somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নতুন ই-পাসপোর্ট নিয়ে কিছু কথা

২৮ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার সর্বশেষ পাসপোর্টটি করেছিলাম ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে। ততদিনে বাংলাদেশে ই-পাসপোর্ট ইস্যু করা শুরু হয়ে গিয়েছিল। ই-পাসপোর্টের অন্যতম একটি বাড়তি সুবিধে ছিল এই যে চাইলে সেটা একসাথে দশ বছরের জন্য ইস্যু করিয়ে নেয়া যেত। আর পাসপোর্টের মেয়াদ দশ বছরের জন্য কার্যকর থাকলে কিছু কিছু দেশ ভিসাও দিত দশ বছরের জন্য, অথবা যতদিন পাসপোর্টের মেয়াদ কার্যকর থাকে, ততদিনের জন্য। অর্থাৎ একসাথে দু’তরফা শ্রম, সময় ও অর্থ সাশ্রয়ের একটা সুযোগ পাওয়া গিয়েছিল। তাই আমি উৎফুল্ল হয়ে দশ বছরের মেয়াদের জন্যই অনলাইনে আবেদন করে, আবেদন ঠিকমত করা হয়েছে কিনা তা দেখানোর জন্য পাসপোর্ট অফিসে গিয়েছিলাম। সেখানে একজন স্টাফ আমার আবেদনপত্রটি পরীক্ষা করে কিছুটা কর্কশ স্বরেই আমাকে জানালো, “আপনি দশ বছর মেয়াদের পাসপোর্ট পাবেন না”। কেন তা পাব না জিজ্ঞেস করলে সে উত্তর দিল, “কারণ আপনার বয়স ৬৫ এর বেশি”। উল্লেখ্য, তখন আমার বয়স ছিল ৬৬ বছর হতে ঠিক তিন মাস কম। ৬৫+ ব্যক্তিগণকে দশ বছর মেয়াদের পাসপোর্ট প্রদান করতে কেন সরকারের আপত্তি থাকবে সে কথাটা আর তাকে জিজ্ঞেস করলাম না। তবে নিজের কাছে মনে হলো তাদেরকেই এ সুবিধেটুকু সর্বাগ্রে প্রদান করা উচিত, কারণ বয়সের কারণে চলাফেরা করতে, পাসপোর্ট অফিসে যাতায়াত করতে এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে রাখতে তাদেরই বেশি অসুবিধে হবার কথা। যাহোক, বিফল মনোরথে মনে মনে এর কারণসমূহ অনুসন্ধান করতে করতে যখন বাড়ি ফিরে আসছিলাম, তখন অনুভব করলাম, এর কারণগুলো অহেতুক বৈষম্যমূলক, তাই আমার আর জানতে ইচ্ছে করছে না। ওগুলো না হয় যে যেভাবে ভাবে, ভাবুক।

সেই পাসপোর্টটির মেয়াদ শেষ হবে আর মাত্র মাস দেড়েক পর। তাই পুনরায় একটি নতুন পাসপোর্ট ইস্যু করানোর জন্য অফলাইনে একটি আবেদনপত্র পূরণ করে গতকাল আবার একই পাসপোর্ট অফিসে গিয়েছিলাম। গতবারের অভিজ্ঞতার আলোকে এবারে ৫ বছরের মেয়াদের জন্যই আবেদন করেছিলাম। কিন্তু এবারের অভিজ্ঞতাটা একটু বিপরীত ধরণের ছিল। এবারে যার কাছে গেলাম, সে এবং তার অন্যান্য সহকর্মীরা সবাই আমাকে একজন সিনিয়র সিটিজেন হিসেবে যথেষ্ট সম্মান দিল। আমার কাগজপত্রে কিছু ঘাটতি ছিল। সেগুলো আনতে গেলে আমাকে পুনরায় বাসায় গিয়ে নিয়ে আসতে হতো। কম্পিউটারের কাজ করে, এমন দোকানে গিয়ে কিছু কাগজ প্রিন্ট ও ফটোকপি করতে হতো। আমার অসুবিধার কথা ভেবে সে একটি হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার আমাকে দেখিয়ে বললো, স্যার, আপনার ফোনে যদি ঐ কাগজগুলোর কোন সফট কপি থাকে তবে এই নম্বরটাতে পাঠিয়ে দেন, আমি কপি করে নিব। সৌভাগ্যক্রমে আমার সেলফোনে সেগুলো ছিল, তাই আমি খুঁজে বের করে সেগুলো পাঠিয়ে দিলাম। সে পরবর্তী যা করণীয় ছিল, তা করে নিলো।

