somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বায়োস্কোপ

২৮ শে অক্টোবর, ২০১৫ সকাল ৮:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ফুলি বেগম যেদিন বিয়ের পিঁড়িতে বসলো, সেদিন সে মনে মনে অনিশ্চয়তার দোলাচল আর কিছুটা চাপা উত্তেজনায় চঞ্চল ছিলো। বিয়ের আগে সে বাবুল মিঞাকে পরিবারের অন্যান্য সবার সামনে বসে চাক্ষুষ দেখার আর তার সাথে মাত্র দুই একটা কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলো। দুই একটা কথা আর দুই একবার দৃষ্টি ও হাসি বিনিময় ছাড়া তেমন উল্লেখযোগ্য আর কিছুই ঘটেনি। কন্যা সম্প্রদানের সময় প্রথানুযায়ী বুকফাটা কান্নাকাটির পর সেই যে সে সোজা বাবুল মিঞার ঘরে চলে এলো, তার পর থেকে একবারের জন্যও তার কখনো মনে হয়নি যে সে ভুল ঘরে এসেছে।

ফুলি বেগমের দু’চোখ জুড়ে ছিল কতশত স্বপ্ন! বিধাতা তার অপার করুণায় তার প্রায় সব স্বপ্নই একে একে পূরণ করে দিয়েছেন, এজন্য ফুলি বেগম প্রায়ই একান্তে বিধাতার কাছে চোখের জল ফেলে কৃতজ্ঞতা জানায়। ধীরে ধীরে ফুলি বেগমের সংসারে এক এক করে কয়েকটা সন্তান এলো। ফুলি বেগম একান্ত নিষ্ঠায় হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা দিয়ে সন্তানদের সুসন্তান হিসেবে গড়ে তোলায় ব্রতী হলো। টানাপোড়েনের সংসারটাকে সে পুষ্পকাননের ন্যায় সাজিয়ে রাখতো। সময়ের কাজ সময়মত করতে সে সদা ওষ্ঠাগতপ্রাণ ছিল। বাবুল মিঞাও তার ছোটখাট সখ আহ্লাদগুলোকে যথাসাধ্য মেটাতে কার্পণ্য করতো না।

ফুলি বেগম বিধাতার কাছে আরও কৃতজ্ঞ যে সে জীবনে খুব বেশী অসুখে বিসুখে ভোগেনি, তার স্বামী সন্তানেরাও না। মাঝে সাঝে জ্বর টর হলে সে যথাসাধ্য চেষ্টা করতো আক্রান্তকে কমফোর্ট দিতে। নিজের হলে সে তেমন কিছু চাইতো না। চাওয়ার আগেই সে কিছুটা আহ উহ করেই ভালো হয়ে যেত, আবার দ্রুত সচল হয়ে উঠতো। এমনকি সন্তান প্রসবের সপ্তাহান্তেই সে প্রতিদিনের রুটিন কাজগুলো নিজেই করা শুরু করতো। তার একটা বড় অসুবিধা ছিল যে রান্নাঘরে একাধারে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে কাজ করলে তার পায়ের পেশীগুলো শক্ত হয়ে যেত। সন্তানরা যখন ছোট ছিল, তখন পা টেপাটিপি করার জন্য তাদের ডাক পড়তো। বড় হয়ে যাবার পর আর তাদেরকে ডাকতো না।

একদিন রাতে ফুলি বেগমের পা দুটো ব্যথায় টনটন করছিলো। অগত্যা সে ঘুমকাতুরে বাবুল মিঞাকেই ঘুম থেকে ডেকে জানালো পা ব্যথার কথা। ঘুম ঘুম চোখে বাবুল মিঞা তার পায়ের কাছে বসে বললো “দাও”। এই বলে সে একটা পা তার কোলে নিয়ে টেপা শুরু করলো। আর নিমেষেই ফুলি বেগম নাক ডাকা শুরু করলো। বাবুল মিঞা আস্তে করে পাশে শুয়ে ফুলি বেগমের একটা হাত নিজের মুঠোবন্দী করে চোখ বন্ধ করলো। আর ভাবতে লাগলো, এই হাত সংসারের এত কাজ করে, তবুও কত নরম! এই হাতের কল্যানেই তার আর তার সন্তানদের মুখে ব্যত্যয়হীনভাবে ভাবে উঠে এসেছে অন্ন, বছরের পর বছর। এসব ভাবতে ভাবতে সে সিদ্ধান্ত নিল, পরের দিনই সে ফুলি বেগমকে একটা বড় সারপ্রাইজ দিবে। সে নিজ হাতে তাকে তার প্লেট থেকে তুলে কয়েক নলা অন্ন খাইয়ে দিবে।

