somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

এক শহরের দুই পরিবার- দুজন ম নামের মানুষ।

২৫ শে মে, ২০২০ রাত ১২:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

যে দুই পরিবারের কথা বলব তারা দেশের উত্তরের এক শহরে বহুদিন ধরে বাস করছেন, ধরা যাক তারা ক পরিবার আর খ পরিবার। দুই পরিবারে একটা মিল আছে, দু্ই পরিবারেই  ভাইবোন অনেকজন করে আর তাদের প্রত্যেকেই  মেধাবী।

 ক পরিবারে বড় ভাই শুধু বুয়েটে পড়েছেন, তারপর ছয় ভাইবোন ডাক্তারী পড়েছেন, পড়া শেষ করে তারা প্রায় সবাই ডাক্তার বিয়ে করেছেন। তাদের পরের প্রজন্ম, তাদের ছেলেমেয়েরাও বড় হয়ে বেশিরভাগই ডাক্তার হয়েছেন, তারাও বিয়ে করেছেন ডাক্তার। অর্থাৎ বলা যায় ক পরিবারে অনেক ডাক্তার, কারণ এরা মনে করেন ডাক্তারি পেশায় মানুষের সেবা করা যায়। অনেক অর্থ উপার্জন? সেটা তারা অন্য পেশায় গিয়েও করতে পারতেন, আগেই বলেছি এরা সবাই মেধাবী। চাইলে এঁরা আমলা হতে পারতেন। ডাক্তারী বিসিএস না করে যদি  আমলা হবার বিসিএস করতেন, তাহলে নূন্যতম সুবিধা নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পড়ে না থেকে এরা উপজেলার সর্বোচ্চ নির্বাহী ইউ এন ও হিসাবে কোটি টাকার গাড়িসহ অন্য অনেক সুবিধা ভোগ করতে পারতেন। তারা তা হননি।

খ পরিবারের মেধাবী ভাইবোনেরা খুবই চৌকস,এরা বেশিরভাগই আমলা হয়েছেন, শুধু আমলাই না, এদের দুভাই পরবর্তীতে ভি আই পিও হয়েছেন। জ্যেষ্ঠ ভিআইপির অভ্যাস বিরক্ত হলে "রাবিশ" বলে বিরক্তি প্রকাশ করা, তিনি রিটায়ার্ড। কনিষ্ঠ ভিআইপি কর্মরত, তার নামের  আদ্যাক্ষর অনুযায়ী তাকে বলি  ভিআইপি ম। ভিওআইপি ম, আর ডাক্তার ম- এই দুজনকে নিয়েই আমার কাহিনী।

ক পরিবারের জামাই ডাক্তার ম, তিনি এই পরিবারের দ্বিতীয় প্রজন্মের একজন ডাক্তারকে বিয়ে করে এই পরিবারের সদস্য হন। বিসিএস করে উপজেলায় চাকরি করেছেন, দীর্ঘদিন পড়াশোনা করে আরো ডিগ্রী ও অভিজ্ঞতা অর্জন করে  সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সহকারী অধ্যাপক হয়েছেন। তার স্ত্রী, শ্যালিকা, ভায়রা, শ্বশুর, শাশুড়ি সবাই ডাক্তার, তারা একই বাড়িতে বাস করেন। ডাক্তার ম গরীবের ডাক্তার বলে পরিচিত। ছুটির দিনে তিনি ছুটে যান নিজ গ্রামে, বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিতে। এছাড়াও দরিদ্র রোগীদের তিনি ফিস না নিয়ে উল্টো অর্থ সাহায্য করেন।