আমার কাগজপত্রগুলো গুছিয়ে সে শেষবারের মত তার উপর একবার চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিল। কাগজগুলো দেখতে দেখতে সে আমাকে বললো, “স্যার, আপনার তো বয়স হয়েছে। ৫ বছর পরপর পাসপোর্ট অফিসে যাতায়াত করতে তো নিশ্চয়ই অসুবিধে হয়। আপনি ৫ বছরের জন্য আবেদন করেছেন কেন, আপনি তো চাইলে ১০ বছর মেয়াদের জন্য আবেদন করতে পারতেন”। আমি তখন তাকে বললাম, “গতবার করেছিলাম, কিন্তু বয়স ৬৫+ হবার কারণে আমাকে দেয়া হয়নি”। তখন সে বললো, “এখন আর সে বিধিনিষেধ নেই, এখন আপনি চাইলে ১০ বছরের জন্য আবেদন করতে পারেন”। যাদের বোধোদয়ের কারণে সরকারের এই নীতির পরিবর্তন হয়েছে, মনে মনে তাদের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে আমি তাকে বললাম, “সেটা করতে হলে কি আমাকে পুনরায় নতুন করে ফর্ম পূরণ করতে হবে”? সে বললো, “না স্যার, আপনি ব্যাংকে গিয়ে দশ বছরের জন্য নির্ধারিত টাকা পরিশোধ করে চালান নিয়ে আসুন, আমি অনলাইনে প্রয়োজনীয় সংশোধন করে নিচ্ছি”। আমি অবিলম্বে ব্যাংকের পথে রওনা হলাম।

গতবার ব্যাংকের কাজটা করেছিলাম ট্রাস্ট ব্যাংক এর প্রধান শাখা থেকে। সেবারে কাজটা কোন লাইন ছাড়াই খুব সহজে হয়েছিল বলে এবারেও সেখানেই গেলাম। কিন্তু এবারে বিধি বাম! যে মহিলা এ কাজটা করেন, তিনি বিনয়ের সাথে আমাকে জানালেন যে সেই মুহূর্তে তাদের সার্ভার ডাউন ছিল। কখন সেটা ঠিক হবে তা বলা যাচ্ছে না। কাজটি যদি জরুরী হয়ে থাকে, তবে আমি যেন নিকটস্থ সোনালী ব্যাংক থেকে কাজটি করিয়ে নেই। আমি তাকে বললাম, “রাস্তায় গাড়ি থেকে দেখলাম যে সোনালী ব্যাংকের ইমারত ভেঙে ফেলার কাজ চলছে। ব্যাংকটির নতুন লোকেশন কোথায়, তা আমি জানিনা”। উনি আমাকে নতুন লোকেশন জানালেন। ভাগ্যক্রমে সেটা অতি নিকটেই ছিল। আমি পায়ে হেঁটেই সেখানে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাজটুকু করে আনলাম। তারপর বাসায় এসে স্ত্রীকে সাথে নিয়ে পুনরায় পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে ব্যাংকের চালান জমা দিয়ে ছবি তোলার জন্য লাইনে অপেক্ষমান থাকলাম। ছবি তোলার পর ফাইনাল চেকিং এর জন্য সংশ্লিষ্ট স্টাফ ইম্প্রিন্টেড ছবিসহ ফর্মটা আমাদের হাতে দিয়ে পুনরায় সকল তথ্য পরীক্ষা করে নিতে বললো। আমি দেখলাম যে সকল তথ্য ঠিক আছে, তবে এটাও লক্ষ্য করলাম যে আমার স্ত্রীর ছবিটা স্পষ্ট, স্বচ্ছ ও সুন্দর এসেছে, আমারটা অস্পষ্ট ও আবছা। একটু হাল্কা রসিকতা করে তাকে বললাম, ম্যাডামের ছবিটা এত সুন্দর এসেছে, আমারটার এই অবস্থা কেন”? সে হেসে বললো, “স্যার, আসলে আপনারটা আরও সুন্দর হয়েছে। আমার প্রিন্টারে কালি কমে এসেছে বলে এ রকম দেখাচ্ছে। সফট কপিতে সবকিছু ঠিক আছে, আপনার ছবির কোয়ালিটি খুব ভালো এসেছে। যারা পাসপোর্ট প্রিন্ট করবে, তাদের প্রিন্টারের মান ভালো। তাদের প্রিন্টে এটা ভালো আসবে”। এই বলে সে সফট কপিটা দেখালো; আমি সন্তুষ্ট হয়ে তাকে ধন্যবাদ জানালাম। বেলা চারটা নাগাদ পাসপোর্ট অফিসের সব কাজ শেষ করে বাসার পথে রওনা হলাম। এক অনিশ্চয়তা, দুশ্চিন্তা ও কাগুজে কর্মযজ্ঞের অবসান হলো। এবারে নতুন পাসপোর্ট হাতে পাবার পালা।

