somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ক্ষণিকের দেখা- ৪

২৮ শে জানুয়ারি, ২০২১ রাত ৯:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এ পর্বে আমি যে দুটো ‘ক্ষণিকের দেখা’ স্মৃতি রোমন্থন করবো, তার প্রথমটি একটি দৃশ্যের, আর পরেরটি একটি (মানুষের) মুখের। অবশ্য প্রথমটি শুধুমাত্র একটি দৃশ্যের হলেও, তার পেছনে ছিল একটি অদেখা, কল্পিত মুখও।

সে বহুদিন আগের কথা। আমার বয়স তখন পঁচিশ-ত্রিশের মাঝামাঝি, আমি সেনাবাহিনীর একজন তরুণ অফিসার। ডিসেম্বর-জানুয়ারী মাসে সেনাবাহিনীর বাৎসরিক শীতকালীন যৌথ প্রশিক্ষণ অনুশীলন হয়ে থাকে। এ দুটো মাসে চেষ্টা করা হয়ে থাকে, সেনাবাহিনীর ব্যাটালিয়ন/ইউনিট গুলোতে যেন সর্বোচ্চ সংখ্যক অফিসার উপস্থিত থেকে অনুশীলনে অংশ নিতে পারেন। তাই ঐ সময়টাতে ইউনিটের বাইরে যারা নিয়োগপ্রাপ্ত থাকেন, তাদেরকেও ইউনিটে সাময়িকভাবে হলেও ফিরিয়ে আনা হয়ে থাকে। তখন আমি ঢাকার স্টাফ কলেজে কনিষ্ঠতম স্টাফ অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলাম। এমনিতেই বদলি’র সময় হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু শীতকালীন যৌথ প্রশিক্ষণ অনুশীলনে অংশগ্রহণের বাধ্যবাধকতার কারণে সময়টা কয়েকমাস এগিয়ে আনা হয়েছিল। ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে একদিন বদলিকালীন ‘জয়েনিং টাইম’ তথা ছুটি ছাটা ব্যতিরেকেই ৪৮ ঘন্টার নোটিশে বগুড়ার একটি ইউনিটে যোগদান করলাম। যোগদানের কিছুদিন পরেই শীতকালীন যৌথ প্রশিক্ষণ শুরু হলো। একটি কোম্পানীর অধিনায়ক হিসেবে অনুশীলন শুরুর প্রথম সকালে আমি ব্যাটালিয়নের সাথে বের হই। তখন নিয়ম ছিল অনুশীলনের শুরুতে কিছুদিন কোম্পানীগুলো নিজ ব্যাটালিয়নের সাথে থাকবে, তারপর তারা যেসব ব্রিগেডকে সাপোর্ট দেবে, তাদের এলাকায় চলে যাবে।

