somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি চোর হলাম বটে

০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ২:০২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আজ সকালে চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন কলিমুদ্দিন দফাদার। পাশের টেবিলে কয়েকজন ব্যবসায়ী নির্বাচন নিয়ে কথা বলছিলেন। তাদের মুখে উদ্বেগ দেখে তিনি বুঝলেন, এটাই তার নিজের মনের প্রতিধ্বনি। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন; মাত্র কয়েকদিন বাকি। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন: সত্যিই কি নির্বাচন হবে? আর হলেও, নির্বাচিত সরকার কি কিছু করার সুযোগ পাবে? গত কয়েক সপ্তাহে কলিমুদ্দিন যা দেখছেন, তাতে এই প্রশ্নগুলো অমূলক মনে হয় না। অন্তর্বর্তী সরকার শেষ মুহূর্তে একের পর এক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যেন সবকিছু করে ফেলতে চায়। এর বোঝা পড়বে নতুন সরকারের ঘাড়ে।

প্রথমে বেতন কাঠামো। নবম জাতীয় বেতন কমিশন সুপারিশ করেছে বর্তমান বেতনের দ্বিগুণেরও বেশি। সাড়ে তের লাখ সরকারি কর্মচারীর জন্য এতে অতিরিক্ত এক লাখ কোটি টাকারও বেশি লাগবে। কিন্তু উপদেষ্টা বলছেন, প্রতিবেদন গ্রহণ মানেই বাস্তবায়ন নয়, এবং স্বল্প সময়ে তারা করবেন না। তাহলে এই আর্থিক চাপ কে সামলাবে? স্পষ্টতই নতুন সরকার।

একইভাবে, সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা। পনেরোটি কর্মসূচিতে ভাতা বাড়ানো হচ্ছে ৫০ থেকে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত, নতুন সুবিধাভোগী যুক্ত হচ্ছে সাড়ে এগারো লাখ। ভালো উদ্যোগ, কিন্তু এর বোঝাও কি নতুন সরকারের জন্য রেখে যাওয়া হচ্ছে? বিশেষ করে, সাধারণ ভাতা তিন অঙ্কে উন্নীত হলেও, কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে হাজারের ঘরে বাড়ানো হচ্ছে।

পদোন্নতি ও নিয়োগের কথা। নির্বাচনের কয়েকদিন আগে অতিরিক্ত সচিবের ২১২ স্থায়ী পদের বিপরীতে ২৫৫ জন থাকা সত্ত্বেও নতুন ১১৮ জনকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে—নির্বাচন কমিশন উপেক্ষা করে। একইসঙ্গে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাড়ে চৌদ্দ হাজার শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া তড়িঘড়ি করে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। দশ লাখ আবেদনকারীর পরীক্ষা রেকর্ড সময়ে শেষ করে নির্বাচনের আগেই নিয়োগপত্র দেওয়ার তাগিদ কেন?

আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো আরও জটিল। নির্বাচনের ছয় দিন আগে জাপানের সাথে অর্থনৈতিক অংশীদারী চুক্তি, তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য চুক্তি। এর আওতায় বাংলাদেশ বোয়িং থেকে ২৫টি বিমান কিনবে (খরচ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা), যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১.৫ বিলিয়ন ডলার আমদানি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি, এবং দীর্ঘমেয়াদি গম, জ্বালানি তেল, এলএনজি আমদানি। এত বড় চুক্তি, যা অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে, নির্বাচনের আগে স্বাক্ষর করা কি উচিত? নির্বাচিত সরকার যদি এগুলোকে অস্বার্থক মনে করে, তাহলে কি বেরিয়ে আসতে পারবে?

সবচেয়ে বিস্ময়কর চট্টগ্রাম বন্দর। নির্বাচনের এগারো দিন আগে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (বন্দরের ৬০% আয়ের উৎস) দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে হস্তান্তর। এটি ২০০১ সালে নির্মাণ শুরু হয়, বন্দর কর্তৃপক্ষের ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে। ২০০৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১ কোটি ১৮ লাখ ৬৩ হাজার কনটেইনার হ্যান্ডল করা হয়েছে; যন্ত্রপাতি দিয়ে আরও ১৫ বছর চালানো সম্ভব। আওয়ামী লীগ সরকার শুরু করলেও, জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার এগিয়ে নিচ্ছে। বন্দর শ্রমিকরা দেড় বছর ধরে আন্দোলন করছেন, সব রাজনৈতিক দল বিরোধিতা করেছে, মামলা বিচারাধীন—কিন্তু সরকার উপেক্ষা করে চুক্তি করতে মরিয়া। শর্তগুলো গোপন; চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক বলেছেন, লুকোচুরি থাকলে সন্দেহ থাকবেই। শ্রমিকরা ধর্মঘট ডেকেছেন, বলছেন এটি দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য আত্মঘাতী।

