somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রেম, প্রকৃতি আর প্রার্থনার কথা...

২৯ শে জানুয়ারি, ২০১৭ দুপুর ২:৩২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রেম, প্রকৃতি আর প্রার্থনা- আমার চিরদিনের প্রিয় বিষয়, ছোটবেলা থেকেই। প্রশ্ন আসতে পারে, ছোটবেলায় আবার প্রেমের কী বুঝতাম? তখন প্রেম বলতে বুঝতাম স্নেহ, আদর, ভালবাসা। মা যখন শীত আসার আগেই উলের বল আর উল বুননের কাঁটা যোগাড় করে রাখতেন, আর তাঁর স্বল্প অবসরে দিনের পর দিন ধরে উল বুনে আমাদের জন্য সোয়েটার, মাফলার ইত্যাদি বানিয়ে দিতেন, বুঝতাম সেটা ভালবাসা। গোসলের পর মাথা না আঁচড়িয়ে থাকতাম। বড়বোন যখন ডেকে জোর করে মাথা আঁচড়িয়ে দিতেন, বুঝতাম সেটা আদর। পোষা মুরগীটা যখন প্রথম মা হলো, তার তুলতুলে বাচ্চা ধরতে গিয়ে হাতে আঁচড় খেয়েছিলাম। কিছুটা রাগ হলেও বুঝেছিলাম, এটাই মাতৃ্ত্ব, মাতৃস্নেহ। সন্তানের জীবন রক্ষার্থে সে নিজের জীবন বিপন্ন করতে পিছপা হবে না। অন্যদিন হলে সে আমাকে দেখে ভয়ে দৌড়াতো, আজ আমাকে দেখে ধেয়ে এলো।

বয়ঃসন্ধিকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত “পোস্টমাস্টার” গল্পটা পড়ে আমি খুবই অভিভূত হয়েছিলাম। পড়তে পড়তে প্রায় মুখস্থের মতই হয়ে গিয়েছিলো। আজও পড়ি, এটা আজও আমার পড়া অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প। সেটা পড়ে বুঝেছিলাম স্নেহ কি, মায়া কি, ভালবাসা কি, বিরহ কি, বিচ্ছেদ কি। “কিন্তু তখন পালে বাতাস পাইয়াছে...” – এই বাক্যাংশটুকু এবং সেই সাথে পোস্টমাস্টারের হৃদয় মথিত স্বগতোক্তি ও লেখকের দার্শনিক ভাবনার ক্রমবিন্যাস এখনো আমার মনে ঝড় তোলে আর যখনি সে ঝড় ওঠে তখনই মনটা শন শন বাতাসের মতই হু হু করে ওঠে।

আমার কাছে স্নেহ মায়ার আরেক নাম প্রকৃতি। ঢাকা শহরে মানুষ হলেও বৎসরান্তে গ্রামের বাড়ীতে যেতাম। সেখানে উন্মুক্ত প্রকৃতির সাথে আমার পরিচয় হয়েছিলো। কাজিনদের সাথে দিনমন ঘুরে বেড়াতাম আর কিছুকাল শৃঙ্খলিত শহুরে জীবন ছেড়ে শাসনহীন বাউন্ডুলে জীবন উপভোগ করতাম। রাখালের সাথে গরু চড়াতে যেতাম, বাবুই পাখির বাসা দেখে বিস্মিত হ’তাম, কৃষাণ কৃষাণীর সাথে গান গেয়ে মরিচ ক্ষেত থেকে মরিচ তুলতাম, কাঁচা কুঁয়ো থেকে পানি তুলে পরমানন্দে তামাক ক্ষেত সিঞ্চন করতাম। খেঁক শেয়ালের গর্ত খুঁজতাম, গুলতি দিয়ে পাখি মারার চেষ্টা করতাম। প্রকৃতির পশু পাখিদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান দেখে অবাক হতাম। খুব ভোরে অন্ধকার বিছানায় শুয়ে পাশের ঘর থেকে আমার বড় নানার দরাজ কন্ঠে ভেসে আসা ফজরের নামাজের সুরা ক্বিরাত শুনতে শুনতে আবার ঘুমিয়ে পড়তাম। রসিক নানা আমার সুন্দর করে সুরা ক্বিরাত পাঠ করতেন, আবার পরে যখন আমাদের সাথে গল্প করতেন, তখন কোমড় দুলিয়ে নজরুলের “চমকে চমকে ধীর ভীরু পায় পল্লীবালিকা বনপথে যায়” গানটি নৃত্য সহকারে গেয়ে শোনাতেন। ধর্ম ও সংস্কৃতি, দুটোকেই তিনি নিষ্ঠার সাথে ধারণ করতেন। নানাবাড়িতে সারাদিন আমি মনের আনন্দে গ্রামের মাঠে ঘাটে তরুতলে ঘুরে বেড়াতাম আর এ কবিতার কথাগুলোর কথা মনে করতামঃ “আমাদের গ্রামখানি ছবির মতন, মাটির তলায় এর ছড়ানো রতন। মাঠ ভরা ধান চাল, জল ভরা দীঘি, চাঁদের কিরণ লাগে করে ঝিকিমিকি”।

