somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

আব্দুল্লাহ খালিদ
আমি মূলত একজন পাঠক, ভাবতে ভালোবাসি। মনের ভিতর শব্দেরা জেগে উঠলে কখনও লেখার চেষ্টা করি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করেছি প্রায় এক দশক আগে। চাকরি, ব্যবসা, ব্যর্থতা সব পেরিয়ে এখন আবার চাকরি করছি। জীবন থেকেই শিখছি।

বেগম খালেদা জিয়া স্মরণে

৩১ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ বিকাল ৫:৪৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নামাজে জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে। আমি তাঁর মাগফিরাত কামনা করছি।

একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আজ আমি স্বীকার করি, আমার রাজনৈতিক বোধ ও অবস্থান একসময় ভিন্ন ছিল। শৈশব ও কৈশোরে আমার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সীমিত, একপেশে এবং প্রচলিত ন্যারেটিভনির্ভর। সেই ধারাবাহিকতায় বেগম খালেদা জিয়াকেও আমি দলীয় পরিচয়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ করে দেখেছি; ব্যক্তি হিসেবে তাঁকে আলাদাভাবে মূল্যায়নের সক্ষমতা তখন আমার ছিল না। সময়, অভিজ্ঞতা এবং ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতা আমাকে সেই অবস্থান থেকে বের করে এনেছে। এখন আমি স্পষ্টভাবে বুঝি, বিএনপি দল আর খালেদা জিয়া ব্যক্তি এই দুয়ের মধ্যে পার্থক্য কত গভীর এবং কত গুরুত্বপূর্ণ। তাই আজ আমি নিজেকে কোনো রাজনৈতিক দলের অনুসারী হিসেবে নয়, বরং একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে দাঁড় করিয়ে তাঁর জীবন ও ভূমিকা মূল্যায়ন করছি।

এই অবস্থান থেকে বিচার করলে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অনন্য ও আপসহীন ব্যক্তিত্ব। আগ্রাসনের কাছে নতি স্বীকার না করা, প্রতিহিংসার রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করা এবং ক্ষমতার চূড়ান্ত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ব্যক্তিগত মর্যাদা রক্ষা করা ছিল তাঁর চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য। শালীনতার সীমা অতিক্রম না করার যে দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছেন, তা এ দেশের রাজনীতিতে বিরল এবং অনুসরণযোগ্য।

২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে শেখ হাসিনার গ্রেফতারের ঘটনায় বেগম খালেদা জিয়ার প্রকাশ্য অবস্থান তাঁর রাজনৈতিক চরিত্রের একটি উজ্জ্বল নিদর্শন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ক্ষমতার দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে উঠে দেওয়া এই বক্তব্য রাজনৈতিক শালীনতার একটি ঐতিহাসিক দলিল হয়ে আছে।

এর বিপরীতে তিনি নিজে দীর্ঘদিন রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। মিথ্যা মামলা, কারাবাস, চিকিৎসা বঞ্চনা এবং ব্যক্তিগত জীবনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক কুৎসার মধ্য দিয়েও তিনি কখনো ব্যক্তিগত আক্রমণের পথে যাননি। শেখ হাসিনার প্রকাশ্য অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যের জবাবে তিনি নীরবতা ও সংযমই বজায় রেখেছেন। এই আত্মসংযম তাঁকে একজন প্রকৃত রাষ্ট্রনায়কের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।

একজন নারী নেত্রী হিসেবে তিনি এমন একটি রাজনৈতিক পরিসর নির্মাণ করেছেন, যেখানে ভিন্নমত, ভিন্ন বিশ্বাস ও ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মানুষ সহাবস্থান করতে পেরেছে। ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সংবেদনশীলতা ও সামাজিক ভারসাম্য রক্ষার কারণে তিনি ইসলামী দলসমূহসহ বিভিন্ন মতের মানুষের কাছে ব্যক্তিগতভাবে সম্মানিত ছিলেন। তাঁকে ঘিরে ইসলামবিরোধী কোনো অপবাদ কখনোই প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি, যা তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতারই স্বীকৃতি। এই সম্মান কোনো প্রচারণার ফল নয়, বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক আচরণের স্বাভাবিক অর্জন।

বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় কোটি মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের উপস্থিতি প্রমাণ করে, তাঁর অবস্থান কেবল দলীয় পরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল না। জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজা, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এবং আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা মানুষের কাতারে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। এটি ছিল জনগণের নীরব মূল্যায়ন এবং ইতিহাসের স্পষ্ট স্বীকৃতি।

এই জানাজা ইতিহাসকে একটি সুস্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। রাজনীতি সাময়িকভাবে সত্যকে আড়াল করতে পারে, কিন্তু ইতিহাস শেষ পর্যন্ত সত্য ও মর্যাদার পক্ষেই দাঁড়ায়। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহির ভাষায়, পার্থক্য নির্ধারিত হয় জানাজার দিন। আল্লাহ তাআলা সেই পার্থক্য স্পষ্ট করে দিয়েছেন।

বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতির এক বিশাল পাঠ্যবই। তাঁর জীবন, সংগ্রাম ও নীরব দৃঢ়তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দিকনির্দেশনা হয়ে থাকবে। রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে ব্যক্তিগত মর্যাদা, সহনশীলতা এবং নৈতিক দৃঢ়তা যে কোনো রাষ্ট্রের জন্য কতটা অপরিহার্য, তিনি তার এক জীবন্ত উদাহরণ।

আজ তাঁর বিদায়ে আমি শোক জানাই একজন রাষ্ট্রনায়কের জন্য, যাঁর জীবন থেকে আমি দেরিতে হলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা গ্রহণ করেছি।

আল্লাহ তাআলা তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন।
আমিন।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

এই ধরণের মানুষগুলোই বি,এন,পি-কে আবারও ডোবাবে!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:০১



পড়ালেখার পিছনে টাকা খরচ করা 'টাকা পাচার'?
যারা বিদেশে পড়ালেখা করতে যান, তাঁরা কি দেশের টাকা লুট করে নিয়ে যান, নাকি নিজের বাপের টাকায় পড়ালেখা করেন?

পড়ালেখার... ...বাকিটুকু পড়ুন

এক কাপ চা, আর ফিরে দেখা ২০০৯-এর সেই দিনগুলো

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৯:০১



এক কাপ চা, আর ফিরে দেখা ২০০৯-এর সেই দিনগুলো

কিছু জায়গা শুধু জায়গা নয়—সেগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আমাদের জীবনের একটি সময়, কিছু মানুষ, কিছু অভ্যাস আর অসংখ্য ছোট ছোট স্মৃতি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের ফরেন কারেন্সি আয়ের মাধ্যম কি?

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৩০



প্রায় বিশ কোটি মানুষের এক লক্ষ সাতচল্লিশ হাজার বর্গ কিলোমিটারের দেশ বাংলাদেশ। আর বাংলাদেশের ফরেন কারেন্সি আয়ের মাধ্যম মাত্র: - রেমিট্যান্স আর পণ্য রপ্তানি।

রেমিট্যান্স: সাধারণত কোনো ব্যক্তি যখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবনের স্টেশনে

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৫:৫৭

রেল স্টেশনে অপেক্ষা। ট্রেন আসছে। এখনো ঐ দূরে। কিন্তু তার আগমন দেখলেই আমার ভেতরে এত কন কন করে উঠে কেন জানি না। কেন এই কষ্ট বারবার হয়?... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাথর ছুঁড়ে হত্যা করার কথা!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:১৯


সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের পর তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিয়েছিল জামায়াতে ইসলামী। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাঁর এমপি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×