somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিদায়ের ব্যথা রয়ে যায় অন্তরে

২০ শে মে, ২০২৬ সকাল ১১:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



গতকাল রাত দশটা দশে আমার ছোট ভাই চপল ও তার ছোট ছেলে নাকিব কে এয়ারপোর্টে সী-অফ করে এলাম। এর আগে ওর বড় ছেলে নাফিসকেও এয়ারপোর্টে রিসীভ ও সী-অফ করেছিলাম যথাক্রমে ০৩ ও ০৯ মে ২০২৬ তারিখে। এবারে ওরা পৃ্থক তারিখে ও পথে বাংলাদেশে এসেছে ও ফেরত গেছে। খুবই অল্প সময়ের জন্য এসেছিল, তাই ওদেরকে নিয়ে তেমন কোথাও ঘুরতে যেতে পারিনি। যাও বা একদিন প্রাচীন শহর সোনারগাঁওয়ে যাবার জন্য আমরা রওনা হয়েছিলাম, পথিমধ্যে জঘন্য যানজটে আটকা পড়ে ওদের হাঁসফাস উঠে যায় এবং পরিশেষে সে যাত্রাটি পরিত্যাক্ত হয়। বড় ভাতিজা নাফিস চলে যাবার পর অবশ্য চপল ও নাকিবকে নিয়ে রংপুর গিয়েছিলাম। সেখানে কয়েকদিন থাকাকালে আমার ছোটভাই উৎপলসহ আমরা রংপুরে অবস্থানরত আত্মীয় স্বজনের বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। তারপর একদিন (১৩ মে ২০২৬) মাইক্রোবাস ভাড়া করে সবাই মিলে তুষভাণ্ডারের কাশীরামপুর, আদিতমারি উপজেলার বিন্যাগাড়ি ও আদিতমারি এবং লালমনিরহাটের হাড়িভাঙ্গায় বসবাসরত সকল আত্মীয় স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের বাসায় সকাল থেকে রাত এগারটা পর্যন্ত বেড়িয়েছি। বলা যায় নাড়ির টানেই যেন এসব জায়গায় যাওয়া হয়েছিল। আদিতমারিতে চপল উৎপলের শিক্ষক রঞ্জিৎ দেবনাথ, আবু যাফর ও হাবিবুর রহমান স্যারদের বাসায়ও গিয়েছিলাম। ওনারা অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে আপ্যায়ন করেছিলেন। হাড়িভাঙ্গায় আম্মার একমাত্র জীবিত বোন সাজেদা খালার বাসায় গিয়ে তার সাথে দেখা ও কুশল বিনিময় করে আসি। একেক জায়গায় মনের মাঝে একেক রকমের মিশ্র অনুভূতির জন্ম হচ্ছিল। কেন যেন মনে হচ্ছিল, আমাদের অনেকের জন্য এই আকস্মিক ও ক্ষণিকের দেখাগুলো হয়ে যেতে পারে ‘শেষ দেখা’! শেষ দেখা মানে শেষ চাক্ষুষ যোগাযোগ। এর পরে আর চোখ এদেরকে দেখতে পাবে না, শুধু হয়তো আরও কিছুদিন কান এদের কথা শুনতে পারবে আর এদের মুখ একে অপরের সাথে কথা বলতে পারবে ফোনের মাধ্যমে।

নাফিস ফেরত যাবার একদিন আগে, অর্থাৎ ০৮ মে ২০২৬ তারিখে চপল ঢাকায় বসবাসরত আমাদের এক্সটেন্ডেড পরিবারের সবাইকে একটি স্থানীয় রেস্টুরেন্টে মধ্যাহ্নভোজে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। মাত্র তিনজন ব্যতীত আমন্ত্রিত সবাই (৩০ জন+) উপস্থিত হয়েছিল। ঐ তিনজন ব্যক্তিগত অসুবিধার কারণে উপস্থিত হতে পারে নাই। আগে মাঝে মাঝে আমার বাসায় বিভিন্ন উপলক্ষে সবাই একত্রিত হ’তাম। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নানা অসুবিধার কারণে সে রেওয়াজটা পালন করা সম্ভব হয় নাই। এ কারণে সেদিনের এ বিরাট পারিবারিক সম্মিলনটা অনেকদিন পরে হলেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। নাতি-নাতনি, ভাতিজা-ভাতিজি, ভাগ্না-ভাগ্নি সহ চাচা চাচী, মামা মামী, ফুফু ও দাদা-দাদী, নানা-নানীদের সরব উপস্থিতি অনুষ্ঠানটিকে একটা পারিবারিক মিলন মেলায় পরিণত করেছিল। উপস্থিতদের মধ্যে কয়েকজনের বয়স সত্তর ছুঁয়েছে বা অতিক্রম করেছে। আগামীতে এ ধরণের আরেকটি পারিবারিক সম্মিলনে হয়তো তাদের অনেকেই উপস্থিত থাকতে পারবেন না। আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন ভালো জানেন; তিনি সর্বজ্ঞ, অন্তর্যামী এবং সকল প্রাণের সৃষ্টি্কর্তা ও সুরক্ষাকারী। তাঁর পবিত্র দরবারে অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি তিনি আমাদের সবাইকে সুস্থ শরীরে অনুষ্ঠানটিতে উপস্থিত হয়ে সকলের সাথে কুশল বিনিময়ের তওফিক দিয়েছিলেন বলে।

