কাওরান বাজারে আজ আর লাক্ষ্ণৌ বা নবাব ঘরানার বাইজীদের রঙবাহারি মুজরা বসেনা। গান আর গজলের রাত কবেই ভোর হয়ে গ্যাছে। রাতভর সরাব-সাকী আর বাদ্যযন্ত্রের সেই মনমাতানো জলসাঘরের বাতি অনেক আগেই নিভে গ্যাছে। ল্যাম্পপোষ্টে কেরোসিনের সেই লন্ঠন বাতি আর জ্বলে না। ঘোড়ায় টানা সেই দুলকী চালের নবাবী বাহন বলে খ্যাত এক্কাগাড়ীও আর নেই। ঢাকার নবাবদের যাবতীয় ঐতিহ্য বহু আগেই গুটিয়ে গ্যাছে। পিলখানা থেকে পিল পিল পায়ে আজ আর যায় আসেনা নবাবদের পোষা হাতী। হাতি চলাচলের সেই পুল আজ আর নেই। বাজার আর বসতিতে ঢেকে গ্যাছে সেই হাতিরপুল।
মিতিঝল ও দিলকুশাকে ছাপিয়ে কাওরান বাজার আজ ঢাকা শহরের অন্যতম প্রধান ব্যবসায় ও বানিজ্য কেন্দ্র (সিবিডি)। আর এই ব্যবসাকেন্দ্রের কেন্দ্রস্থলে বিষফোঁড়ার মত দাঁড়িয়ে আছে একটা নির্লজ্জ ও বিবস্ত্র বহুতল ভবন, "জনতা টাওয়ার"। তদানিন্তন এরশাদ সরকারের সময় এই টাওয়ারের নির্মান কাজ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে এই টাওয়ারের নকশা, নির্মান, মালিকানা ও সত্ত্ব নিয়ে নানা গোলযোগ ও বৈধতার প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়ার এই ভবনের যাবতীয় কাজ স্থগিত ঘোষনা করা হয়। এই ভবন সংক্রান্ত নানা দুর্নীতির অভিযোগে এরশাদ সাহেবের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয় এবং তাতে তিন সাজাপ্রাপ্ত হন।
কোটি কোটি টাকা ব্যয় সাপেক্ষে, অত্যন্ত আধুনিক স্থাপত্যকলা ও শিল্পশৈলীতে নির্মিত এই ভবনের আজ দৈন্য দশা। কিছুদিন আগেও এটা একটা কংক্রীটের বস্তি ছিল। সন্ত্রাসী ও অপরাধ জগতের অনেক রাঘববোয়ালের এটা ছিল উন্মুক্ত আবাসস্থল। তাছাড়া রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় এটা ছিল অবৈধ ও অসামাজিক কার্যকলাপের অন্যতম চারনভূমি। বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সেইসব অসামাজিক কর্মকান্ডের অবসান ঘটলেও মহামূল্যবান এই ভবনটি এখনো বিগতযৌবনা পতিতার মত বিপনণ বানিজ্যের এই রমরমা বাজারে নিতান্তই অবাঞ্ছিত ও নির্লজ্জের মত উদোম শরীরে পথচারীদের টিপন্নি কেটে যাচ্ছে এবং দৃষ্টিদূষনে ইন্ধন যোগাচ্ছে।
আর কতদিন এভাবে এই অবহেলিত "জনতা টাওয়ার" তার আব্রুকে জনতার সামনে নিলাম করবে? রাষ্ট্রীয় বা সরকারী ভাবে এর একটা বিহিত হওয়া প্রয়োজন। এখন এই বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে এর একটা সুষ্ঠু, নির্দলীয় ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সমাধান বা বিহিত করার ক্ষীণ সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। কাওরান বাজার ও ফার্মগেট এলাকায় অবস্থিত দু’দুটো দুষ্ট ক্ষত ঢাকা নগরবাসিদের মহা উদ্বেকের কারন। বৃহত্তর স্বার্থে সবাই এই সমস্যার সুষ্ঠু সমাধানের ব্যাপারে আগ্রহী। "জনতা টাওয়ার" ও "রাংগস ভবন" ঢাকা মহানগরীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় দুটো বড় ধরনের বিপর্যয়। আর এই বিপর্যয় থেকে পরিত্রানের বিকল্প পথ আমাদের খুঁজে বের করতেই হবে। দেড় কোটি মানুষের শহরে এমন বিপর্যয় মোকাবেলা করা মোটেও দুঃসাধ্যের কিছু নয়। ২৫০ বিলিয়ন ডলারের কনকর্ড বিমান তৈরীর প্রকল্প যদি জনস্বার্থে বাতিল বা পরিবর্তন করার কথা একটা দেশ চিন্তা করতে পারে তবে ঢাকা মহানগরীর স্বার্থে এই দুটো প্রকল্পের যথাবিহিত পরিবর্তন তেমন কোন কঠিন কাজ নয়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



