বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নামাজে জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে। আমি তাঁর মাগফিরাত কামনা করছি।
একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আজ আমি স্বীকার করি, আমার রাজনৈতিক বোধ ও অবস্থান একসময় ভিন্ন ছিল। শৈশব ও কৈশোরে আমার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সীমিত, একপেশে এবং প্রচলিত ন্যারেটিভনির্ভর। সেই ধারাবাহিকতায় বেগম খালেদা জিয়াকেও আমি দলীয় পরিচয়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ করে দেখেছি; ব্যক্তি হিসেবে তাঁকে আলাদাভাবে মূল্যায়নের সক্ষমতা তখন আমার ছিল না। সময়, অভিজ্ঞতা এবং ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতা আমাকে সেই অবস্থান থেকে বের করে এনেছে। এখন আমি স্পষ্টভাবে বুঝি, বিএনপি দল আর খালেদা জিয়া ব্যক্তি এই দুয়ের মধ্যে পার্থক্য কত গভীর এবং কত গুরুত্বপূর্ণ। তাই আজ আমি নিজেকে কোনো রাজনৈতিক দলের অনুসারী হিসেবে নয়, বরং একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে দাঁড় করিয়ে তাঁর জীবন ও ভূমিকা মূল্যায়ন করছি।
এই অবস্থান থেকে বিচার করলে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অনন্য ও আপসহীন ব্যক্তিত্ব। আগ্রাসনের কাছে নতি স্বীকার না করা, প্রতিহিংসার রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করা এবং ক্ষমতার চূড়ান্ত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ব্যক্তিগত মর্যাদা রক্ষা করা ছিল তাঁর চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য। শালীনতার সীমা অতিক্রম না করার যে দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছেন, তা এ দেশের রাজনীতিতে বিরল এবং অনুসরণযোগ্য।
২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে শেখ হাসিনার গ্রেফতারের ঘটনায় বেগম খালেদা জিয়ার প্রকাশ্য অবস্থান তাঁর রাজনৈতিক চরিত্রের একটি উজ্জ্বল নিদর্শন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ক্ষমতার দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে উঠে দেওয়া এই বক্তব্য রাজনৈতিক শালীনতার একটি ঐতিহাসিক দলিল হয়ে আছে।
এর বিপরীতে তিনি নিজে দীর্ঘদিন রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। মিথ্যা মামলা, কারাবাস, চিকিৎসা বঞ্চনা এবং ব্যক্তিগত জীবনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক কুৎসার মধ্য দিয়েও তিনি কখনো ব্যক্তিগত আক্রমণের পথে যাননি। শেখ হাসিনার প্রকাশ্য অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যের জবাবে তিনি নীরবতা ও সংযমই বজায় রেখেছেন। এই আত্মসংযম তাঁকে একজন প্রকৃত রাষ্ট্রনায়কের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।
একজন নারী নেত্রী হিসেবে তিনি এমন একটি রাজনৈতিক পরিসর নির্মাণ করেছেন, যেখানে ভিন্নমত, ভিন্ন বিশ্বাস ও ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মানুষ সহাবস্থান করতে পেরেছে। ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সংবেদনশীলতা ও সামাজিক ভারসাম্য রক্ষার কারণে তিনি ইসলামী দলসমূহসহ বিভিন্ন মতের মানুষের কাছে ব্যক্তিগতভাবে সম্মানিত ছিলেন। তাঁকে ঘিরে ইসলামবিরোধী কোনো অপবাদ কখনোই প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি, যা তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতারই স্বীকৃতি। এই সম্মান কোনো প্রচারণার ফল নয়, বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক আচরণের স্বাভাবিক অর্জন।
বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় কোটি মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের উপস্থিতি প্রমাণ করে, তাঁর অবস্থান কেবল দলীয় পরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল না। জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজা, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এবং আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা মানুষের কাতারে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। এটি ছিল জনগণের নীরব মূল্যায়ন এবং ইতিহাসের স্পষ্ট স্বীকৃতি।
এই জানাজা ইতিহাসকে একটি সুস্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। রাজনীতি সাময়িকভাবে সত্যকে আড়াল করতে পারে, কিন্তু ইতিহাস শেষ পর্যন্ত সত্য ও মর্যাদার পক্ষেই দাঁড়ায়। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহির ভাষায়, পার্থক্য নির্ধারিত হয় জানাজার দিন। আল্লাহ তাআলা সেই পার্থক্য স্পষ্ট করে দিয়েছেন।
বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতির এক বিশাল পাঠ্যবই। তাঁর জীবন, সংগ্রাম ও নীরব দৃঢ়তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দিকনির্দেশনা হয়ে থাকবে। রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে ব্যক্তিগত মর্যাদা, সহনশীলতা এবং নৈতিক দৃঢ়তা যে কোনো রাষ্ট্রের জন্য কতটা অপরিহার্য, তিনি তার এক জীবন্ত উদাহরণ।
আজ তাঁর বিদায়ে আমি শোক জানাই একজন রাষ্ট্রনায়কের জন্য, যাঁর জীবন থেকে আমি দেরিতে হলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা গ্রহণ করেছি।
আল্লাহ তাআলা তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন।
আমিন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