জীবনটা কত দ্রুত বয়ে যায়! মনে হচ্ছে চোখের পলকেই যেন শৈশব থেকে বার্ধক্যে পৌঁছে গেছি। অথচ এটাও মনে হচ্ছে, সামনের দশটা বছর চোখের পলকে যাবে না। সেটা হতে পারে আমার জন্য দীর্ঘ এক পথ। গতবারে দশ বছর মেয়াদি ই-পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে না পেরে মন খারাপ হয়েছিল। এবারে তা করতে পেরে খুব যে উৎফুল্ল হয়েছি, সেটাও ভাবতে পারছি না, কারণ মনে সে রকমের কোন অনুভূতি নেই। আগামী দশ বছরে এ পাসপোর্টটি কতবার ব্যবহার করতে পারবো, জানিনা। তবে পাসপোর্ট প্রাপ্তির ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সকলের যে অকুণ্ঠ সাহায্য সহযোগিতা পেয়েছি, তা বাকি সারাটা জীবন কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণে রাখবো। পাসপোর্ট হাতে পাবার পর শুরু হবে ভিসার জন্য আবেদনের প্রস্তুতি। নিজ দেশের বাইরে অন্য যে কোন বহির্দেশে যেতে হলে প্রত্যেকবারই তো পাসপোর্ট ও ভিসার প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি মানুষের জন্ম থেকেই প্রত্যেকের জন্যই তার চক্ষুর অগোচরে অনন্তলোকের উদ্দেশ্যে যাত্রার জন্য ভিসাহীন এক অদৃশ্য পাসপোর্ট তৈরি হয়েই থাকে। কার জন্য কোন পাসপোর্টটি আগে ব্যবহৃত হবে, সেটা জানা থাকে একমাত্র অন্তর্যামীর, কোন পাসপোর্ট কর্মকর্তা বা শাসনকর্তার নয়। সুতরাং, যার বয়স যতই হোক, শুধুমাত্র বয়সের কারণে পাসপোর্ট প্রদানে কোন বৈষম্য রাখাটা একেবারেই অনুচিত। পূর্বের এই অনভিপ্রেত বৈষম্য দূর করার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে সাধুবাদ জানাচ্ছি।


ঢাকা
২৭ জুলাই ২০২৬
শব্দসংখ্যাঃ ৯৭২

সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:৫০
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অপারেশন সাইলেন্ট নাইট

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২৭ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:০১



কুর্মিটোলায় বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এয়ার ডিফেন্স কমান্ড সেন্টার। চব্বিশ ঘণ্টা সতর্ক থাকতে হয় এই আধুনিক কন্ট্রোল রুমে। রাত তখন ২টা ৪৭ মিনিট।

হঠাৎ করেই দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে সেন্টমার্টিনের আকাশসীমায় এমার্জেন্সি... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ দাগের খিদা

লিখেছেন রাজসোহান, ২৭ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:৫৭



আমার দাদা মাটিতে টানা দাগ পার হতে পারতেন না।

কথাটা যত সহজে লিখে ফেললাম, ব্যাপারটা তত সহজ না। দড়ি পার হতেন। বাঁশ পার হতেন। ক্ষেতের আইল, হালের ফালে ওল্টানো মাটি, সাঁকো,... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের মর্যাদা কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে মাপা যায় না...

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৭ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৬



একজন শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের মর্যাদা কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে মাপা যায় না...

বিউটি রাণী পালঃ ২০২৬ সালে সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। একটি জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হওয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমেরিকান জীবন

লিখেছেন ঢাকার লোক, ২৭ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:৩৪

গত সপ্তাহে এক আত্মীয়র বিয়েতে গিয়েছিলাম। কনে বাংলাদেশী বাবা মার আমেরিকায় জন্ম নেয়া বাঙালি, বর সাদা আমেরিকান। সমবয়সী, দুজনের বয়সই বাইশ বছরের মত। বর ইসলাম গ্রহণ করেছে দুই... ...বাকিটুকু পড়ুন

নতুন ই-পাসপোর্ট নিয়ে কিছু কথা

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২৮ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:২৪

আমার সর্বশেষ পাসপোর্টটি করেছিলাম ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে। ততদিনে বাংলাদেশে ই-পাসপোর্ট ইস্যু করা শুরু হয়ে গিয়েছিল। ই-পাসপোর্টের অন্যতম একটি বাড়তি সুবিধে ছিল এই যে চাইলে সেটা একসাথে দশ বছরের জন্য ইস্যু... ...বাকিটুকু পড়ুন

×