আমার আবেগ অনুভূতি আমাকে খুব আন্দোলিত করে যখন আমি প্রার্থনায় মনোনিবেশ করি। আমি অন্তর থেকে অনুভব করি আমার স্রষ্টা আমাকে খুব ভালবাসেন। এমন অনেকদিন গেছে যখন স্রষ্টার এ অপার ভালবাসার কথা ভেবে অশ্রু গড়িয়ে পড়েছে জায়নামাযে, রাতে বালিশে। আমার মতে প্রার্থনাও ভালবাসারই রূপান্তর। স্রষ্টাকে ভালবেসে যখন প্রার্থনা করতে পারি, তার পর থেকে অনেকদিন পর্যন্ত নিজেকে অনেক পরিশুদ্ধ মনে হয়। প্রার্থনায় নিজের কথা আসে, ভালবাসার মানুষের কথা আসে, রক্তের বাঁধনে বাঁধা মানুষের কথা আসে, এমনকি কখনো কখনো কোন বাঁধন নেই- এমন মানুষের কথাও আসে। প্রার্থনার সাথে আমি প্রেম খুঁজে পাই। প্রেমের মাঝেও প্রার্থনা উহ্য থাকে।

প্রেম, প্রকৃতি আর প্রার্থনার আমার এ ভাবনাগুলো, অনুভূতিগুলো, বিশ্বাসগুলো সম্পূর্ণই আমার। তবু এগুলো পড়ে যদি কোন পাঠক তার নিজের ভাবনার সাথে কিছু মিল খুঁজে পান, তাহলে ভাববো, লেখকের আর পাঠকের মাঝে এক অদৃশ্য যোগসূত্র তো থাকতেই পারে।



ঢাকা
২৯ জানুয়ারী ২০১৭
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে জানুয়ারি, ২০২৩ দুপুর ১২:৫২
২০টি মন্তব্য ২২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রবীন্দ্রনাথের নামে কত শত অভিযোগ

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:০৫


*রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাকি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা চুরি করে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন! বাস্তবতা হলো, রবীন্দ্রনাথ যখন নোবেল পান, নজরুল তখন লেখালেখেই শুরুই করেননি। তাঁর বয়স সবে ১৪ ছিল।

প্রাপ্ত বয়সে নজরুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাটায় - পুটায় ঘষাঘষি, মাঝখানে মরিচদের জীবন শেষ?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৩১

আওয়ামী তথা ভারতীয়দের নমস্য রবী বাবুর চিত্রে কালিমা লেপন।
দুই দিন পরে, আওয়ামী বিরোধীদের 'রবী' ইউনুস সাহেবকে গালাগালি!!!
এ যেন পাটাপুটায় ঘষাঘষি করে অভাগা মরিচদের জীবন শেষ করার চেষ্টা?
কিন্তু, রবী বাবু কিংবা... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতা প্রেমিকদের কলমে সময়ের বিবেক : বিশ্ব কবি রবিন্দ্র নাথ ঠাকুরের গ্রাফিতেতে কালী লেপন প্রসঙ্গ

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৫:৩৪


যে কবির গানে ভোরের আকাশ জেগে ওঠে প্রতিদিন
যাঁর সুরে আজও অশ্রু ঝরে হাসে হৃদয় রঙিন
সেই রবীন্দ্রনাথের ছবির বুকে কালি মাখায় যারা
তারা কি জানে তাঁরই গানে বাঙালির প্রাণের... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাসূল (সা.), আহলে বাইত ও সাহাবায়ে কেরামের (রা.) অনুচিত কাজের সমালোচনা ও সমর্থন করা যাবে না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৫:৪১




সূরাঃ ৮ আনফাল, ৬৭ থেকে ৬৯ নং আয়াতের অনুবাদ-
৬৭।দেশে ব্যাপকভাবে শত্রুকে পরাভূত না করা পর্যন্ত বন্দী রাখা কোন নবির উচিত নয়। তোমরা পার্থিব সম্পদ কামনা কর। আল্লাহ চান... ...বাকিটুকু পড়ুন

রঠার মুসলিম বিদ্বেষ

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:১৮



রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর সংক্ষেপে রঠা এর ছোট গল্প "রীতিমত নভেল" এ রঠা মুসলমান শব্দের সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করেছেন ‘যবন’। যবন অর্থ অসভ্য, ম্লেচ্ছ, অপবিত্র, বর্বর জাতি, যেকোনো বিদেশি ইত্যাদি ইত্যাদি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×