার ব্যাপারে রাষ্ট্র একেবারেই অসমর্থ। ধর্মবিশ্বাস যখন তার স্বীকৃতি ও প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রের শরণাপন্ন হয়, তখন রাষ্ট্র-পরিচালকেরা তাঁদের বিবেচনা ও স্বার্থ মোতাবেক কোন একটি মতের পক্ষে বা বিপক্ষে রায় দিতে বাধ্য হন এবং সঙ্গত কারণেই সে রায় একেক রাষ্ট্রে একেক রকম হয়। ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের যুক্তিবোধ অনুযায়ী আহমদিয়া সমপ্রদায় হলো মুসলমানদের মধ্যে একটি উপদল। অন্যদিকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের নীতির্নিধারকদের যুক্তিবোধ আর স্বার্থবোধের যুগপৎ বিচারে তারা মুসলমান বলেই গণ্য নন।

বর্তমানে প্রচলিত প্রধান ধর্মগুলোর উদ্ভবের অনেক পরে রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। যখন রাষ্ট্র ছিল না তখন ধর্মীয় বিধি-বিধানের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মানুষ কীভাবে পেত? ধর্মের বিধানের ব্যাপারে শেষ কথাটি বলার অধিকার কার? ইসলামের বিধান যদি রাষ্ট্রীয় ও সরকারি স্বীকৃতির উপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে কি আল্লাহর কর্তৃত্ত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয় না? কুরআনের বক্তব্য সুস্পষ্ট - ‘যারা দীন (ধর্ম) সম্বন্ধে নানা মতের সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে তাদের কোন দায়িত্ব তোমার নয়; তাদের বিষয় আল্লাহর ইখতিয়ারভুক্ত। আল্লাহ তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে অবহিত করবেন’ (কুরআন ৬:১৫৯)। অর্থাৎ, যারাই ইসলামের ব্যাখ্যার ব্যাপারে মতভেদ তৈরি করে তাঁদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া একমাত্র আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত। ধর্ম বিষয়ে সিদ্ধান্ত প্রদানের জন্য আদালতের শরণাপন্ন হওয়া আল্লাহদ্রোহীতা নয় কি?
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

তোমার মুখের রেখা আঁকতে চেয়েছি।

লিখেছেন জায়েদ হোসাইন লাকী, ০৬ ই নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫০



রাতটি ছিল নিকোটিনে ভেজা
ধোঁয়ার ভেতরে তোমার অবয়ব হঠাৎ উধাও হয়ে গেল
চাঁদ তখন লাল আর ঠিক আমার ফুসফুসের মতোই ক্লান্ত।
তুমি আলো হয়ে রইলে, আমি অবাধ্য আলোর ফসিল

আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছবি ব্লগ - ছোঁয়া

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ০৬ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:১৭

আজ বৃষ্টি তাকে প্রথম ছুঁয়েছে। ওর স্পর্শে তার সমস্ত সত্তা যেন হীরের মত স্বচ্ছ স্ফটিকে ছেয়ে গেছে। বৃষ্টি বলেছে, সে আকাশের কাছে গিয়েছিল। মেঘের কাছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

কলকাতায় নিয়মিত যারা যাতায়ত করেন তারা এই প্রশ্নের মূখোমুখি হবেন প্রায়ই।

লিখেছেন ইমরান আশফাক, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৩৩

আচ্ছা, আপনাদের মধ্যে যারা কলকাতায় যাতায়ত করে থাকেন তারা স্হানীয়দের কাছেকি এই প্রশ্নটির মূখোমুখী হয়েছেন নিয়মিতভাবে: দেশভাগের সময় বাংলাদেশকে দেয়া হয়েছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মুর্শিদাবাদ আর ভারতকে দেয়া হয়েছিলো খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনা কেন কওমী জননী হয়েছিলেন ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ২:২৯


আওয়ামী লীগ করেন এমন অনেক মানুষ বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তি বোধ করেন। শেখ হাসিনা কেন কওমি জননী উপাধি গ্রহণ করলেন? আসলে সবাই যা বলতে চান,আওয়ামী লীগের রাজনীতি তো এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য নির্মূলে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৭


প্রস্তাবিত প্রকল্প: স্বাবলম্বী বাংলাদেশ - দারিদ্র্যমুক্তির নতুন নগর

আমি যদি সরকারের দারিদ্র্য নির্মূল বিভাগের প্রধান হতাম, তাহলে আমার প্রথম লক্ষ্য হতো বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করা ১ কোটি ৭০... ...বাকিটুকু পড়ুন

×