করোনা সংক্রমণের প্রথম দিকে অন্যান্য ডাক্তারদের মতো তিনিও পিপিই পাননি, ফলে মার্চের শেষ সপ্তাহে তিনি করোনা আক্রান্ত হন। নিজ বাড়িতে আইসোলেশনে থেকে তিনি সুস্থ্যও হয়ে উঠছিলেন কিন্তু হঠাৎ এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে তার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়, পরিবারে যেহেতু অনেকজন ডাক্তার, তারা ডাক্তার ম- এর ফুসফুসের এক্স রে দেখে বুঝতে পারলেন যে উনার আইসিইউর সাপোর্ট দরকার, যেটা উনার নিজের হাসপাতালেই আছে, কিন্তু উনারর হাসপাতাল তাকে এই সুবিধা দিতে অস্বীকৃতি জানালো। তার ফুসফুসের অবস্থা দ্রুত খারাপ হচ্ছিল দেখে পরিবার এয়ার এমবুলেন্স চাইলেন ঢাকায় করোনা হাসপাতালে নেবার জন্য। সহকারী অধ্যাপক পদাধিকারী কাউকে এয়ার এমবুলেন্স দেবার নিয়ম নেই বলে তাকে তা দেয়া হলো না। সাধারণ এমবুলেন্সে করে যখন তাকে ঢাকায় আনা হল, ততক্ষণে ফুসফুসের সংক্রমণ এতটা বেড়ে গেছে যে করোনা হাসপাতালে আইসিইউর ডাক্তারদের আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও সাত দিন পর তিনি মারা যান।

তার মৃত্যুর কদিন আগে একজন ইউ এন ও সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হন, পেটে আঘাত পান এবং পা ভেঙ্গে যায়, তাকে চিকিৎসার জন্য এয়ার এমবুলেন্সে করে ঢাকায় আনা হয়।

ডাক্তার ম এর এমন মৃত্যুর খবরে সকলেই দুঃখ পান, কারণ ডাক্তারের জন্য অতি প্রয়োজনীয় পিপিই ডাক্তার ম পাননি বলে কোভিড আক্রান্ত হলেন, অথচ একই সময়ে দেখা গেছে অন্য অনেক দপ্তরের কর্মকর্তারা পিপিই পড়ে ফেসবুকে ছবি আপলোড দিচ্ছেন!! এই নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে, টিভিতে এই মৃত্যু নিয়ে আলোচনা হতে লাগলো।

জেলার সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর মানুষ ভিআইপি ম- এর বাড়িও যেহেতু একই শহরে, তাই ডাক্তার ম- এর এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু নিয়ে ভিআইপি ম-এর অভিমত জানতে চাইলেন একজন টিভি সাংবাদিক; ডাক্তার ম-কে আইসিইউ, এয়ার এমবুলেন্স, পিপিই ইত্যাদি না দেয়া নিয়ে। ভিআইপি ম এককথায় উত্তর দিলেন, ডাক্তার ম-এর জন্য অন্য হাসপাতালে দুটো ভেন্টিলেটর আনা হয়েছিল, সেসব ব্যবহার না করে তাকে তার স্বজনেরা ঢাকায় নিয়ে গেছেন, অতএব এই মৃত্যুর দায় স্বজনদের। সেই অন্য হাসপাতালে আইসিইউ নেই, তাই ভেন্টিলেটর এনেও যে লাভ নেই, ভিআইপি ম-দের সম্ভবত এসব জানার দরকার হয়না। তিনি আরেকটি তথ্য দিলেন, ডাক্তার ম তার কোন রোগী দ্বারা সংক্রমিত হননি, বরং তিনি জেনেছেন ডাক্তার ম-এর বাড়ির পাশের বাড়িতে একজন ইতালি ফেরত মানুষ এসেছেন, তাই ডাক্তার ম-কে পিপিই না দেয়াতে দোষ কিছু হয়নি!

টিভিতে ভিআইপি ম-এর এই সাক্ষাৎকার শুনে মনে হলো, ইতালি ফেরত প্রতিবেশীর থেকে  সংক্রমিত হয়েছেন, এটা ডাক্তার ম-এর দোষ।  অথচ সেই ইতালি ফেরত যেন কাউকে  সংক্রমিত করতে না পারেন, সেটা নিশ্চিত করাটা যাদের দায়িত্ব ছিল তারা যে দায়িত্ব পালন করেন নি, তাদের কোন দোষ নেই!!

