somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মুর্শিদাবাদের মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা কোটি বছরের কাহিনি

২৮ শে জুলাই, ২০২৫ দুপুর ১:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




আমরা মুর্শিদাবাদ বললেই নবাব সিরাজ, পলাশীর যুদ্ধ আর গৌড়ের ইতিহাস মনে করি। কিন্তু এই জেলার মাটির নিচে লুকিয়ে আছে এক বিশাল প্রাগৈতিহাসিক অধ্যায় যেখানে রয়েছে আগ্নেয়গিরির লাভা, সমুদ্রের উথান পতন, প্রাচীন মানুষের বসতি এবং জীবাশ্মের বিস্ময়কর গল্প।

যখন মাটির বুক ফুঁড়ে বেরিয়েছিল আগুন

আজ থেকে প্রায় ১৯ কোটি বছর আগে, মেসোজোয়িক যুগে, জলঙ্গির আশপাশে তৈরি হয়েছিল বিশাল লাভার আস্তরণ। পরবর্তী সময়ে, ১৪ কোটি বছর আগে, মুর্শিদাবাদের উত্তর-পশ্চিমে ঘটে ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাত। এই লাভা জমাট বেঁধে তৈরি করে রাজমহল ট্র্যাপ, যা ক্লে মিশ্রিত ব্যাসল্ট পাথরে গঠিত। প্রায় ১৩ কোটি বছর আগে জলঙ্গির তীরে প্রথম চর দেখা দেয় যা ছিল নতুন ভূমির জন্মের সূচনা।

সমুদ্রের উত্থান ও পতন এবং নতুন ভূখণ্ডের সৃষ্টি

প্রাচীন যুগে সমুদ্র বারবার উঠে এসে এই অঞ্চলকে ঢেকে দিয়েছে, আবার সরে গিয়েও নতুন নতুন ভূমি তৈরি করেছে।

৭ কোটি বছর আগে, জলঙ্গির নিচে ১০৪০ ফুট গভীরে চুনাপাথর ও বেলেপাথরের স্তর জমা হয়েছিল।

৩ থেকে দেড় কোটি বছর আগে, মুর্শিদাবাদ সম্পূর্ণ সমুদ্রের নিচে ডুবে ছিল।

পরে সমুদ্র সরে গেলে পলাশী ও দেবগ্রাম এলাকায় পলি জমতে শুরু করে এবং ধীরে ধীরে মুর্শিদাবাদ স্থলভাগে রূপ নেয়।

কর্ণসুবর্ণের জন্মকথা

আজকের রাঙামাটি চাঁদপাড়া, যা এককালে রাজা শশাংকের রাজধানী কর্ণসুবর্ণ নামে পরিচিত ছিল, গড়ে ওঠে প্রায় ৫০ লক্ষ বছর আগে। এর মাটি তৈরি হয়েছিল রেডরাফ ও ল্যাটেরাইট ক্লে দিয়ে।

প্রাচীন মানুষের আগমন

রাজমহল পাহাড় থেকে নেমে আসা নদীগুলির ধারে গুমানী, পাগলা, দ্বারকা, ব্রাহ্মণী, ময়ূরাক্ষি, অজয়, কোপাই মানুষের প্রথম বসতি গড়ে ওঠে। তখনকার বাসিন্দারা ছিলেন অস্ট্রিক ও কোল ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী। এদের মধ্যেই ছিল পিথেকানথ্রোপাস, যাদের আত্মীয় প্রাচীন চীনের পিকিং মানব। পরে দ্রাবিড় জনগোষ্ঠী এসে এই অঞ্চলে মিশে যায় এবং নতুন সমাজ গড়ে ওঠে।

জলহস্তীর জীবাশ্ম এক অভুতপূর্ব আবিষ্কার

১৯৯৫ সালে বেলডাঙ্গার মাড্ডা গ্রামে খাল খোঁড়ার সময় পাওয়া যায় এক বিশাল জলহস্তীর মাথার খুলি, যা প্রায় ২০ হাজার বছরের পুরোনো। আশ্চর্যের বিষয়, মাড্ডা নামের অর্থই হলো জলের গরু যা অস্ট্রিক ভাষার আমআড্ডা শব্দ থেকে এসেছে।

বঙ্গ নাম কোথা থেকে এলো?

বঙ্গ শব্দের উৎপত্তি নিয়ে নানা মত রয়েছে। অনেকের মতে, এটি এসেছে সাঁওতাল, কোল , মুন্ডাদের দেবতা বোঙ্গা থেকে। আবার ভাষাচার্য সুকুমার সেন মনে করেন, বঙ্গ অর্থ তুলা উৎপাদনকারী দেশ, যদিও তুলার চাষ শুরু হয় আরও অনেক পরে।

গৌড় থেকে মুর্শিদাবাদ

একসময় এই অঞ্চলকে বলা হতো উত্তর লাঢ়ম, পরে গৌড়দেশ নামে পরিচিত হয়। রাজা শশাংকের শাসনামলে রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণ। পাল আমলে গড়ে ওঠে মহীপাল নগর। অবশেষে ১৭০৪ সালে মুর্শিদকুলি খাঁর নাম অনুসারে মুর্শিদাবাদ নামকরণ করা হয়।

