somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

স্বপ্নিল (সাত শততম পোস্ট)

১২ ই এপ্রিল, ২০২৪ দুপুর ১২:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বালকটি একা একাই খেলতো। একদিন একটা সাইকেলের চাকার রিমের পেছনে এক টুকরো লাঠি দিয়ে ঠেলে ঠেলে মনের আনন্দে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের কাঁচা রাস্তা ধরে সে দৌড়ে বেড়াচ্ছিল। দৌড়াতে দৌড়াতে মফস্বলের রেল স্টেশনে পৌঁছে দেখে, একটা লম্বা ট্রেন প্রথম লাইনটাতে দাঁড়িয়ে আছে। তার অগ্রভাগে একটা কালো ইঞ্জিন মাঝে মাঝে ভোঁস ভোঁস করে তার চাকার কাছ দিয়ে সাদা ধোঁয়া (বাষ্প) আর মাথার উপর দিয়ে গাঢ় ধূসর রঙের ধোঁয়া ছড়াচ্ছে। ভোঁস ভোঁস শব্দটা শুনে ইঞ্জিনটাকে তার কাছে খুব রাগী মনে হলো। ছেলেটা এক দৃষ্টিতে ট্রেনের বগিগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল, আর জানালা দিয়ে যতদূর দেখা যায়, মানুষগুলোকে দেখছিল। মুহূর্তেই কুউউ... শব্দ করে ইঞ্জিনটা এবারে গাঢ় কালো রঙের ধোঁয়ার একটা কুণ্ডলী আকাশে ছড়িয়ে দিয়ে চলা শুরু করলো। ছেলেটা সাত পাঁচ না ভেবেই হঠাৎ করে দৌড়াতে দৌড়াতে হ্যান্ডেল ধরে ট্রেনে উঠে পড়লো। তার সাথে আর কিছু ছিল না, শুধু সেই সাইকেলের চাকার রিম আর এক টুকরো লাঠি ছাড়া।

সেই থেকে ট্রেনটা চলছে তো চলছেই! সেটার গন্তব্য ঠিক কোথায়, ছেলেটা তা জানে না। কোথাও স্বল্প, কোথাও দীর্ঘ বিরতি নিয়ে ট্রেনটা ক্রমাগত ছুটে চলেছে। বিরতির সময় কোথাও কোথাও যাত্রীরা নেমে যাচ্ছে, আবার কোথাও নতুন যাত্রী উঠছে। তাদের সবার হাতে ধরা গাট্টি বোঁচকা, তাদের সবার চেহারায় উৎকণ্ঠা। ছেলেটার কাছে কিছু নেই, শুধু ঐ দুটো জিনিস ছাড়া। তার চেহারা নির্বিকার, নির্ভার। ছেলেটা আশ্চর্য হয়ে খেয়াল করলো, এ ট্রেনে দৃশ্যতঃ কোন টিকেট চেকার নেই, যে কেউ যেখানে খুশি উঠতে পারে, নামতেও পারে। তবে এ ট্রেনে কোন কুলি ওঠে না, যার যার বোঝা তাকেই নামাতে হয়। এসব দৃশ্য দেখতে দেখতে ছেলেটা একসময় ঘুমিয়ে পড়লো। ঘুমের মধ্যেও সে স্বপ্ন দেখছিল, সে চলছে তো চলছেই। চলতে চলতে এক সময় ট্রেনটা প্রান্তিক স্টেশনে পৌঁছে গেছে। এবারে সে তার খেলার জিনিস দুটো নিয়ে নামতে চাইলো।

ছেলেটা যখন নামতে চাইলো, তখন সে দেখলো যে সে চলৎশক্তিহীন। ইতোমধ্যে ট্রেনে একজন টিকেট চেকার এসে গেছেন। তার কাছে কোন টিকেট নেই, এ কথা ভেবে সে ভয় পেয়ে গেল। সে অনুনয় বিনয় করে বলতে চেয়েছিল কিভাবে সে ট্রেনে উঠেছিল। কিন্তু তার মুখ দিয়ে কোন স্বরই উচ্চারিত হচ্ছিল না। তবে টিকেট চেকার সাহেব যেন কিভাবে তার মনের কথাটা বুঝতে পেরে নিজ থেকেই জানালেন, এ ট্রেনে কেউ টিকেট কেটে ওঠে না। তবে নামার সময়ে ওনারা একটা খতিয়ান নেন, এতক্ষণ ট্রেনে বসে কে কী করলো, সেটা জানতে। ঘুম ভাঙার পর ছেলেটা দেখলো, সে আর ছেলে নেই, বুড়ো হয়ে গেছে। তার সম্পত্তি বলতে কিছু নেই। ছিল শুধু সেই সাইকেলের চাকার রিম আর এক টুকরো লাঠিটা, সেগুলোও কে যেন নামিয়ে নিয়ে গেছে।