বগুড়া-রংপুর মহাসড়কের ‘মোকামতলা’ ওয়াই জাংশনের জিরো পয়েন্ট থেকে যে রাস্তাটা পশ্চিমে জয়পুরহাট চলে গিয়েছে, সে রাস্তা ধরে ঠিক ৩ কিমি মাইলপোস্টের উত্তর পার্শ্বে ছিল আমাদের অনুশীলন এলাকা। তারই পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছিল ‘উথলি’ নামের একটা ছোট্ট নদী। শুধু নামটার কারণেই সে শীর্ণ নদীটাকে ভালবেসেছিলাম। ঐ এলাকাটা হলুদ চাষের জন্য বিখ্যাত ছিল। হলুদ তোলা হয়ে গেছে, এমন কিছু ক্ষেতের একটি কোণায় স্থাপন করা হয়েছিল আমার কোম্পানীর তাঁবু। আমার তাঁবু থেকে মোকামতলা-জয়পুরহাট সড়কে চলাচলরত মানুষ ও যানবাহনগুলোকে স্পষ্ট দেখা যেত। প্রতিদিন পড়ন্ত বিকেলে ঢাকা থেকে জয়পুরহাটগামী বিআরটিসি’র সদ্য আমদানিকৃত একটা চিকন জাপানি মিৎসুবিশি কোচ আমাদের এলাকাটি অতিক্রম করতো। তখন ঐ কোচগুলোই ছিল লেটেস্ট মডেলের এবং রাজধানীতে সেগুলোর কয়েকটাকে রেখে বাকিগুলোকে দূরপাল্লার জেলা শহরগুলোতে চলাচলের জন্য নিয়োগ করা হয়েছিল। সেই কোচটা আগের দিন বিকেলে আমাদের এলাকা অতিক্রম করে জয়পুরহাট যেত, আবার পরেরদিন সকালে জয়পুরহাট থেকে ঢাকা যাবার সময় আমাদের এলাকা পার হতো। একদিন বিকেলে অযথাই সড়কটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম লক্ষ্যহীনভাবে। হঠাৎ করেই নজরে এলো, চলন্ত বাসের জানালা দিয়ে এক বেখেয়ালি রমণীর রঙিন ওড়নাটা পতপত করে উড়ছে। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের একটি দৃশ্য, কিন্তু সেটি ছিল বড় মনোরম। উড়ন্ত রঙিন কাপড়টাকে মনে হয়েছিল সুখের একটি প্রতীকী পতাকা, যেটি ছুটে চলেছিল একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে। মনের অজান্তেই অদেখা পতাকাবাহকের একটি কল্পিত অবয়ব আঁকা হয়েছিল। আর সেই আসন্ন সন্ধ্যায় গুণগুণ করে গেয়ে উঠেছিলাম, ‘হাওয়া মে উড়তা যায়ে......’!

এর কয়েক সপ্তাহ পরের কথা। এলাকাটি তখন পরিচিত হয়ে গেছে হাতের তালুর মত, এলাকার কিছু মানুষের সাথেও টুকরো আলাপচারিতায় সখ্য গড়ে উঠেছিল, এবং তাদের প্রতি একটু মায়াও জন্মেছিল। তারা মাঝে মাঝে এসে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের সুখ দুঃখের কথা জানাতো। এলাকাটির মানুষজন খুব দরিদ্র ছিল। অনতিদূরে ছিল ‘কিচক’ নামের একটি ব্যবসাকেন্দ্র ভিত্তিক এলাকা। সে এলাকার লোকজন ছিল অবশ্য স্বচ্ছল, অবস্থাপন্ন গেরস্ত অথবা চালু ব্যবসায়ী। কাকতালীয় ভাবে একদিন বিশাল উঠান ও বেশ বড় বড় কয়েকটি ঘরসহ একটি অবস্থাপন্ন গেরস্তবাড়ীর সম্মুখ দিয়ে যাবার সময় জানতে পারি, সেটা ছিল আমারই এক সতীর্থের বাড়ী। তখনো বাংলাদেশে সাপ্তাহিক ছুটি ছিল একদিন, এবং সেটা ছিল রবিবারে। একদিন শনিবার বিকেল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন শেষে একটি জররি কারণে একদিনের ছুটি নিয়ে রংপুর গিয়েছিলাম। রবিবার রাত দশটার মধ্যে ফিরে এসে পরদিন থেকে আবার দায়িত্ব পালন শুরু করার কথা। তখন শীতের রাতে মফস্বল এলাকায় রাত আটটার মধ্যেই সবকিছু শুনশান হয়ে যেত। একদিনের ছুটি কাটিয়ে রবিবার রাত সাড়ে ন’টার দিকে আমি যখন মোকামতলা বাস স্ট্যান্ডে এসে নামলাম, তখন সেখানে মাত্র দুই একটা রিক্সা ছিল, যারা ‘উথলি’ পর্যন্ত যাবে। আমি একটা রিক্সা ঠিক করে তাতে উঠে বসলাম, ঠিক তখনই একজন বয়স্ক লোক (পঞ্চাশোর্ধ্ব তো হবেই) রিক্সার পাশে এসে কাচুমাচু করতে লাগলো। রিক্সাওয়ালা আমাকে বললো, ‘স্যার এই মুরুব্বী অনেকক্ষণ ধরে ‘শেয়ারে’ উথলি যাবার জন্য রিক্সা খুঁজছেন, কিন্তু তিনি কোন সঙ্গী পান নাই বলে যেতে পারছেন না’। অর্থাৎ পুরো রিক্সাভাড়া মেটানোর সামর্থ্য বা সুযোগ তার ছিল না। আমি তাকে সানন্দে পাশে তুলে নিলাম। টুকটাক আলাপে জানলাম, আমি যেখানে নামবো, তিনি তার সামান্য একটু দূরেই নামবেন। আমি নামবো নদীর এপারে, আর উনি নামবেন ওপারে। নদী পার হয়েই রাস্তার পাশে একটি বাঁশ ঝাড়ের মধ্যে তার বাসা। সেখানে তিনি কোনমতে একটি খুপড়ি বানিয়ে তার স্ত্রীসহ থাকেন। তারা উভয়ে রাতকানা, তাই রাতের আঁধারে তাদের চলতে ফিরতে অসুবিধে হয়। নইলে সামান্য ৩/৪ কিমি পথ হাঁটা তার জন্য কিছু নয়, দিন হলে উনি হেঁটেই বাড়ী ফিরতে পারতেন। তিনি ও তার স্ত্রী দু’জনে মিলে বাঁশ কিনে সেগুলো কেটে কেটে ডালি, টুকরি, চাই (মাছ ধরার ফাঁদ) ইত্যাদি বানিয়ে মোকামতলা হাটে বিক্রয় করেন, এ দিয়েই তাদের দু’জনার সংসার চলে যায়।

