বছর তিনেক আগের কথা। গুলশান-২ থেকে কিছু জরুরী কাজ সেরে বাসায় ফিরছিলাম, বারিধারা ডিওএইচএস এ আমার বাসা। পাকিস্তান হাই কমিশনের কাছ থেকে আটকে পড়লাম এক অস্বাভাবিক যানজটে। এখন যদিও এ জায়গাটায় তেমন বড় যানজট আর খুব একটা হয়না, কিন্তু তখন এটা একটা নিত্যনৈ্মিত্তিক ব্যাপার ছিলো। অস্বস্তিতে ছটফট করছিলাম। হঠাৎ কোথা থেকে কানে ভেসে আসতে শুরু করলো এক বাঁশীর সুর, কোন রাখালিয়া বাঁশুরিয়া যেন প্রাণের দরদ ঢেলে বাজিয়ে চলেছে মরমী পল্লীগীতির সুর। সুরটা কখনো সম্পূর্ণ হতে পারছেনা, একটু পর পর থেমে যাচ্ছে। যতক্ষণ বাঁশী শোনা যাচ্ছিলো, ততক্ষণ যানজটটাকে উপভোগ্য মনে হচ্ছিলো। যখনই থেমে যাচ্ছিলো, তখনই মেজাজটা বিগড়ে যাচ্ছিলো। অনেকক্ষণ আশে পাশে তাকিয়ে খুঁজতে থাকলাম, শহরের পথ বেয়ে আনমনে হেঁটে যাওয়া কাঁধে ঝোলানো ব্যাগে বাঁশী রাখা কোন বাঁশী বিক্রেতাকে। কিন্তু না, তেমন কাউকে চোখে পড়লোনা। কিন্তু বাঁশীর সুরটা থেমে থেমে কানে ভেসেই আসছিলো। সে সুরটা এতটাই আচ্ছন্ন করতে থাকলো যে একটু পরেই তন্দ্রা অনুভব করতে শুরু করলাম। লক্ষ্য করলাম, যখনই সুরটা থামছে, তখনই আমাদের গাড়ীটা একটু করে এগোচ্ছে। আবার যখন সুর শুরু হয়, তখনই সুর শুনে গাড়ীটাও যেন ঘুমিয়ে পড়ে। বুঝতে পারলাম, কোন শ্রান্ত পথিক নয়, আশে পাশের গাড়ীতে বসেই হয়তো কেউ বাঁশী বাজাচ্ছে।
অবশেষে চিহ্নিত করলাম সামনের একটা লাল গাড়ীকে, যেখান থেকে মনে হলো সুরটার উৎপত্তি হচ্ছে। ড্রাইভারকে বললাম, একটু কায়দা করে লাল গাড়ীটার পাশ দিয়ে একটু ওভারটেকের মত করতে, যেন বাঁশুরিয়াকে আমি দেখতে পারি। ততক্ষণে ইউনাইটেড হাসপাতালের ইমার্জেন্সী গেটের কাছে চলে আসাতে ওভারটেক করার মত পরিস্থিতি তৈ্রী হয়েছিলো। ওভারটেকের সময় আমি বাঁ দিকে তাকিয়ে দেখি, আরোহীবিহীন লাল গাড়ীটার ড্রাইভারের বাঁ হাতে একটা বাঁশী ধরা। ওটা ধরেই সে গাড়ী চালাচ্ছিলো। ২৫/৩০ বছরের যুবক, এক ঝলকের দেখা হলেও তার হাস্যোজ্জ্বল মুখটা মনে রাখার মত। চলতে চলতেই গাড়ীর কাঁচটা নামিয়ে আমিও হাসিমাখা মুখে তার দিকে তাকিয়ে বাঁশীর সুরের এ্যপ্রিশিয়েট করলাম, থাম্বস আপ দেখালাম। সেও হেসে একনলেজ করলো।
নগরীর রাজপথে যানজট আক্রান্ত এ চালকের শৈল্পিক অনুরাগ আমাকে মুগ্ধ করেছিলো। যার কানের হেডফোনে বাজার কথা ‘শীলা কি জওয়ানী’ আর মুখে থাকার কথা জ্বলন্ত সিগারেট, তার মনে বাজছে মরমিয়া সুর আর ঠোঁটে ধরা বাঁশী, বৈপরীত্যের এ চমৎকার স্মৃতিটার কথা কেন জানি আজ হঠাৎ করে মনে পড়লো। রাত জেগে আর্মী স্টেডিয়ামে বসে বহু বিলাসী আয়োজন করে বাজানো চৌরাসিয়ার বাঁশীর সুর আর পথ চলতে চলতে শোনা এই অচেনা বাঁশুরিয়ার সুর, পরিবেশ পরিচিতির বৈপরীত্য থাকলেও এ দুটোর আবেদনে তেমন একটা ইতর বিশেষ ছিল না।
ঢাকা
১৭ ডিসেম্বর ২০১৫
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে ডিসেম্বর, ২০২৩ বিকাল ৪:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




