"হাজারো খ্বায়িশে অ্যায়সি, কে হার খ্বায়িশ পে দম নিকলে
বহুত নিকলে মেরে আরমান, লেকিন ফির ভি কম নিকলে..."
কিছু পঙক্তি আছে, যেগুলো পড়ার পর মনে হয় এক মুহূর্তের জন্য সময় থমকে যায়। বুকের ভেতরটা যেন টুকরো টুকরো হয়ে গলে পড়ে- চুপচাপ। মির্জা গালিব তেমনই একজন কবি, যিনি প্রায় দুই শতাব্দী আগে এমন কথা বলে গেছেন, যা আমাদের আজকের নিঃশব্দ আর্তনাদেও সুর খুঁজে পায়।
আমরা সবাইকে খুশি রাখতে গিয়ে কতবার যে নিজেকে ভেঙেছি, তার কোনো হিসাব নেই। কারও মুখের হাসির ভার নিতে গিয়ে নিজের অভিমান, ক্লান্তি, অপূর্ণতা- সব কিছু ঢেকে ফেলেছি এক হাসিমুখে। কেউ খুশি হয়েছে, কেউ উপেক্ষা করেছে, কেউ শুধুই নিয়েছে- দিয়েছে ক'জন?
আমি শুধু ভুলে গেছি- আমার নিজেরও তো কিছু চাওয়া ছিল। জীবনটা কখন যেন হয়ে উঠেছে আত্মবিস্মৃতির প্রতিচ্ছবি। সবসময় শুধু “তাদের” কথাই ভেবেছি, “নিজের” কথা আর মনে রাখিনি।
এভাবেই নিজের কেন্দ্র থেকে সরে গিয়ে অন্যদের ঘূর্ণিপাকে ঘুরতে থাকা মানুষ আমরা- যাদের মন মাঝেমধ্যে খুব কষ্ট করে প্রশ্ন করে, “তুই কবে নিজেকে খুশি রাখতে শিখবি?”
গালিব সেই প্রশ্নের কবি। তিনি জানেন- ভালোবাসা শুধু হাসির গল্প নয়, তার মধ্যে আছে তীব্র এক হাহাকার; বোঝার চেষ্টায় বারবার ভেঙে পড়া এক অপার যুদ্ধ।
তবে এই ভাঙনের মধ্যেই আমি আরেক কবির উপস্থিতি অনুভব করি, তিনি ড. মোহাম্মদ ইকবাল (আল্লামা ইকবাল)। তিনি কান্নাকে আহ্বানে রূপ দেন। গালিব যেখানে বলেন, “আমি নিঃশেষ”, ইকবাল বলেন, “তবুও তুমি অসীম”।
ইকবাল বলেন, নিজেকে খুঁজে পাও, নিজের ভেতরের আলো জ্বালো। তোমার মাঝে লুকিয়ে আছে এক মহাবিশ্ব। ভেঙে যাও, গড়ো, আবার ভেঙে গড়ো- এটাই তোমার দায়, তোমার শক্তি।
তিনি লিখে গেছেন-
“খুদিকে কর বুলন্দ ইতনা, কে হার তাকদির সে পেহলে
খুদা বান্দে সে খুদ পুছে বাতা তেরি রেজা কেয়া হ্যায়।”
কবি ইকবাল কাঁদাতে চান না, তিনি চেতনার আগুন জ্বালাতে চান। যখন গালিবের মতো ভেঙে পড়ি কোনো না কোনো সময়ে, তখন প্রয়োজন হয় ইকবালের মতো আবার দাঁড়াবার সাহস।
এই দুই সত্তা আমাদের সবার ভেতরেই বাস করে। একজন কান্না জানে, আরেকজন জাগরণ শেখায়।
গালিব আমাদের চোখ ভেজান,
ইকবাল আমাদের চোখ খুলে দেন।
একজন শেখান কষ্টের রূপ,
অন্যজন কীভাবে সেই কষ্ট পেরিয়ে দাঁড়াতে হয়।
ভালোবাসা আর আত্মজাগরণ; এই দুই ছায়া-আলোয়ই তো বাঁচে এক জীবন্ত মনন।

সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জুন, ২০২৫ রাত ২:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