কথা বলতে বলতে আমি আমার গন্তব্যে, অর্থাৎ উথলি নদীর পূর্বপ্রান্তে পৌঁছে গেলাম। আমি আগে নামবো, তারপর উনি। নদীর উপর একটি ‘বেইলী ব্রীজ’, তার ওপাশেই আমার এই ক্ষণিকের সাথী নেমে যাবেন। আমি যখন নামি, তখন ব্রীজের ওপার থেকে একটা ট্রাক আসছে। ট্রাকের তীব্র আলো আমাদের চোখে এসে পড়লো। সে আলোতে এই প্রথম আমি সেই বৃ্দ্ধের মুখাবয়ব স্পষ্টভাবে দেখতে পেলাম। মাথায় উস্কো খুস্কো সাদা চুল, সবুজ লুঙ্গি আর সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত, চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। আমি রিক্সাওয়ালার নির্ধারিত ভাড়ার কিছুটা অতিরিক্ত মিটিয়ে দিয়ে তাকে বললাম, ‘খুব সাবধানে তাকে নামিয়ে দিবেন, সম্ভব হলে তার বাড়ী পর্যন্ত পৌঁছে দিবেন’। কিছুটা অতিরিক্ত ভাড়া পেয়ে রিক্সাওয়ালাও অনুপ্রাণিত হয়ে বললো, ‘স্যার আপনি চিন্তা করবেন না, আমি তাকে ঠিকই বাড়ী পৌঁছে দেব’। তারপর আলো আঁধারে পকেট হাতড়ে দেখলাম, পকেটে যা অবশিষ্ট আছে, তা দিয়ে মুরুব্বী অন্ততঃ এক মাসের কাঁচামাল অর্থাৎ বাঁশ কিনতে পারবেন। সমুদয় অর্থ তার হাতে গুঁজে দিয়ে মুরুব্বিকে বললাম, ‘এর পরে চেষ্টা করবেন, সন্ধ্যা নামার আগেই বাড়ী ফিরে আসতে’। এ অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তিতে তার চোখে মুখে বিস্ময় ফুটে উঠলো, তার সে বিস্ময় দেখে আমার মুখে তৃপ্তির হাসি। একটা স্বর্গীয় অনুভূতি নিয়ে আমি অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে চেনা আ’ল ধরে আমার তাঁবুতে ফিরে এলাম। আলো না জ্বালিয়েই, হাতমুখ ধুয়ে মাটির বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। তাঁবুর একটি ফাঁক দিয়ে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে পথের ক্লান্তি নিয়ে নিমেষেই ঘুমিয়ে পড়লাম।

“আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে,
আমার মুক্তি ধুলায় ধুলায় ঘাসে ঘাসে॥
দেহ মনের সুদূর পারে হারিয়ে ফেলি আপনারে,
গানের সুরে আমার মুক্তি উর্ধ্বে ভাসে॥
আমার মুক্তি সর্বজনের মনের মাঝে,
দুঃখ বিপদ তুচ্ছ করা কঠিন কাজে।
বিশ্বধাতার যজ্ঞশালা, আত্মহোমের বহ্নি জ্বালা
জীবন যেন দিই আহুতি মুক্তি আশে”॥


ঢাকা
২০ জানুয়ারী ২০২১
শব্দসংখ্যাঃ ৯৮৩
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে জানুয়ারি, ২০২১ রাত ৯:০৩
২২টি মন্তব্য ২২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

হন্টেড হোটেল : বেনফ স্প্রিংস হোটেল,কানাডা

লিখেছেন নাফি ইমতি, ২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ রাত ৮:৪৫

ব্যানফ স্প্রিংস হোটেল, কানাডার আলবার্টাতে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক হোটেল। অনেকেই বিশ্বাস করেন ১৮৮৮ সালে নির্মিত এই হোটেলটি ভুতুড়ে। বছরের পর বছর ধরে, কর্মচারী এবং অতিথিরা অস্বাভাবিক ভৌতিক ঘটনার কথা জানিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মকিম গাজী ভাই

লিখেছেন কুশন, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ রাত ২:০৪



আমি এখন বাফেলো শহরে থাকি।
আমেরিকার সেরা দশ শহরের তালিকার শীর্ষে রয়েছে বাফেলো। এখানে হালাল মার্কেট, হালাল রেস্তোরাঁ আর অনেক মসজিদ। এই শহরে বাঙ্গালীদের অভাব নেই। অনেক বাঙ্গালীকে লুঙ্গি... ...বাকিটুকু পড়ুন

কোলকাতার একটি দৈনিকে একটি বিজ্ঞাপনঃ

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ ভোর ৬:০৫

কোলকাতার একটি দৈনিকে একটি বিজ্ঞাপনঃ

“আমি ৭০ বছরের একলা মানুষ। তবে এখনো সক্ষম, নিজের সব কাজ, বাজার হাট, রান্নাবান্না ও নিজের দেখাশোনাটাও নিজেই করতে পারি। তেমন কোন রোগব্যাধিও নেই। অবসরপ্রাপ্ত, মাসিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

খুচরো ব্লগিং চারঃ এ চাইল্ডস লজিক

লিখেছেন অপু তানভীর, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ সকাল ১০:৫৮



কয়েক দিন আগে অনলাইনে দেখা একটা একটা ফানি ভিডিওর কথা মনে পড়লো । সেখানে দেখা যায় একজন স্ত্রী তার স্বামীর কাছে জানতে চাইছে, আচ্ছা হানি, যদি আমি মোটা হয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ষ্টেশন ভাগাভাগি' র গল্প

লিখেছেন মনিরা সুলতানা, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ দুপুর ১২:০৯


শৈশব থেকে পথ হারিয়েছি বহুবার, তবুও আশ্চর্য এক কারনে নতুন পথের সন্ধানে নামতে হয় বারংবার। খেলার সাথী বন্ধুমহল কিংবা অগ্রজ অনেকেই বেশ নির্ভার থাকেন আমার দেখানো পথে। তাদের ভাবনায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×