এক সময় কিছু লোক এসে ধরাধরি করে তাকে ট্রেন থেকে নীচে নামালো। নির্জন প্লাটফর্মের পাশেই একটি খোলা মাঠে তাকে শুইয়ে দিল। সে মাঠে ছিল কয়েকটা বড় শিমুল পলাশের গাছ, আর কিছু ঝোপঝাড়। রাতে সেখানে জোনাক জ্বলতো, দিনে শিমুল পলাশের মাথায় আগুন জ্বলতো। ওরা যাবার আগে তাকে সালাম জানিয়ে বলে গেল, "আবার দেখা হবে"। কিন্তু কবে, কোথায়, কখন দেখা হবে- সেটা ওরা বললো না, কারণ সেটা ওরাও জানে না। বুড়োটা গতি ভালোবাসতো। তার জীবনে যা কিছু গতি সে পেয়েছে, তার সবটাই যুগিয়েছিল সেই সাইকেলের চাকার রিমটা। সেটাকে হারিয়ে অন্তর্মুখী বালকটির ন্যায় তার বুকে চাপা কান্না ডুকরে কেঁদে উঠতে চাইলো। কিন্তু তার চোখ দুটো তখন অশ্রুহীন হয়ে গেছে। তার বুক শূন্য ও অসাড়। তবে তার মন তখনও স্বপ্ন খোঁজে। তাই স্বপ্নপ্রিয় বুড়োটা আবার আপন মনে অন্তর্লীন হলো। আবার চোখ বুঁজলো, স্বপ্নলোকে ঘুরে ঘরে স্বপ্ন দেখার লোভে।


ঢাকা
১২ এপ্রিল ২০২৪
শব্দ সংখ্যাঃ ৫২৫


সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জুন, ২০২৪ সকাল ১০:৪৮
১৭টি মন্তব্য ১৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মতভেদ নিরসন ছাড়া মুসলিম আল্লাহর সাহায্য পাবে না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২৯ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৩:০৩



সূরাঃ ৩ আলে-ইমরান, ১০৫ নং আয়াতের অনুবাদ-
১০৫। তোমরা তাদের মত হবে না যারা তাদের নিকট সুস্পষ্ট প্রমাণ আসার পর বিচ্ছিন্ন হয়েছে ও নিজেদের মাঝে মতভেদ সৃষ্টি করেছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

‘স্বপ্নের শঙ্খচিল’ কে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভকামনা….

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২৯ শে মার্চ, ২০২৬ সকাল ৭:৪৬



আজ সকালে ল্যাপটপ খুলেই উপরের চিত্রটা দেখলাম। দেখে মনটা প্রথমে একটু খারাপই হয়ে গেল! প্রায় একুশ বছর ধরে লক্ষাধিক ব্লগারের নানারকমের বৈচিত্রপূর্ণ লেখায় ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় সমৃদ্ধ আমাদের সবার... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনু গল্প

লিখেছেন মোগল সম্রাট, ২৯ শে মার্চ, ২০২৬ দুপুর ১:০৯



(এক)
দশম শ্রেণির ছেলে সাদমান সারাদিন ফোনে ডুবে থাকত। বাবা-মা বকাঝকা করলে প্রায়ই অভিমান করে ভাত খেতো না। একদিন রাতে ঘরের দরজা বন্ধ। ভোরে দরজা ভেঙে সবাই স্তব্ধ। খবরের কাগজে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবনের গল্প - ১০০

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৯ শে মার্চ, ২০২৬ দুপুর ২:৫৫



আমার সাথে একজন সাবেক সচিবের পরিচয় হয়েছে।
উনি অবসরে গেছেন, ১০ বছর হয়ে গেছে। এখন উনি বেকার। কোনো কাজ নাই। বাসায় বাজার করেন অনেক বাজার ঘুরে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ডিপস্টেট তাহলে সসস্র বিপ্লবের গোলা বারুদের সরবরাহকারী! জঙ্গি আসিফ’কে কেউ প্রশ্ন করেনি ‼️

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ৩০ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১২:২৪



বাংলাদেশে একটা ইলেক্টেড গভর্নমেন্ট-এর বিরুদ্ধে যখন জুলাই-আগস্ট মাসে তথাকথিত “মুভমেন্ট” চলতেছিল, তখন এটাকে অনেকে খুব ইনোসেন্টভাবে “পিপলস আপরাইজিং” বানানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রশ্নটা খুবই সিম্পল—এইটা কি আসলেই স্পনটেনিয়াস... ...বাকিটুকু পড়ুন

×