কালবৈশাখীর ঝড় থেমে এসেছে ঠিক সন্ধ্যার প্রান্তে।
বিদ্যুৎহীন অন্ধকারে ভিজে আছে শহরের প্রতিটি কোণ,
নিঃশব্দের বুক চিরে, কোমল আবেশে তুমি এসেছিলে
মেঘের কোলে ভেসে আসা এক কন্যা হয়ে।
চেনা ছিলে বহু আগে থেকেই,
শুধু যোগাযোগের সেতুতে ছিল নীরবতা,
তবে সেই দূরত্বে জমা ছিল না এখনকার শীতলতা।
ছিল এক অদৃশ্য চুম্বকীয় টান-
বিমোহিত এক মায়াবন্ধন,
যা মুখচোরা আমাকেও
বন্ধুত্বের গান গাইতে শিখিয়েছিল।
ঝড়ের শেষে সেই আগমনের মুহূর্তেই
তুমি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলে-
"কেন আড়ালে থাকো তুমি?
কার জীবনের গল্প তুমি?
বল তো, কোন শহরের মানুষ তুমি?"
সেখান থেকেই গল্পের প্রথম পৃষ্ঠা খুলে গেল।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেল কথার ভেলায় ভেসে-
গল্পের শহর ভরে উঠল কথার ফুলঝুরিতে।
শহরটিও যেন অপেক্ষায় দিন গুনতে লাগল
আমাদের দেখা হওয়ার প্রতীক্ষায়।
তুমি বলেছিলে,
"বাড়ি ফিরলে দেখা হবে।"
লাজুক আমি শুধু সায় দিয়ে বলেছিলাম,
হয়তো কোনো এক বৃষ্টিভেজা দিনে দেখা হবে আমাদের।
তোমার লেখা আজও মনে আছে-
"যদি মন কাঁদে, চলে এসো এক বরষায়...",
যেন ধুলো জমে থাকা কোনো পুরনো চিঠি,
যা খুললেই স্মৃতির স্রোত ছুঁয়ে যায় হৃদয়।
প্রথম দেখা হয়েছিল বর্ষাতেই,
শেষ দেখাটাও তারই ধারাবাহিকতা।
নীল শাড়ি, নীল ছাতা, পুকুরঘাটে ভেজার যে স্বপ্ন ছিল-
আজ তার অস্তিত্ব নেই কোনো খাতায় বা কাব্যে।
আমি বলেছিলাম,
"আমায় মেঘ ভেবে নিও,
বৃষ্টি হলেই ভেবো আমি আছি তোমার পাশে।"
তুমি পাঠিয়েছিলে মেঘ-বৃষ্টির গভীর কবিতা,
কিন্তু আমি কেবল লিখতে পেরেছিলাম দু-চারটি সরল লাইন।
মেঘের দিন সরে গিয়ে শরতের শুভ্র আকাশে
হয়েছিল আমাদের পরবর্তী দেখা।
সেদিন তুমি বলেছিলে-
"তুমি ভালো, অনেক ভালো",
তবু এত ভালো থেকেও
আমি হারিয়ে গেলাম কোথায় কে জানে!
হয়তো আছি কোথাও
মেঘ হয়ে, শিশির হয়ে,
অথবা কোনো কবিতার ভাঁজে, নিশ্বাসে নিশ্বাসে।
গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত পার হয়ে,
বসন্ত এলে সৃষ্টি হলো যে দূরত্ব।
জীবনফাদে বন্দী হওয়ার আগে তিন বছরের অপেক্ষা,
আক্ষেপ, চেষ্টায়ও ঘুচল না আর তা।
আমি শিখতে চেষ্টা করলাম-
আলাদা জগৎ মানে কী,
কুয়াশার রঙ কতটা ধূসর,
পৃথিবীর ওজন কত ভারী।
মেঘকন্যা থেকে তুমি হয়ে উঠেছিলে আমার বনলতা
তোমার চোখের প্রশান্তি আমায় কাছে টেনেছিল,
কিন্তু সেই চোখের অশ্রুতেই ভেসে গিয়েছিল
আমাদের জীবনের স্রোত।
বনলতা থেকে তুমি গুটিয়ে নিলে নিজেকে ঝরাপাতা নামে,
আমি রইলাম সহিষ্ণু নদী হয়ে-
দুজনেরই স্বপ্ন ছিল খুব সাদামাটা,
কিন্তু সময়ের অনিশ্চয়তা সবকিছু বদলে দিল।
নয়তো পূর্ণ হতো-
পুকুরঘাটের বৃষ্টিভেজা বিকেল,
মেঠোপথে হাঁটা,
বা জ্যোৎস্না রাতে রিকশার চাকা ঘোরানো
শুধু আমরা দুজনে,
যেখানে থাকত কেবল আমাদের কথার শব্দ।
বনলতা,
এক যুগেরও বেশি সময় পরে এসে বলছি,
তুমি কি জানো-
আর কিছু চাইনি আমি তোমার কাছে!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