সব মিলিয়ে, অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচিত সরকারের হাত বাঁধছে: এক লাখ কোটি টাকার বেতন, হাজার হাজার নিয়োগ-পদোন্নতি, ৫০ হাজার কোটি টাকার বোয়িং চুক্তি, দীর্ঘমেয়াদি আমদানি, জাতীয় সম্পদ হস্তান্তর। জুলাই সনদে বলা হয়েছিল, সর্বদলীয় আলোচনা ছাড়া বিদেশি চুক্তি নয়—কিন্তু কোথায় সেটা? সংস্কারের কথা বলে তারা নিজেরাই মানছেন না: গোপন চুক্তি, জনমত উপেক্ষা, সংসদের অধিকার কেড়ে নেওয়া।

কেন এত তাড়া? নির্বাচিত সরকারের জন্য অপেক্ষা করা যেত না? তাদের জবাবদিহিতা জনগণের কাছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের নেই। স্বচ্ছতার অভাব—বোয়িং, চট্টগ্রাম বন্দর, যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির শর্ত পরিষ্কার নয়। ইতিহাস বলে, রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই পরিকল্পনা বদলায়। তাহলে এই চুক্তিগুলো কি নির্বাচিত সরকার বাতিল করতে পারবে, নাকি হাত বাঁধা পড়বে?

কলিমুদ্দিন মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব রুটিন কাজ চালানো এবং সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন। সংস্কার বিশেষজ্ঞদের হাতে রেখে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা উচিত ছিল। কিন্তু তারা নতুন সরকারের জন্য এমন পরিস্থিতি তৈরি করছেন যাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ কম।

হয়তো এসব দেশের স্বার্থে। কিন্তু যতক্ষণ স্বচ্ছতা না আসে, শর্ত প্রকাশ না হয়, তাড়াহুড়োর কারণ পরিষ্কার না হয় তবে সন্দেহ থাকবে। সন্দেহ থেকে অবিশ্বাস জন্মায়, যা গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় হুমকি। কলিমুদ্দিন নির্বাচনের অপেক্ষায়, কিন্তু সাথে এই প্রশ্নগুলোর উত্তরও চান। কারণ সুষ্ঠু নির্বাচন শুধু ভোট নয়, জনগণের স্বার্থে কাজ করার পূর্ণ সুযোগ দেওয়া। নির্বাচনের আগে হাত বেঁধে দিলে তার অর্থ কী?
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ২:০৯
৭টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কৌশল

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ০১ লা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:২৮

জামায়াতের আমীরের এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেল থেকে কর্মজীবী নারীর সঙ্গে বেশ্যাবৃত্তির সম্পর্ক টেনে আনা পোস্টটি হ্যাকড হোক বা অ-হ্যাকড—এর রাজনৈতিক প্রভাব মোটেও একমুখী নয়। অনেকেই ধরে নিচ্ছেন, এতে জামায়াতের ক্ষতিই... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্ম, রাজনীতি ও “বেহেস্তের টিকিট”: ভণ্ডামির চূড়ান্ত রূপ।

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ০১ লা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ২:৩২

ধর্ম, রাজনীতি ও “বেহেস্তের টিকিট”: ভণ্ডামির চূড়ান্ত রূপ।
-----------------------------------------------------------
ধর্ম ও রাজনীতি এক জিনিস নয়, এক পথে চলে না, এবং এক লক্ষ্যেও পৌঁছায় না। ধর্মের ভিত্তি সত্য, ন্যায়, নৈতিকতা ও আত্মসংযম। রাজনীতির... ...বাকিটুকু পড়ুন

লিমেরিক

লিখেছেন বাকপ্রবাস, ০১ লা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৫:০১

ধান লাগাতে গিয়ে খোকার একী হল হাল
কাদা জলে হোঁচট খেয়ে চিড়ে গেলো গাল
না পারে আর কইতে
না পারে আর সইতে
টক মিষ্টি যাহাই খাচ্ছে লাগছে সবই ঝাল। ...বাকিটুকু পড়ুন

=আজ হবে দেখা নিশ্চয়ই =

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০১ লা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:৫০


জম্পেশ খানা শেষে তোরা করিস চায়ের আয়োজন
আজ একত্রে কাটাবো সময় আমরা প্রিয়জন,
ধোঁয়া ওঠা চায়ের সাথে আমরা ক'জন
গল্প আড্ডা আহা সেকি মধুর গুঞ্জরন।

জেনে যাবো কেমন ছিলে, আছো কেমন তোমরা,
কেউ... ...বাকিটুকু পড়ুন

তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি চোর হলাম বটে

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ২:০২


আজ সকালে চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন কলিমুদ্দিন দফাদার। পাশের টেবিলে কয়েকজন ব্যবসায়ী নির্বাচন নিয়ে কথা বলছিলেন। তাদের মুখে উদ্বেগ দেখে তিনি বুঝলেন, এটাই তার নিজের মনের প্রতিধ্বনি। ১২... ...বাকিটুকু পড়ুন

×