অতীতের আড়ালে বিস্ময়কর ধনভাণ্ডার

আজ আমরা মুর্শিদাবাদকে নবাবি ঐতিহ্যের জন্য চিনি, কিন্তু এই ভূমির প্রতিটি স্তরে লুকিয়ে আছে ২০ কোটি বছরের ভূগর্ভস্থ ইতিহাস। আগ্নেয়গিরির লাভা, সমুদ্রের ঢেউ, নদীর জন্ম, প্রাচীন মানুষের পদচিহ্ন আর জলহস্তীর জীবাশ্ম সব মিলিয়ে এই অঞ্চল এক অমূল্য গবেষণার খনি।

সুত্রঃ

০১। B. Biswas & S. Sengupta (1973) – Geological Survey of India এর গবেষণা পত্র, যেখানে রাজমহল ট্র্যাপ ও মেসোজোয়িক লাভা স্তর সম্পর্কে বিশদ তথ্য রয়েছে।
০২। Nihar Ranjan Ray (Bangalar Itihas: Adi Parba) – ‘বঙ্গ’ নামের উৎপত্তি, প্রাচীন গঙ্গারিডি রাজ্য ও কর্ণসুবর্ণ সম্পর্কিত ঐতিহাসিক তথ্য।
০৩। Atul Sur (Ancient Bengal) – প্রাগৈতিহাসিক বঙ্গ ও অস্ট্রিক ভাষাভাষী গোষ্ঠীর বিষয়ে গবেষণা।
০৪। Sukumar Sen (Bhashacharchar Itihas) – ‘বঙ্গ’ শব্দের ভাষাগত বিশ্লেষণ।
০৫। Geological Survey of India (Records & Memoirs) – মুর্শিদাবাদ অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক স্তর, চুনাপাথর, বেলেপাথর ও প্লাইস্টোসিন মাটি সম্পর্কে তথ্য।
০৬। Indian Anthropological Studies – অস্ট্রিক ও কোল ভাষাভাষী প্রাচীন জনগোষ্ঠী এবং নব্যপ্রস্তর যুগের সংস্কৃতি সম্পর্কিত গবেষণা।
০৭। ১৯৯৫ সালের বেলডাঙ্গা মাড্ডা গ্রামের জলহস্তীর জীবাশ্ম আবিষ্কার সংক্রান্ত স্থানীয় সংবাদপত্রের প্রতিবেদন ও পরবর্তী গবেষণা নিবন্ধ।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে জুলাই, ২০২৫ দুপুর ১:৩৮
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনঃ কেন আমি বিএনপিকে ভোট দিবো?

লিখেছেন ভুয়া মফিজ, ০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:২৯



আসছে ১২ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সরকারপক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই নির্বাচন হবে বিতর্কমুক্ত এবং উৎসবমুখর পরিবেশে। আমার অবশ্য এই দুই ব্যপারেই দ্বিমত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওয়ামিলীগ আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:১৫



চাঁদগাজী বলেছিলেন,
"যেসব মানুষের ভাবনায় লজিক ও এনালাইটিক্যাল জ্ঞান না থাকে, তারা চারিপাশের বিশ্বকে সঠিকভাবে বুঝতে পারে না, কোন বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। সমাজে তাদের অবদান... ...বাকিটুকু পড়ুন

‘বাঙালি মুসলমানের মন’ - আবারও পড়লাম!

লিখেছেন জাহিদ অনিক, ০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৫:২৩



আহমদ ছফা'র ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ বইটা আরাম করে পড়ার মতো না। এটা এমন এক আয়না, যেটা সামনে ধরলে মুখ সুন্দর দেখাবে- এমন আশা নিয়ে গেলে হতাশ হবেন। ছফা এখানে প্রশংসা... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাতানো নির্বাচনে বিএনপিকে কিভাবে ক্ষমতায় বসানো হল-(১) অথচ দীর্ঘ ফ্যাসিস্ট শাসনের পর চাওয়া ছিল একটি সুষ্ঠ নির্বাচন।

লিখেছেন তানভির জুমার, ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:২১

১/ ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের ভিতরে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ। অর্থাৎ মানুষকে ফোন বাসায় রেখে আসতে হবে। কেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসার পক্ষপাতিত্ব করলে কেউ রেকর্ডও করতে পারবে না। কেন্দ্রে কোন অনিয়ম, জালভোট... ...বাকিটুকু পড়ুন

কলেজ ও ভার্সিটির তরুণরা কেন ধর্মের দিকে ঝুঁকছে? করনীয় পথ নকশাটাই বা কী?

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৩৬


ধর্মের দিকে ঝোঁকার মানচিত্র

অচেনা পথে হাঁটে আজ তরুণের দল
পরিচয়ের কুয়াশায় ঢেকে গেছে কাল
শিক্ষা, কর্ম, সম্পর্ক সবই আজ প্রশ্নবিদ্ধ
কোথায় জীবনের মানে মন দ্বিধাবদ্ধ।

এই দোলাচলে ধর্ম দেয় দৃঢ় পরিচয়
উদ্দেশ্য, শৃঙ্খলা,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×