চপলকে অশেষ ধন্যবাদ জানাচ্ছি এমন সুন্দর একটি পারিবারিক প্রীতি সম্মিলন আয়োজন করার জন্য। সে ও নাকিব বোধকরি এখন মধ্য আকাশে নিদ্রারত অবস্থায় নিউ ইয়র্কের উদ্দেশ্যে মহাসাগর পাড়ি দিচ্ছে। আল্লাহতা’লা যেন ওদেরকে সহি-সালামতে নিজ গৃহে পৌঁছে দেন এবং সেখানে ওদেরকে স্বাভাবিক জীবন পরিক্রমায় ফিরিয়ে আনেন। অল্প ক’দিনের জন্য বেড়াতে আসলেও, নাফিস ও নাকিব দুই ভাই বেশ স্বাচ্ছন্দে সবার সাথে মেলামেশা করেছে। ওরা উভয়েই নিউ ইয়র্ক সিটিতে মানুষ হয়েছে। নাড়ির টান অনুভব না করলে ওদের বয়সের ছেলেদের এতদূর থেকে এত টাকা পয়সা খরচ করে ঢাকা, রংপুর ও আদিতমারি’র মত জায়গায় বেড়াতে আসার কথা নয়। ওরা খুব অল্প বয়সে মাতৃহারা হয়। এক আকস্মিক সড়ক দুর্ঘটনায় ওদের মায়ের মৃত্যুর পর চপল একাই একাধারে ওদের মা ও বাবার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে ওদেরকে লালন করে। ওদের উভয়কে সে ভালো ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়িয়েছে। নাকিব Stuyvesant High School এ পড়েছে, যেটা নিউ ইয়র্ক সিটির অন্যতম সেরা স্কুল। নাফিস যে Stony Brook University থেকে মেকানিকাল ইঞ্জিনীয়ারিং পাশ করেছে, সেটাও একটা বিখ্যাত ইউনিভার্সিটি। সেই university থেকে পাশ করা অন্ততঃ দুইজন নোবেল লরিয়েটের নাম এ মুহূর্তে উল্লেখ করতে পারছি। এরা হলেন CN Yang এবং Paul Lauterbur। CN Yang ১৯৫৭ সালে পদার্থ বিদ্যায় নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। Paul Lauterbur ২০০৩ সালে তার magnetic resonance imaging (MRI) সংক্রান্ত কাজের জন্য নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত হন।