এভাবেই দেখতে দেখতে বলতে গেলে প্রায় এক নিঃশ্বাসেই তারা তাদের জীবনের এতটা পথ পাড়ি দিয়ে এলো। আর সবার মতই তাদের মাঝেও টুকটাক ঝগড়াঝাটি হতো, মান অভিমান হতো, আবার অভিমানের ধনুর্ভঙ্গ পণও সামান্য একটু আদরেই ভেঙ্গে পড়তো। যে প্রথম নিজের ভুলটুকু বুঝতে পারতো, সেই অসন্তোষের কালো আঁধারটুকু অপসারণের উদ্যোগ নিত। আজ পরিণত বয়সে এসে ফুলি বেগম আর বাবুল মিঞা অতীতের দিকে তাকিয়ে মাঝে মাঝে একান্তে বিশ্লেষণ করে দেখে, তারা অতীতে বেশী সুখী ছিলো, না এখন! যাচাই করে দেখে, তারা সবার প্রতি এবং পরস্পরের প্রতি তাদের দায়িত্বটুকু ঠিকঠাক মত পালন করেছে তো?

জীবন সমুদ্র পাড়ি দিতে দিতে একান্তে তারা যখন পেছন ফিরে চায়, তারা আশ্বস্ত হয়। যখন সামনে তাকায়, এতদিনের অথৈ সাগরটাকে আর অন্তহীন মনে হয়না। তারা যেন সাগরের তীরটাকে দেখতে পায়। ধীরে ধীরে জীবনতরী এগিয়ে চলে, তারা দু’জনে নাওয়ের দু’প্রান্তে বসা। মাঝে মাঝে তারা প্রান্ত বদল করে দেখে নেয়, কার আসন থেকে সামনের তীরটাকে কেমন দেখা যায়। এতদিন তারা শুধু সামনের পানেই তাকিয়ে থাকতো, আর মাঝে মাঝে ভাবতো, তীর কত দূরে? এখন তীরটা দৃশ্যমান হবার পর পেছনে তাকিয়ে ভাবে, নামতেই কি হবে? পেছনে ফিরে যাওয়া যায়না, আবার একসাথে?


দূরমুঠ, মেলান্দহ, জামালপুর
০৬ জুন ২০১৫
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে অক্টোবর, ২০১৫ রাত ১০:৩৭
৬টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Ripe Age দুই প্রান্তের দুই মানুষঃ সামু শব্দের সেতু প্রজন্মের বন্ধন

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:২৪


একজন দাঁড়িয়ে জীবনের শুরুতে
চোখে তার অগণিত স্বপ্ন
আগামীর পথে কত প্রশ্ন
কত না-জানা, কত বিস্ময়
কত দূরের নীল আকাশ
ডাকে তাকে প্রতিদিন।

অন্যজন বসে জীবনের শেষে নয়
বরং দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসা এক প্রান্তে
প্রায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও তার যতসব অপরাধ।।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:১৫



আজ ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে বলতে গেলে সব মিডিয়াতে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ উঠেছে। উহা দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, সিঙ্গাপুরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ট্রেন টু কক্সবাজার: টিকিট পেলাম না, পেলাম বিকল্প পথের সন্ধান

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:০৭

কক্সবাজার যাওয়ার ইচ্ছে ছিল অনেক দিনের। তবে এবার লক্ষ্য ছিল একটু আলাদা—বাসে নয়, বিমানে নয়; ট্রেনের জানালায় চোখ রেখে সমুদ্রের শহরের পথে যাত্রা। কিন্তু সেই সহজ পরিকল্পনার প্রথম বাধাই হয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জিন্নাহ কি বাঙালি মুসলমানের শত্রু?

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:২৪


মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা বা পাকিস্তানের জাতির জনক। একজন বাংলাদেশী হয়ে পাকিস্তানের জাতির জনককে নিয়ে আলোচনা করলে কি গুনাহ হতে পারে কিংবা বড় ক্ষতি হতে পারে? বাংলাদেশে জিন্নাহর... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেয়ার বাজারকে গতিশীল করতে স্টক ব্রোকারদের নিয়ে বৈঠকে বসছে ডিএসই আজ ১৪-০৯-২০২৬

লিখেছেন কাজী আবু ইউসুফ (রিফাত), ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৭



বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে মন্দার কারণ ও প্রতিকার

ভূমিকা

একটি দেশের অর্থনীতিকে যদি একটি জীবন্ত দেহ হিসেবে কল্পনা করা হয়, তবে তার শেয়ারবাজার অনেকটা হৃদস্পন্দন ও তাপমাত্রা মাপার যন্ত্রের মতো। অর্থনীতির কোথায় প্রাণশক্তি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×