এদেশে কোভিড- ১৯ প্রথম শনাক্তের পর আড়াই মাস কেটে গেছে, এই দীর্ঘ সময় পরেও মনে হচ্ছে কোভিড রোগ সামলানোর সব দায় ডাক্তারদের দেয়া হয়েছে। ডাক্তারদের কাজ চিকিৎসা করা, কিন্তু স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পরিকল্পনা করা তাদের কাজ নয়। অথচ কোন সুষ্ঠু চিকিৎসা পরিকল্পনা বা পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম ছাড়াই তাদের রোগী তথা জনসাধারণের মুখোমুখি করা হচ্ছে। এখন যদি দশটা আইসিইউ বেড সম্পন্ন হাসপাতালে বিশজন আইসিইউ চাহিদা নিয়ে রোগী আসেন, তবে চিকিৎসা দিতে না পারার দায় কি হবে ডাক্তারের? কিংবা হঠাৎ যদি রোগীর সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়, ফলে ডাক্তার হিমসিম খান চিকিৎসা দিতে গিয়ে, তবে সেটা কি ডাক্তারের অপারগতা নাকি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার?

 জানতে ইচ্ছা করছে, ক পরিবারের নবীন সদস্যরা, কি এরপরও ডাক্তার হতে চাইবেন, নাকি আমলা হতে চাইবেন!
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২৪ দুপুর ২:০২
২০টি মন্তব্য ২০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শান্তির ঠিকানা—পরিবার

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০০




শান্তির ঠিকানা—পরিবার

ভালো থাকার জন্য অনেক কিছুই প্রয়োজন—অর্থ, সফলতা, সম্মান, স্বাচ্ছন্দ্য। কিন্তু এসবের মাঝেও যদি ঘরে শান্তি না থাকে, তবে মনের ভেতর কোথাও যেন একটা শূন্যতা থেকেই যায়।

বাইরের পৃথিবী যতই... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাকে দিয়ে সেলস হবে না

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:৫৫

আমাকে বাংলাদেশের এক ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি তাদের সেলসে সহায়তা করার অনুরোধ করেছে। কোম্পানি ভালো, বাজে কোন রেকর্ড নেই। আমার কাজ হচ্ছে, আমার পরিচিত মানুষদের সাথে তাদের মার্কেটিং টিমের যোগাযোগ করায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধানমন্ডি ৩২: মানুষের হৃদয়ে যে বাড়ি আজও দাঁড়িয়ে আছে

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:০৭



ধানমন্ডি ৩২: মানুষের হৃদয়ে যে বাড়ি আজও দাঁড়িয়ে আছে

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি কেনা ও নির্মাণের টাকা কোথা থেকে এসেছিল-এই প্রশ্নটা মাঝেমধ্যেই অনলাইনে ঘুরেফিরে আসে। উত্তরটা আসলে লুকিয়ে নেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওয়ামী লীগ দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয় - দরকার বিকল্প সরকার

লিখেছেন মাথা পাগলা, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:৫৪



জামাতকে সংগঠন হিসেবে নিখুঁত বলা যায়, আলেম হতে হলে দীর্ঘদিন পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যেতে হয় - মানে নেতা হবার আগে অবশ্যই পড়াশোনা করতে হবে, বিএনপি-লীগের এমন কোন... ...বাকিটুকু পড়ুন

বেলাশেষে

লিখেছেন নীল-দর্পণ, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৪

বাসায় আত্নীয় আসলে চলে যাবার সময় কিংবা তাদের বাড়ী থেকে ফেরার সময় ঘরের ছোট সদস্যের হাতে টাকা গুঁজে দেবার যে চল ছিল নিশ্চই আমরা কম বেশি সবাই সেটা সাথে পরিচিত।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×