দোয়া করি, আল্লাহতা’লা যেন ওদের দুই ভাইয়ের সহায় থাকেন তাদের সারাটা জীবন জুড়ে। যে মাতৃস্নেহ থেকে ওরা অল্প বয়সে বঞ্চিত হয়েছে, সেটা কোনদিন পূরণ হবার নয়। তবে আল্লাহ চাইলে তো অবশ্যই তাদেরকে সকল আপদ বিপদ থেকে সুরক্ষা করে তাদের জীবনটাকে ভরে দিতে পারেন স্নেহ-মায়া-মমতা-আদর ভালোবাসায়। সেটাই যেন হয়। কঠোর সাধনার মধ্য দিয়ে ওদেরকে সাফল্যের সাথে লালন করে চপল এক অসাধ্য সাধন করেছে। আল্লাহতা’লা যেন তাকে এর জন্য যথাযোগ্য বিনিময় দান করেন এবং ওর জীবনেও সে যা কিছু থেকে বঞ্চিত হয়েছে তা বহুগুণে পূরণ করে দেন। মধ্যগগনে সূর্য বিরাজমান থাকা অবস্থায় আমাদের মনেই হয় না যে সূর্যটা এক সময় সারা পৃথিবীকে অন্ধকারে নিপতিত করে টুপ করে বিদায় নেবে। কিন্তু আমাদের মনে না হলেও সূর্যটা বিদায় নেয় ঠিকই। শীতকালে যখন দিনটা ছোট হয়ে যায়, তখন বিকেল বলতে কিছু থাকে না। মধ্যাহ্ন পার হবার পরেই সূর্যটা বিদায়ের প্রস্তুতি নিতে থাকে এবং খুব দ্রুততার সাথে চোখের আড়াল হয়ে যায়। যাদের জীবন ‘বিকেল’ এ পৌঁছে যায়, তারা জানেনা কার এখন শীতের বিকেল চলছে আর কার গ্রীষ্মের। যেটাই হোক, বিকেল থেকেই বিদায়ের একটা সুর শোনা যায়; তাই তাদের মনের মাঝেও মায়ার জোয়ার উথলে ওঠে।

ওরা চলে যাবার পর ঘরটা খালি খালি লাগছে। নয় দিন আগে নাফিস চলে যাবার পরেও তাই লেগেছিল। ক্ষণিকের তরে হলেও, প্রতিটি বিদায় ব্যথা রেখে যায়, মায়া রেখে যায়। তারপরে ধীরে ধীরে প্রাকৃতিক নিয়মে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে আসে। মানুষ তার নিত্যদিনের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মাঝে মাঝে স্মৃতিগুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।


ঢাকা
১৯ মে ২০২৬
বিকেল চারটা।
শব্দ সংখ্যাঃ ৮৫০




সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে মে, ২০২৬ সকাল ৯:০৬
৮টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শুধু টুথপেস্ট নয়—মোড়ক ছেঁড়ার মুহূর্তেই ছড়াচ্ছে মাইক্রোপ্লাস্টিক

লিখেছেন মুনতাসির, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩০

টুথপেস্ট নিয়ে আলোচনা সবে শুরু হয়েছে, কিন্তু বাস্তবতা আরও অনেক বড়। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি সিন্থেটিক পণ্যই এখন মাইক্রো বা ন্যানোপ্লাস্টিক তৈরি করতে পারে—এমনকি একটি চিপসের প্যাকেট ছেঁড়ার মুহূর্তেও,... ...বাকিটুকু পড়ুন

কারো নামে মিথ্যা অপবাদ কাম্য নয় তবে ....

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৩৯


ঘটনাটি মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের এবং তার সঙ্গে থাকা এক সাংবাদিক বন্ধুকে ঘিরে। পরিবাগ ওভারব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় ট্রান্সজেন্ডার বা হিজড়া জনগোষ্ঠীর কয়েকজনের সঙ্গে... ...বাকিটুকু পড়ুন

কী-বোর্ড কাহিনী: ডেল কেবি২১৬

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১১:০০


আমি ১৯৯৬ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কী-বোর্ড ব্যবহার করছি। দেশে থাকতে কী-বোর্ড তেমন প্রয়োজন পড়েনি। মাঝে মধ্যে কেনা হতো। একবার বাংলা লিখার জন্য "বিজয়" সফটওয়্যারের প্রলোভনে, বিজয় এর... ...বাকিটুকু পড়ুন

নদী হত্যায় সম্ভবত আপনিও জড়িত

লিখেছেন অপলক , ৩০ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:০৪

আপনি আমি প্রত্যাক্ষ পরোক্ষ ভাবে নদীকে হত্যা করি। হয় রাতারাতি বা তিলে তিলে। কিন্তু কিভাবে, সেটাই দেখাবো।



সবার আগে জানা দরকার কোন জলাশয় বা জলাধারকে নদী বলব?

দুনিয়ার বিভিন্ন... ...বাকিটুকু পড়ুন

‘সবচেয়ে কঠিন’

লিখেছেন আবু সিদ, ৩০ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:১৫


আমি সাদ। আমার বয়স ১৭ বছর। আমি ক্লাস টেনের ছাত্র। আমার ক্লাসের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর বয়স ১৫ বা তার আশপাশে। আমারও ১৫ বছর বয়সে ক্লাস টেনে থাকার কথা ছিল। কিন্তু আমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×